ঋতুর পরিক্রমায় বর্ষা ঋতুর আগমন ঘটলেই যেন নতুন রূপে জেগে ওঠে মকিমপুর পশ্চিম বিল। দিগন্তজোড়া জলারাশি, মৃদুমন্দ বাতাস আর অস্তগামী সূর্যের রঙিন আভায় প্রতিদিন বিকেলে বিলজুড়ে সৃষ্টি হয় মোহনীয় এক প্রাকৃতিক দৃশ্যের।
আর সেই অপরূপ রূপের আকর্ষণেই প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ভিড় করছেন বিলপাড়ে। বর্ষার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সৌন্দর্য উপভোগ করতে এই বিল মুখরিত থাকে দর্শনার্থীদের পদচারণায়। যার ফলে এই এলাকাটি পরিণত হয়েছে এক মনোজ্ঞ দর্শনীয় স্থানে।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নে অবস্থিত মুকিমপুর পশ্চিম বিলটি। এই বিলের পশ্চিমে বাঙ্গরা বজার উপজেলা ও ডালপা বিল। উত্তরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলা এবং পূর্ব ও দক্ষিণে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা। বিলের বুক চিরে বয়ে গেছে বুড়ি নদী। বর্ষার পানিতে নদী ও বিল একাকার হয়ে গেলে চারপাশ যেন বিশাল এক জলরাজ্যে রূপ নেয়।
থইথই পানিতে ভরা বিলজুড়ে হালকা বাতাসে জলরাশির বুকে তৈরি হয় ছোট ছোট মিষ্টি ঢেউ। রোদের ঝলকানিতে এসব ঢেউ চিকচিক করে এক দারুণ দৃশ্যের সৃষ্টি করে। এরপর পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানিতে প্রতিফলিত রক্তিম-সোনালি আভা বিলের সৌন্দর্যে অন্য এক মনোমুগ্ধকর মাত্রা এনে দেয়। সেই দৃশ্য উপভোগ করতে বিকেল গড়াতেই পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব কিংবা পরিবার বা স্বজনদের নিয়ে ভিড় করেন নানা বয়সের মানুষ।
কেউ কেউ নৌকায় ভেসে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করেন, কেউ কেউ স্মার্টফোনে প্রকৃতির রূপ বন্দি করেন। অনেকেই আবার বিলের মাঝখানের সরু পথে হেঁটে বিলের মনোরম সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হন। দর্শনার্থীদের কেউ কেউ বিশাল জলরাশিতে সাঁতার কেটে আনন্দ উপভোগ করেন। বিলপাড়জুড়ে দর্শনার্থীদের প্রাণচাঞ্চল্যে প্রতিদিন বিকেলেই সৃষ্টি হয় এক অন্যরকম উৎসবের আমেজ।
সপরিবারে বিল ঘুরতে আসা কামরুজ্জামান সোহেল বলেন, বর্ষার সময় মুকিমপুর বিলের সৌন্দর্য সত্যিই অসাধারণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বিকেলের পরিবেশ মনকে খুব টানে। চারিদিকে থইথই জল, আর এই জল ছুঁয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়। সুযোগ পেলেই পরিবার নিয়ে এখানে চলে আসি। কিছুক্ষণ এখানে থাকলেই মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলা থেকে আসা দর্শনার্থী আব্দুল্লাহ শিশির বলেন, সুযোগ পেলেই বন্ধুরা মিলে প্রায়ই এই বিলে ঘুরতে আসি। এই বিলের চারপাশের পরিবেশ, খোলা আকাশ আর বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখতে খুব ভালো লাগে।
কুমিল্লা নগরী থেকে সপরিবারে বিল ঘুরতে এসেছেন সুমাইয়া জেসমিন আলপনা। তিনি বলেন, অনেকের কাছ থেকেই এই বিলের গল্প শুনেছি, আর সে জন্যেই পরিবার নিয়ে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসেছি। সত্যিই বিলটি বেশ চমৎকার। এরকম পরিবেশে মন ভালো না হওয়ার উপায় নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন বলেন, এবছর বেশি বৃষ্টিপাতের কারণে বিলে বেশি পানি জমেছে। এতে বিলের পরিবেশটি আরও সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠেছে। যে কারণে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবছর দর্শনার্থীর সংখ্যাও বেশি। এই উপজেলার বাসিন্দারা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে মানুষ এখানে আসেন। বিকেল হলেই দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে এবং প্রাণচঞ্চল্যে বিলের সৌন্দর্য ও গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক মোশাররফ হোসেন বলেন, বর্ষার জল, উন্মুক্ত ও নির্মল পরিবেশের অনন্য সমন্বয়ে মকিমপুর পশ্চিম বিল এখন ব্রাহ্মণপাড়ার অন্যতম আকর্ষণ। প্রকৃতির দেওয়া এই উপহারের কাছাকাছি কিছুটা সময় কাটাতে প্রতিদিনই এখানে ছুটে আসছেন সৌন্দর্যপ্রেমী ভ্রমণপিপাসু শত শত মানুষ। আর প্রতিটি বর্ষাকাল যেন নতুন করে জানিয়ে দেয় মকিমপুর বিলের আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে কেবল বর্ষার জলেই।