বাজার থেকে একডজন লেবু এনেছিলাম। এর এক ফালি পাতে দেওয়ার সময় লবণ বেগম বলল-
: কী লেবু আনছো! এক ফোঁটা রস নাই।
লেবুর হালি ১০ টাকা। ডজনে ৫ টাকা ছাড়। শ্যামলী ফুটওভার ব্রিজের কোণায় এই রেটে গোলাকার কলম্বো লেবু বিক্রি করছিল এক লোক। ২৫ টাকায় এক ডজন লেবু কিনতে পেরে উৎফুল্ল হয়েছিলাম। লবণ বেগমের কথায় মন খারাপ হয়ে গেলো। ঠেক খাওয়ার পর মানুষ নানাভাবে সান্ত্বনা খোঁজে। আমাদের গ্রামে একবার এক ছাত্র মেট্রিক পরীক্ষায় ফেল করার পর ছাত্রের বাবা লজিং মাস্টারকে বললেন-
: কী মাস্টার! ছাত্র যে ফেল মারল?
লজিং মাস্টার সান্ত্বনা খুঁজতে গিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন-
: ফেল করলেও মাশআল্লাহ এক সাবজেক্টে লেটার মার্ক পাইছে...
রসহীন লেবু সম্পর্কে সান্ত্বনার ভাষা কী হবে- চিন্ত করছি, বাতাসে তার ঘ্রাণ পেলাম। দেরি না করে বললাম-
: লেবুর রস না থাকলেও সুবাস আছে।
লবণ বেগম ভ্রু কুচকাল। অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করল-
: তুমি বাতাস খাবা, না রস খাবা?
: রস।
: তাইলে তোমার কোনটা প্রয়োজন? রস, না সুবাস?
খাওয়ার জন্য প্রয়োজন লেবুর রস, সুবাস নয়। সান্ত্বনার নৌকা অতল জলে নিমজ্জিত হলো। টেবিলের ওপর রাখা গোলাকার লেবুর উদ্দেশে বিড়বিড় করে বললাম-
আপনে তো আমারে ধন্যবাদ দিতে আসেন নাই, হেডম দেখাইতে আসছেন। জানি না আপনে পুলিশ, না সাংবাদিক; নাকি গালকাটা ইদ্রিসের ভাইস্তা! আপনের পরিচয় যাই হোক না কেন- যে প্রক্রিয়াটারে আপনে সুন্দর বলতেছেন, আমার দৃষ্টিতে সেইটা অসুন্দর। তিন ঘণ্টার ওপরে লাইনে দাঁড়াইয়া রইছি। প্রয়োজনে আরও তিন ঘণ্টা দাঁড়াইয়া থাকব। তারপরও আপনে যে পথের পথিক হইছেন, আমি সেই পথে হাঁটব না। কারণ ওই পথ অনিয়মের; অসুন্দরের।
: লেবু তুমি দেখতে গোল, ঘটাইয়া দিলা গণ্ডগোল!
বিড়বিড় করতে দেখে লবণ বেগম অবাক হয়ে বলল-
: বিড়বিড়াইয়া কী কও!
: কী আর বলব! লেবুরে বললাম- গুল্লু মিয়া, এত শখ কইরা তোমারে আনলাম আর তুমি এইরকম একটা গণ্ডগোল ঘটাইলা!
: দোষ লেবুর, নাকি তোমার? জিনিস দেইখা কিনবা না?
: দেখতে গেলে তো লেবুর ভিতরে ঢুকতে হবে! সেইটা কি সম্ভব?
: তুমি আসলে কিছু বোঝই না গো! বোঝনদারের ভিতরে ঢোকার প্রয়োজন পড়ে না। বাইরে থেইকাই সে অনেককিছু বুঝতে পারে।
বাইরে থেকে লেবুগুলোকে মনে হয়েছিল রসের ঢিব্বা। বাস্তবে তার উল্টাচিত্র দেখা যাচ্ছে। তার মানে লবণ বেগমের কথাই সঠিক- আমার বোঝাবুঝির ইঞ্জিনে নাট-বল্টু কম আছে। নিজের ক্যাচিং পাওয়ারের ঘাটতি স্বীকার করে নিলাম। বললাম-
: আমার কথা বাদ দেও। ওভারসিওর হওয়ার জন্য লেবুওয়ালারে জিগাইছিলাম- ভাই, রস আছে তো! সে বলছে, ব্যাপক রস।
: গোয়ালা কি কখনো কয়, তার দই চুকা?
চুকা মানে টক। পয়সা দিয়ে জিনিস কেনার পর টক-ফক যাই হোক, ফেলে না দিয়ে মানুষ নিশ্চয়ই তা হজম করার চেষ্টা চালায়। রসহীন লেবুর সদগতি করতে চিপাচিপি বাদ দিয়ে চিবিয়ে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকালে লবণ তা দেখে বলল-
: তুমি পারোও বটে!
আম-কাঁঠালের মৌসুমে দেখা যায়- কৃষকের বউ ভাতের মাড় ও আম-কাঁঠালের ছাল-বাকল একত্রে মিশিয়ে গরুকে খেতে দেয়। গরু পরম আনন্দে ভাতের মাড়ে চুমুক দেয়, ছাল-বাকল চিবায়। আমিও প্রশান্ত চিত্তে ভাত-তরকারির পাশাপাশি লেবুর ছাল-বাকল চিবুচ্ছি। নিজেকে গরুর সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে মনে প্রশ্ন জাগল- গরুর সঙ্গে তুলনা করা কি আমার সাজে? গরু জীবদ্দশায় নানাভাবে মানুষের কাজে লাগে; উপকারে আসে। আমার জীবন মানুষের কোনো কাজে লাগছে না; কারও উপকারে আসছে না। মরহুম হওয়ার পর আমি পুরো শরীর নিয়ে কবরে ঢুকব। আর গরু তার পুরো শরীর মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর খেদমতে নিবেদন করবে। এমনকি তার শুকনো হাঁড়গুলোও মানুষের কাজে লাগবে। অথচ আমি বাংলাদেশে ক্রমেই দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠা জমির অন্তত সাড়ে তিন হাত বাই আড়াই হাত কেয়ামত পর্যন্ত বেদখল করে রাখব এবং আমার হাঁড় জাহান্নামের লাকড়ি হওয়া ছাড়া আর কোনো কাজেই আসবে না। গরু বললে মানুষ রাগ করে কোন যুক্তিতে, বুঝতে পারছি না। গরুর সঙ্গে তুলনা করলে রাগ নয়; বরং নিজের দীনতা ও ক্ষুদ্রতার জন্য মানুষের লজ্জা পাওয়া উচিত।
খাওয়ার পর বিছানায় পিঠ ঠেকাতেই লবণ বেগম বলল-
: ল্যাডা মারলা কেন!
: শরীরটা একটু পাতলা হইলেই উইঠা পড়ব।
: পেটের ভাত হজম হইতে কমপক্ষে আড়াই ঘণ্টা টাইম লাগবে। শরীর পাতলা করবার যাইয়া ঘুমাইয়া পড়লে ট্রেনের টিকিট কিন্তু ফস মারবে।
: ঘুমাব না, নিশ্চিত থাকো...
সাপ্তাহিক দুইদিন ছুটির সঙ্গে বৃহস্পতিবার একস্ট্রা ছুটি যোগ হওয়ায় আন্ডা-বাচ্চাসহ মমিসিং যাওয়ার নিয়ত করেছি। অগ্রিম টিকেট সংগ্রহ করার অভিপ্রায়ে রেলস্টেশনে পৌঁছে দেখি, বিশাল লম্বা লাইন। আল্লাহ ভরসা বলে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ঘণ্টা তিনেক পর কাউন্টারের কাছাকাছি পৌঁছে দেখি, কালো চশমা-জিন্স পরা এক তরুণ বাউলি কেটে কাউন্টারের সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছে। অগ্রবর্তীজনদের উদ্দেশে চিৎকার করলাম-
: ওই লোকটারে ওইখান থেইকা সরাইয়া দেন।
লাইনে দাঁড়ানো অপর এক যুবক তরুণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল-
: আপনেরে এইখান থেইকা সইরা যাইতে বলছে।
: কে?
যুবক হাতের ইশারায় আমাকে দেখিয়ে দিল। কালো চশমাধারী তরুণ খুব ভাব নিয়ে আমার কাছে এসে জানতে চাইল-
: আপনে আমারে সইরা যাইতে বলছেন?
তরুণের দিকে স্পষ্ট চোখে তাকালাম। কঠিন গলায় বললাম-
: হ, বলছি। কোনো সমস্যা?
সে থতমত খেয়ে বলল-
: ভাই, আমি তো কাউন্টারে টিকিটের জন্য যাই নাই। একটা ইনফরমেশন জানতে চাইছিলাম...
: ইনফরমেশন দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধান কেন্দ্র খুইলা বইসা রইছে। আপনে ওইখানে যান।
লাইনের গতি এমন- শামুকও লজ্জা পাবে। আরেকটু অগ্রসর হওয়ার পর ধীরগতির কারণ পরিষ্কার হলো। কাউন্টারে বুকিং ক্লার্ক হিসেবে যিনি দায়িত্ব পালন করছেন, তিনি কম্পিউটারের কি বোর্ডে হাত রাখার আগে অন্তত সাতবার ভাবছেন। বাংলাদেশ সবকিছু ডিজিটালাইজেশন করতে চাচ্ছে। এরকম অদক্ষ লোকজন দ্বারা কি তা সম্ভব? ডিজিটালাইজেশনের সুফল পেতে হলে জনবলও দক্ষ করতে হবে- যাদের হাতের ইশারায় কম্পিউটারের কি বোর্ড নাচানাচি করবে, প্রযুক্তি জগতে কাঁপাকাঁপি শুরু হবে।
কিছুক্ষণ বাদে কালো চশমাধারী তরুণ আমার পাশে এসে দাঁড়াল। রাজহাঁসের মতো ঘাড় উঁচু করে বলল-
: ভাই, আপনেরে ধন্যবাদ দিতে আইলাম।
: কেন!
: আপনে আমার বিরাট বড় একটা উপকার করছেন।
: কী রকম!
: আমারে এইখান থেইকা তাড়াইয়া দিছিলেন বইলাই আমি জায়গামতো যাইতে পারছি এবং সুন্দরভাবে টিকিট পাইয়া গেছি। এই যে দেখেন, টিকিট।
তরুণের কথায়, ভাবভঙ্গিতে অহংকার ঝরে পড়ছে। এসব গায়ে না মেখে বললাম-
: আপনে তো আমারে ধন্যবাদ দিতে আসেন নাই, হেডম দেখাইতে আসছেন। জানি না আপনে পুলিশ, না সাংবাদিক; নাকি গালকাটা ইদ্রিসের ভাইস্তা! আপনের পরিচয় যাই হোক না কেন- যে প্রক্রিয়াটারে আপনে সুন্দর বলতেছেন, আমার দৃষ্টিতে সেইটা অসুন্দর। তিনঘণ্টার ওপরে লাইনে দাঁড়াইয়া রইছি। প্রয়োজনে আরও তিনঘণ্টা দাঁড়াইয়া থাকব। তারপরও আপনে যে পথের পথিক হইছেন, আমি সেই পথে হাঁটব না। কারণ ওই পথ অনিয়মের; অসুন্দরের।
কাউন্টারের ছিদ্রের ভেতরে হাত ঢুকানোর সুযোগ আসার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত গলায় বুকিং ক্লার্কের উদ্দেশে বললাম-
: ... মমিসিং। তিনটা ফুল, দুইটা হাফ।
বুকিং ক্লার্ক কম্পিউটারের কি বোর্ডে হাত রাখতেই আমি পকেটে হাত দিলাম। এ কী! আমার মানিব্যাগ কোথায়? সামনে-পেছনে, উপরে-নিচে সব পকেট হাতড়ালাম। কোথাও নেই। তার মানে এটা হালাল হয়ে গেছে! প্রিন্ট হওয়া টিকিট হাতে নিয়ে বুকিং ক্লার্ক আমার দিকে তাকাতেই ভাবলেশহীন চোখে তাকে বললাম-
: ভাই, আমার মানিব্যাগ চুরি হইয়া গেছে!
: এই গল্প আমারে শুনাইতেছেন কেন?
: আপনেরে ছাড়া আর কাকে বলব!
: গল্প শোনার টাইম নাই। টাকা দেন, টিকিট নেন।
সিনেমায় দেখেছিলাম, নায়িকা রূপবান নগদ টাকার অভাবে নৌকার মাঝির হাতে সোনার নেকলেস তুলে দেয়। ট্রেনের টিকিট পাওয়া এখন এতটাই জরুরি, গলায় সোনার হার থাকলে আমিও তাই করতাম। হঠাৎ মনে হলো- আরে! সোনার হার নেই তো কী হয়েছে; মোবাইল ফোন আছে। বুকিং ক্লার্কের সামনে মোবাইল ফোন রেখে বললাম-
: ভাই, এইটা আপনের কাছে রাখেন। আমি যত দ্রুত সম্ভব টাকা নিয়া আসতেছি।
: তাতে তো কোনো লাভ হবে না।
: কেন!
: আমার শিফটিং উিডটি। আর বড়জোর আধাঘণ্টা আছি। তারপরে চইলা যাব।
: আগামীকাল সকালে থাকবেন না?
: থাকব।
: আমি তাইলে আগামীকাল সেইম টাইম, সেইম প্লেসে চইলা আসি?
: আইচ্ছা, আসেন।
: ফোন রাখবেন না?
: না, দরকার নাই।
বাসায় ফেরার পর লবণ বেগম জিজ্ঞেস করল-
: টিকিট পাইছো?
: পাইছি, তবে পকেটে নাই।
: কই আছে?
: কমলাপুর ইস্টিশনে।
: এইটা কী ধরনের কথা হইল!
লবণ বেগমকে কিছুক্ষণ ফাঁপরে রাখার উদ্দেশে তরল গলায় বললাম-
: এইটা হইল ভাত খাইছি, তবে পেটে নাই; পাতিলে আছে ধরনের কথাবার্তা।
লেখক : সাংবাদিক।
[email protected]
এইচআর/এমএফএ/এএসএম