ঘুষবাণিজ্য-ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রবাসীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন প্রথম সচিব মিজানুর

রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের প্রথম সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষবাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ এনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রাশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) পাঠানো ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়, রাশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা নানা সংকটে পড়লেও প্রথম সচিব মিজানুর রহমান তাদের পাশে দাঁড়ান না। জরুরি প্রয়োজনে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেন না বলেও অভিযোগ করেন প্রবাসীরা। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বহু বাংলাদেশি হতাহত হলেও শ্রম উইংয়ের কার্যকর কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। আহত শ্রমিকদের খোঁজখবর নেওয়া তো দূরের কথা, নিহতদের মরদেহ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে বলা হয়। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, মিজানুর রহমান রাশিয়ায় ‘আদম ব্যবসা’ নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং ঘুষ ছাড়া কোনো ডিমান্ড লেটার বা ভিসা সংক্রান্ত কাজ করেন না। তার ঘনিষ্ঠ মোসাদ্দেক নামে এক ব্যক্তিকে ‘অঘোষিত পিএস’ হিসেবে ব্যবহার করা হয় ব

ঘুষবাণিজ্য-ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রবাসীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন প্রথম সচিব মিজানুর

রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের প্রথম সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষবাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ এনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রাশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) পাঠানো ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়, রাশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা নানা সংকটে পড়লেও প্রথম সচিব মিজানুর রহমান তাদের পাশে দাঁড়ান না। জরুরি প্রয়োজনে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেন না বলেও অভিযোগ করেন প্রবাসীরা।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বহু বাংলাদেশি হতাহত হলেও শ্রম উইংয়ের কার্যকর কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। আহত শ্রমিকদের খোঁজখবর নেওয়া তো দূরের কথা, নিহতদের মরদেহ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে বলা হয়।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, মিজানুর রহমান রাশিয়ায় ‘আদম ব্যবসা’ নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং ঘুষ ছাড়া কোনো ডিমান্ড লেটার বা ভিসা সংক্রান্ত কাজ করেন না। তার ঘনিষ্ঠ মোসাদ্দেক নামে এক ব্যক্তিকে ‘অঘোষিত পিএস’ হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলেও দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ওই ব্যক্তির মাধ্যমে টাকা লেনদেন ছাড়া শ্রম উইংয়ে কোনো কাজ এগোয় না।

প্রবাসীদের অভিযোগ, এসব অনিয়ম নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে কয়েকজনের সঙ্গে প্রথম সচিবের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও সংঘাতের পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে।

অভিযোগপত্রে মিজানুর রহমানের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ২০২৪ সালের অক্টোবরে তিনি সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পদোন্নতি পান। অথচ স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী ওই পদে অন্তত দুই বছর চাকরির অভিজ্ঞতা ছাড়া বিদেশে প্রথম সচিব পদে পোস্টিং পাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু নিয়ম ভেঙে অস্বাভাবিক দ্রুত সময়ে তাকে বিদেশে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়।

এতে আরও বলা হয়, প্রথমে তাকে মালদ্বীপে পোস্টিং দেওয়া হলেও পরে তা পরিবর্তন করে রাশিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে তারা কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেননি।অভিযোগকারীরা দাবি করেন, এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।

চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়, বিভিন্ন কোম্পানির ভিসা স্ট্যাম্পিংয়ে ঘুষ ও উপহারের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশি শ্রমিকদের রাশিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে, তাদের কাছ থেকে ব্যবসা শ্রেণির টিকিট, দামি উপহার ও ডলার নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে প্রথম সচিবের বিরুদ্ধে।

এছাড়া অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতি, দায়িত্ব পালনে অদক্ষতা এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগও তোলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

প্রবাসীদের অভিযোগ, মস্কো মিশনে তার নিয়োগের দুর্নীতি নিয়ে ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন তারা। অন্যথায় ‘অপ্রীতিকর পরিস্থিতি’ তৈরি হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে অভিযোগপত্রে।

প্রবাসীদের পুরো চিঠি পড়ুন:

‘আমরা রাশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা এখানকার শ্রম উইংয়ের প্রথম সচিব মো. মিজানুর রহমানের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ। যে কোনো বিষয়ে তাকে ফোন করা হলেও তিনি কখনোই ফোন ধরেন না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আহত শত শত বাংলাদেশি হাত-পা হারিয়ে হাসপাতালে দিনের পর দিন কাতরালেও মিজানুর রহমানের দেখা মেলেনি। এখনো যুদ্ধে শতাধিক লোক মৃত্যুবরণ করলেও একটা লাশও দেশে পাঠানো হয়নি। 

এই পদে তার নিয়োগের গল্প আরও ভয়ংকর। সাধারণত সিনিয়র সহকারী সচিব পদে দুই বছর চাকরি করার পর বিদেশে পোস্টিংয়ের কথা, কিন্তু তার ক্ষেত্রে মানা হয়নি সেই নিয়ম। মিজানুর রহমানের সবশেষ পদোন্নতির চিঠিটি আমাদের হাতে এসেছে।

তিনি ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে পদোন্নতি পেয়ে একজন কর্মকর্তা এক বছরের মধ্যে কখনোই ২০২৫ সালের অক্টোবরে বিদেশে প্রথম সচিব পদে নিয়োগ পাওয়া সম্ভব নয়। এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন আসিফ নজরুল। এই অসময়ে পোস্টিং দেওয়ার জন্য [অপ্রকাশযোগ্য শব্দ] আসিফ নজরুলকে তিনি পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দেন। ঘুষের বিনিময়ে তাকে মালদ্বীপে প্রথম সচিব পদে পোস্টিং দেওয়া হয়। পরে মালদ্বীপের পোস্টিং অর্ডার পরিবর্তন করে রাশিয়ায় পোস্টিং দেওয়ার জন্য আসিফ নজরুল আরও বেশি করে টাকা নেন। তার নিয়োগের ক্ষেত্রে টাকা পেয়ে [অপ্রকাশযোগ্য শব্দ] আসিফ নজরুল কোনো নিয়মের ধার ধারেননি। সেই ঘুষের টাকা ওঠানোর মিশনে তিনি নেমেছেন। 

মিজানুর বলেন, তিনি ঘুষ দিয়ে এখানে এসেছেন, অতএব ঘুষ নিয়েই তিনি কাজ করেন। পরিবার পরিকল্পনার মতো নিচের দিকের ক্যাডার থেকে এত গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং দেওয়ায় তার কাজে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার অভাব স্পষ্ট। তার ওপর তিনি আবার দুর্নীতিবাজ। অফিস টাইমে বাইরে ঘুরে বেড়ানো, অফিসে সময়মতো না আসা তার নিত্যদিনের অভ্যাস। সরকারিভাবে লেবার ক্যাম্প পরিদর্শনের জন্য ভ্রমণবিল বরাদ্দ থাকলেও ভিসা স্ট্যাম্পিংয়ের জন্য তাকে বিজনেস ক্লাসে কোম্পানির পক্ষ থেকে টিকেট কেটে দেওয়া লাগে। 

সেখানে তিনি দুই-তিন দিন সপরিবারে ভ্রমণ করেন। ফিরে আসার সময় নিয়ে আসেন দামি উপহার এবং ক্যাশ ডলার। তারপর তিনি সেই ভিসা স্ট্যাম্পিং করেন। ফলে বাংলাদেশ থেকে লেবার এনে লেবারদের যুদ্ধে পাঠানো কোম্পানিগুলো তাকে ঘুষ এবং উপহার দিয়ে সহজেই ভিসা পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অন্য কোম্পানিগুলোর ভিসা দিনের পর দিন পড়ে থাকলেও স্ট্যাম্পিং হয় না। তার বিসিএস নিয়োগের বিষয়েও রয়েছে অনেক দুর্নীতির গল্প। মস্কো মিশনে তার প্রথম সচিব পদে নিয়োগের দুর্নীতির বিষয়ে মস্কোসহ প্রবাসী সমিতি ইতোমধ্যেই দুদকে অভিযোগ দিয়েছে।

মন্ত্রণালয় থেকে তার বিষয়ে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে মস্কো প্রবাসীরাই তার ব্যবসা নেবে। প্রথম সচিব মো. মিজানুর রহমানকে দ্রুত দেশে ফেরত নিয়ে একজন যোগ্য কর্মকর্তাকে এখানে নিয়োগ দেওয়ার জন্য মস্কো প্রবাসীগণ অনুরোধ করছে। তাকে দ্রুত দেশে নিয়ে দুর্নীতির জন্য বিচারের মুখোমুখি করুন। অন্যথায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য আমরা দায়ী থাকব না।’

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে কালবেলা। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া মোবাইল নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার যে কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।’

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow