চট্টগ্রাম শহর, বাণিজ্যের কেন্দ্র ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী। এখানে জীবনধারার তাগিদে কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ চাকরি করছেন, আবার দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ শহরে এসে বসবাস করছে। প্রায় ৭০ লাখ মানুষের এই নগরী ঈদ আসলেই ফাঁকা হয়ে পড়ে।
সরকারি ছুটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সাময়িক স্তব্ধতা শহরের রাস্তাঘাট, বাজার ও অফিস-কলেজে এক অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে। কিন্তু এই শান্তি স্থায়ী হয় না, ঘরমুখী মানুষ ছেড়ে চলে গেলে শহর পরিণত হয় জনশূন্য অঞ্চলে, আর প্রিয়জনের খোঁজে মানুষের যাত্রা প্রত্যেক ঈদে চোখে পড়ে।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের বাস, ট্রেন ও লঞ্চ রুটে মানুষের ঢল শুরু হয়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘরমুখী যাত্রীরা শহরের প্রতিটি প্রবেশদ্বারে চোখে পড়ছেন। এ কারণে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন, আরপিবাস টার্মিনাল এবং নগরের গুরুত্বপূর্ণ বাস কাউন্টারগুলো এখন জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন যেন প্রাণবন্ত সমুদ্রের রূপ ধারণ করেছে। মানুষের পদচারণা, অপেক্ষা এবং প্রিয়জনের কাছে ফেরার ব্যাকুলতা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। একের পর এক ট্রেন আসছে এবং যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে, তবুও কমছে না ভিড়। বরং সময় যত গড়াচ্ছে, ততই মানুষের চাপ বাড়ছে।
স্টেশনের প্রতিটি কোণ মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠেছে। টিকিট কাউন্টারের সামনে লম্বা সারি, প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ভিড়, আবার অনেকেই আগেভাগেই এসে জায়গা দখল করে বসে আছেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কেউ মেঝেতে বসে আছেন, কেউ শিশুদের কোলে নিয়ে অপেক্ষা করছেন। দীর্ঘ অপেক্ষা, গরম আর ভিড়- সবকিছু সত্ত্বেও সবার চোখে-মুখে তৃপ্তি ফুটে উঠেছে, কারণ সামনে রয়েছে বাড়ি ফেরার আনন্দ।
রেলওয়ে, বাস এবং লঞ্চ যাত্রীরা মূলত নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও কম খরচে যাত্রা করতে চাচ্ছেন। এর ফলে অন্যান্য বছরের তুলনায় রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রীর চাপ অনেক বেশি। ট্রেনের প্রতিটি বগি পূর্ণ হয়ে উঠছে, এমনকি ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি যাত্রী উঠতে দেখা গেছে।
বাসভিত্তিক যাত্রার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বাস টার্মিনাল, অলঙ্কার, এ কে খান ও দামপাড়া এলাকার বাস কাউন্টারগুলোতে সকাল থেকেই দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। যাত্রীদের মধ্যে অনেকেই টিকিট পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘ অপেক্ষা সত্ত্বেও ঘরে ফেরার আনন্দের কাছে এই ক্লান্তি তুচ্ছ মনে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটে একটি বিশেষ ঈদ স্পেশাল ট্রেন চালু করা হয়েছে। প্রবাল, সৈকতসহ গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনগুলোতে অতিরিক্ত বগি সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে যাত্রীদের ভিড় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাস যাত্রীদের জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বাস টার্মিনাল এবং অন্যান্য কাউন্টারগুলোতে নিরাপত্তা, সেবা ও যাত্রী সহায়তার জন্য অতিরিক্ত কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। স্টেশন ম্যানেজাররা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছেন যাতে যানজট, টিকিট কালোবাজারি বা ভিড়জনিত সমস্যা কমানো যায়।
রাসেল নামের এক যাত্রী বলেন, সারা বছর কাজের চাপের কারণে পরিবারের সঙ্গে সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। ঈদই একমাত্র সময়, যখন পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো যায়। তাই কষ্ট সত্ত্বেও বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছেন। আরেক যাত্রী জানান, দীর্ঘ ভিড় ও অপেক্ষা থাকলেও বাড়িতে মা-বাবা অপেক্ষা করছেন বলে কোনো বিরক্তি নেই।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যাত্রীর এই অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে যথেষ্ট বেগ দিতে হচ্ছে। দিন-রাত অবিরাম চলাচল করছে ট্রেন ও বাস, তবুও যাত্রীর চাপের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ছে।
সবকিছুর মধ্যেও মানুষের মনে রয়েছে একটাই প্রত্যাশা- নিরাপদে বাড়ি পৌঁছানো। শহরের কোলাহল ছেড়ে গ্রামের শান্ত পরিবেশে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার এই আকাঙ্ক্ষাই সব কষ্টকে সহনীয় করে তুলেছে। প্রতিটি মুখে ফুটে উঠেছে সেই প্রত্যাশা, সেই আনন্দের প্রতীক্ষা।
ঈদকে ঘিরে ঘরমুখো মানুষের ঢল কেবল একটি যাত্রা নয়, বরং এটি আবেগ, সম্পর্কের টান। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর এই যাত্রা যেন এক অনন্য মানবিক গল্প, যেখানে ক্লান্তি আছে, ভোগান্তি আছে, কিন্তু ভালোবাসা ও সম্পর্কের টান সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সুবক্তগীন সরেজমিনে স্টেশন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। প্ল্যাটফর্ম, টিকিট কাউন্টার, যাত্রী বিশ্রামাগারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঘুরে দেখেন।
তিনি বলেন, ঈদকে সামনে রেখে যাত্রীদের চাপ সামাল দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। তবে রেলওয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে, যাতে কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই যাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। টিকিট কালোবাজারি রোধে কঠোর নজরদারি, ট্রেনের সময়সূচি মেনে চলা, স্টেশনে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।