গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে প্রতারণা ও অবিচারের পথ: বেলাল আসাদ

বহুবিবাহ এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে অনেকেই আমার কাছে জানতে চান। সাধারণত আমি বিষয়টি এড়িয়ে যেতেই পছন্দ করি, কারণ বিষয়টি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করার জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। কিছু কিছু সমাজে বহুবিবাহের ক্ষেত্রে চরম অবিচার হতে দেখা যায়। বহুবিবাহের ব্যাপারে কোরআনের নির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট। সুরা নিসার ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা নারীদের মধ্য থেকে যাকে ভালো লাগে তাকে বিয়ে করো দুই, তিন বা চারজন। কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে কেবল একজনকেই বিয়ে করো। এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, পুরুষেরা সচরাচর চার বিয়ের অনুমতির অংশটুকু বেশ স্পষ্ট শুনলেও এর পরের শর্তটির ক্ষেত্রে যেন কিছুটা উদাসীন হয়ে পড়েন। পৃথিবীর অন্য কোনো ঐশীগ্রন্থে কেবল একজন নারীকেই বিয়ের এই সুস্পষ্ট তাগিদ পাওয়া যায় না। কোরআন স্পষ্টভাবে বলছে, সমতা বজায় না রাখতে পারার সামান্যতম আশঙ্কা থাকলেও একজন নারীকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। একই সুরায় আল্লাহ আরও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তোমরা শত আকাঙ্ক্ষা করলেও স্ত্রীদের মধ্যে পূর্ণ ন্যায়বিচার বা নিখুঁত সমতা বজায় রাখতে পারবে না। অনেকেই দুটি আয়াতের মধ্যে আপাত বৈপরীত্য দেখ

গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে প্রতারণা ও অবিচারের পথ: বেলাল আসাদ

বহুবিবাহ এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে অনেকেই আমার কাছে জানতে চান। সাধারণত আমি বিষয়টি এড়িয়ে যেতেই পছন্দ করি, কারণ বিষয়টি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করার জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। কিছু কিছু সমাজে বহুবিবাহের ক্ষেত্রে চরম অবিচার হতে দেখা যায়। বহুবিবাহের ব্যাপারে কোরআনের নির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট। সুরা নিসার ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা নারীদের মধ্য থেকে যাকে ভালো লাগে তাকে বিয়ে করো দুই, তিন বা চারজন। কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে কেবল একজনকেই বিয়ে করো।

এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, পুরুষেরা সচরাচর চার বিয়ের অনুমতির অংশটুকু বেশ স্পষ্ট শুনলেও এর পরের শর্তটির ক্ষেত্রে যেন কিছুটা উদাসীন হয়ে পড়েন। পৃথিবীর অন্য কোনো ঐশীগ্রন্থে কেবল একজন নারীকেই বিয়ের এই সুস্পষ্ট তাগিদ পাওয়া যায় না। কোরআন স্পষ্টভাবে বলছে, সমতা বজায় না রাখতে পারার সামান্যতম আশঙ্কা থাকলেও একজন নারীকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

একই সুরায় আল্লাহ আরও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তোমরা শত আকাঙ্ক্ষা করলেও স্ত্রীদের মধ্যে পূর্ণ ন্যায়বিচার বা নিখুঁত সমতা বজায় রাখতে পারবে না। অনেকেই দুটি আয়াতের মধ্যে আপাত বৈপরীত্য দেখে প্রশ্ন তোলেন, একদিকে সম আচরণ না করতে পারার শঙ্কা থাকলে এক বিয়ে করতে বলা হচ্ছে, আবার অন্যদিকে বলা হচ্ছে নিখুঁত সমতা অর্জন করা অসম্ভব! প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো বৈপরীত্য নয়। এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতার একটি বাস্তব স্বীকৃতি। মনের ভালো লাগা বা অন্তরের অনুভূতির ওপর মানুষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তবে ইসলামে বাহ্যিক অধিকার বণ্টনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কোনো এক স্ত্রীর প্রতি সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড়ে অন্যজনকে উপেক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না, বরং সাধ্যমতো ইনসাফ বজায় রাখতে হবে।

বর্তমান সময়ে গোপন বিবাহ বা একটি বড় সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই বিষয়ে স্পষ্ট আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হাদিসে বিবাহকে সামাজিকভাবে প্রচার করার নির্দেশনা দিয়েছেন। যদিও অনেক ফকীহের মতে, দুজন যোগ্য সাক্ষী, অভিভাবকের সম্মতি ও দেনমোহর ধার্য থাকলে বিবাহটি আইনিভাবে সিদ্ধ হয়ে যায়, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, পরবর্তী জীবনে এর পরিণতি কী দাঁড়ায়?

প্রথম কিংবা একাধিক স্ত্রীর কাছ থেকে বিবাহ গোপন রাখার এই প্রবণতা সুদূরপ্রসারী অবিচারের জন্ম দেয়। প্রথমত, তথ্যের গোপনীয়তাই এক ধরণের অবিচার; যেখানে এক স্ত্রী মনে করেন তিনি একমাত্র সঙ্গী, অথচ বাস্তবে তিনি তা নন। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক বণ্টনে চরম বৈষম্য তৈরি হয়। তৃতীয়ত, সন্তানদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয়ে গোপন স্ত্রীর গর্ভধারণ ও সন্তান নেওয়ার মৌলিক অধিকার অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া কিংবা পারিবারিক বিবাদের পথ প্রশস্ত হয়। এ ধরণের সম্পর্ক একজন নারীকে সার্বক্ষণিক অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে রাখে, যা শরিয়তের মূল চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত।

ব্যবসায়িক কিংবা সামাজিক জীবনে যেমন প্রতারণা করা অন্যায়, তেমনি দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রতারণামূলক আচরণ পরিহার করা আবশ্যক।

এই বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি প্রশ্ন অনেকেই করে থাকেন, স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করে প্রথম স্ত্রীর বা দ্বিতীয় স্ত্রীর অধিকার আদায় না করেন, তাহলে স্ত্রীর জন্য অধিকার আদায়ের জন্য অইসলামী বা সেক্যুলার বিচারব্যবস্থার দ্বারস্থ হওয়া জায়েজ হবে কি না।

এ ব্যাপারে প্রখ্যাত ফকীহদের বক্তব্য হলো, যেখানে শরিয়াহ আদালত অনুপস্থিত এবং বিকল্প উপায়ে অধিকার উদ্ধারের আর কোনো পথ খোলা নেই, সেখানে সেক্যুলার আদালতের সাহায্য নেওয়া বৈধ। সৌদি আরবের স্থায়ী ফাতওয়া কমিটিসহ শীর্ষ আলেমদের অভিমত হলো, নিজের অধিকার আদায়ের জন্য শেষ উপায় হিসেবে সেকুলার আদালতের শরনাপন্ন হওয়া যাবে। তবে বিচারক যদি শরিয়তের সীমা ডিঙিয়ে অতিরিক্ত কোনো সম্পত্তি বা অর্থ মঞ্জুর করেন, যা প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তির প্রাপ্য নয়, তবে আদালতের রায় থাকলেও সেই অতিরিক্ত অংশ গ্রহণ করা যাবে না। ঠিক তেমনি, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকলে কোনো আইনজীবীর জন্য এ ধরনের মামলায় আইনি সহায়তা প্রদান করাও পুরোপুরি বৈধ।

সূত্র: ইউটিউব চ্যানেল ডিভাইন জার্নিতে প্রকাশিত বেলাল আসাদের বক্তব্যের ভিডিও থেকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে। বেলাল আসাদ অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে জন্মগ্রহণকারী একজন প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলোচক। তিনি লেবাননের ‘আদ-দাওয়াহ ওয়াল-ইরশাদ ইনস্টিটিউট’ থেকে শরিয়াহ ও দাওয়াহ বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োমেডিকেল সায়েন্স এবং শিক্ষা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এ ছাড়াও, তিনি অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ANU) থেকে মাইগ্রেশন আইনে দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় একজন ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে যথাযথ ও যুক্তিপূর্ণ আলোচনার জন্য তিনি বিশ্বব্যাপাী পরিচিত।

ওএফএফ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow