বেশিরভাগ স্টার্টআপ কোম্পানিগুলোকেই বিনিয়োগকারীর আস্থা অর্জন করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু চীনের হেফেই শহরে মাত্র দুই বছর আগে একটি পারমাণবিক গবেষণাগার থেকে গড়ে ওঠা ফিউশন এনার্জি টেক ভিন্ন ধারার উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, তারা পারমাণবিক সংযোজন প্রক্রিয়া (ফিউশন) থেকে উদ্ভূত প্লাজমা প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করবে, যা সূর্যের চেয়েও তীব্র তাপ উৎপন্ন করতে সক্ষম।
এই প্রযুক্তির ভিত্তিতে তারা এরই মধ্যে একটি নিরাপত্তা স্ক্রিনিং ডিভাইস তৈরি করেছে, যা এখন স্থানীয় মেট্রো স্টেশনে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিদিন হাজারো যাত্রী অজান্তেই এই অত্যাধুনিক যন্ত্রের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন।
চীনের সর্বোচ্চ নেতা শি জিনপিং পশ্চিমা দেশগুলোকে নতুন প্রযুক্তিতে হারানোর প্রতি মনোনিবেশ করেছেন। এরই মধ্যে চীনা কোম্পানিগুলো বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভিএস) এবং লিথিয়াম ব্যাটারির মতো খাতে আধিপত্য বিস্তার করেছে, আর দ্রুতই মানুষের মতো দেখতে বা কাজ করতে সক্ষম রোবট নির্মাণসহ উদীয়মান যেসব ক্ষেত্র সেখানেও নেতৃত্ব দখল করছে।
দেশটির ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পেছনে আংশিক কারণ হলো কমিউনিস্ট পার্টির উদ্ভাবনের একধরনের ‘কনভেয়র বেল্ট’। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র পরিচালিত গবেষণাগার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবিত ধারণাগুলোকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরিত করা হয়। নীতি নথিপত্রে যেটাকে প্রায়ই “উদ্ভাবন শৃঙ্খল” বলা হয়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে।
তবে এই মডেলের খরচও বাড়ছে। সমালোচকদের মতে, এর মাধ্যমে বিপুল সম্পদের ভুল বণ্টন ঘটছে, যা চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেনে নামাচ্ছে। শিগগিরই এই ধারা অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে।
চীনের উদ্ভাবন শৃঙ্খল সাধারণত গবেষকদের জন্য সরকারি অনুদান দিয়ে শুরু হয়। এসব গবেষক রাষ্ট্র-সমর্থিত গবেষণাগারে জায়গা পান। এরপর এসব ল্যাব হয়ে ওঠে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এক উর্বরক্ষেত্র। তারা সম্ভাবনাময় ধারণা খুঁজে বের করেন এবং গবেষণা দলগুলোকে কোম্পানি গঠনে সহায়তা করেন।
এই প্রক্রিয়ার সাম্প্রতিক একটি সফল উদাহরণ হলো থিসিউস, চোংকিং-ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান যা কম্পিউটার-ভিশন সেন্সর তৈরি করে। ২০১৯ সালে এটি ছিল কেবল কয়েকজন বিজ্ঞানীর একটি দল, যারা শি’আন শহরের রাষ্ট্র-সমর্থিত ইনস্টিটিউট অব অপটিকস অ্যান্ড প্রিসিশন মেকানিকস থেকে এসেছিলেন। তারা প্রায়ই চায়ের দোকানে বসে নিজেদের গবেষণার বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করতেন।
চোংকিংয়ের একটি জেলা সরকার তাদের প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে একটি সাপ্লাই চেইন গড়ে তুলতে চেয়ে অর্থায়ন করে এবং ২০২০ সালে শিল্প এলাকায় কোম্পানি প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করে।
২০২৪ সালের মধ্যে থিসিউস তার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তারা জাতীয়ভাবে খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের দলে ভিড়িয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে তারা ঘোষণা করেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চায়না মোবাইল দেশটির বৃহত্তম টেলিকম কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্বে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন এক ডিসপ্লে স্ক্রিন তৈরি করেছে, যা গ্রাফিক্সকে আরও মসৃণ করে তুলবে।
ল্যাব ও বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত এমন রাষ্ট্র-সমর্থিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের উদ্ভাবনকে নানা উপায়ে বাণিজ্যিক রূপ দিচ্ছে। কেউ কেউ এমনকি বাজারও গড়ে তুলেছে, যেখানে কোম্পানিগুলো সরাসরি তাদের পেটেন্টের জন্য দরপত্র দিতে পারে।
সম্প্রতি হারবিন শহরের হেইলংজিয়াং অ্যাকাডেমি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস তাদের উদ্ভাবিত একটি জেনেটিকালি মডিফায়েড সয়াবিনের পেটেন্ট নিলামে তুলেছে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি কেনা কোম্পানিগুলোর কাছে নিজস্ব প্রযুক্তিবিদ পাঠায়, যাতে তারা সঠিকভাবে ওই প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারে।
চীনের বেসরকারি খাত ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সম্পর্ক কতটা গভীর হচ্ছে, তার একটি সূচক হলো এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়। তারা যখন তাদের উদ্ভাবন কোম্পানির কাছে বিক্রি করে, যৌথভাবে প্রযুক্তি উন্নয়ন করে বা পরামর্শ সেবা দেয়, তখন যে রাজস্ব সংগ্রহ হয় তা ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ২০৫ বিলিয়ন ইউয়ানে (২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
সহযোগিতার সুফল দুই দিক দিয়েই প্রবাহিত হয়। বায়োটেক খাতে রাষ্ট্রীয় গবেষকরা তাদের কাজ এগিয়ে নিতে বেসরকারি সম্পদ কাজে লাগাতে পারছেন বলে জানিয়েছেন বার্লিনভিত্তিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক মেরিক্সের ইয়েরুন গ্রোনেভেগেন-লাউ। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের প্রায়ই স্থানীয় কোম্পানির শিল্প-স্তরের ফারমেন্টেশন সুবিধা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়, যা ব্যাকটেরিয়া সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা হয়।
চীনের বৈজ্ঞানিক ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে একত্রিত করার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ সম্ভবত হেফেই শহর। এখানকার সরকার বেসরকারি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে, তাদের ঘিরে সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলে এবং গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সংযোগসূত্রের ভূমিকা পালন করে।
ফিউশন এনার্জি টেক এ ধরনের বহু সফল উদ্যোগের একটি মাত্র উদাহরণ। শহরটিতে উন্নত প্লাজমা-ফিউশন ক্যান্সার চিকিৎসা এখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রবেশ করেছে এবং সেখানে তৈরি করা কোয়ান্টাম-সুরক্ষিত মোবাইল সেবা এরই মধ্যে বাজারে এসেছে।
হেফেই সরকার বিশেষভাবে মনোযোগ দিয়েছে প্রযুক্তিগত বাধাগুলো সমাধানে, যেগুলো বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতায় সমাধান পাওয়ার মতো প্রণোদনা পায় না। এর একটি উদাহরণ হলো কোয়ান্টাম শিল্প। এখানে কিছু নিম্ন-তাপমাত্রার ডাইলিউশন ডিভাইস, যা আগে মাত্র কিছু বিদেশি সরবরাহকারীর কাছ থেকে পাওয়া যেত, এখন স্থানীয়ভাবে তৈরি হচ্ছে। যদিও কিছু বিশেষজ্ঞ এখনো এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
চীনের কেন্দ্রীয় সরকার আশা করছে এ ধরনের সর্বোত্তম সহযোগিতা মডেলগুলোকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে। বেইজিংভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হুটং রিসার্চ জানিয়েছে, শিল্পাঞ্চলের ভেতরে উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকীকরণের তদারকি শুরু করেছে শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (এমআইআইটি)।
চলতি বছরের এপ্রিলে লি লেচেং, যিনি এর আগে দুটি অভ্যন্তরীণ শহরকে সবুজ জ্বালানির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন, তাকে এমআইআইটির প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগ থেকে ইঙ্গিত মেলে যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও বহু রূপান্তর দেখা যাবে।
চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য দেশের বর্তমান উদ্ভাবনের বিস্তৃত পরিসর বড় সুবিধা নিয়ে আসে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির গবেষক কাইল চ্যান বলেন, এর একটি সুবিধা হলো নতুন শিল্পে প্রবেশ সহজতর হয়।
উদাহরণস্বরূপ মূলত একটি স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান শাওমি, মাত্র তিন বছরের মধ্যে চীনে একটি সফল বৈদ্যুতিক যান (ইভিএস) ব্যবসা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
এছাড়া এটি নতুন শিল্পের উত্থানেও সহায়তা করেছে। উদাহরণস্বরূপ, চীন এখন উড়ন্ত ট্যাক্সির নবীন ব্যবসায় নেতৃত্ব দিচ্ছে যা আংশিকভাবে ইভিএস এবং ড্রোন প্রযুক্তিতে দেশের বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সহায়তার কারণে অনেক শিল্পে তীব্র অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের অধিকাংশ ইভিএস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লাভজনক নয়। এখন অনেক ব্যবসায় একই গ্রাহকের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
এদিকে বিভিন্ন দেশের সরকারের বাধার কারণে বিদেশে গ্রাহককে আকৃষ্ট করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তার ওপর কিছু প্রযুক্তি এমনভাবে চীনে বিকাশ করা হচ্ছে যার জন্য স্পষ্ট বাজারের প্রমাণ নেই। উদাহরণস্বরূপ, মানবসদৃশ রোবট নিয়ে কাজ করা গবেষকরা অভিযোগ করেন, অসংখ্য প্রতিষ্ঠান প্রায় একই ধরনের পণ্য তৈরি করছে, অথচ প্রকৃত চাহিদা খুবই সীমিত।
চীনের রাষ্ট্র-নির্দেশিত উদ্ভাবন কৌশল অনেক বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে সাহায্য করেছে, তবে বিনিয়োগের রিটার্ন এতটাই কম হতে পারে যে এটি দীর্ঘমেয়াদে চলতে নাও পারে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রোডিয়াম গ্রুপের ড্যানিয়েল রোসেন বলেন, উদ্ভাবনে অর্থায়নের কারণে চীনের সঞ্চিত ঋণ বিশাল এবং অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
গত বছর জনসাধারণের ঋণ জিডিপির ১২৪ শতাংশে পৌঁছেছে যার মধ্যে স্থানীয় সরকারের অর্থায়ন সংক্রান্ত যানবাহনের ঋণও অন্তর্ভুক্ত। শি জিনপিংয়ের কাছে নতুন প্রযুক্তিতে সরকারি সহায়তা কমানো ছাড়া বিকল্প বাকি নাও থাকতে পারে। তখন চীনের উদ্ভাবনের কনভেয়র বেল্ট থেমে যেতে পারে।
টিটিএন