জনবান্ধব বাজেট: সংখ্যার বাইরে মানুষের জীবনের হিসাব
পুরান ঢাকার একটি ছোট্ট বাজারে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক স্কুলশিক্ষক। হাতে বাজারের ব্যাগ, চোখেমুখে ক্লান্তি। মাছের দাম জিজ্ঞেস করে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। পরে দোকানদারকে বললেন, ‘অল্প কিছু দিন।’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর ছোট ছেলেটি হয়তো বুঝতে পারেনি, কিন্তু বাবার চোখের অস্বস্তি স্পষ্ট ছিল। এই দৃশ্য এখন বাংলাদেশের হাজারো মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা। তারা রাষ্ট্রের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ভাষা বোঝে না; তারা বোঝে চাল, ডাল, ওষুধ, ভাড়া আর সন্তানের শিক্ষার ব্যয়। একটি রাষ্ট্রের বাজেট মূলত কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি সেই রাষ্ট্রের নৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। বাজেট বলে দেয়, রাষ্ট্র কাদের কথা বেশি ভাবছে, কাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং কাদের ওপর বোঝা চাপাচ্ছে। তাই জনবান্ধব বাজেট মানে শুধু কিছু জনপ্রিয় ঘোষণা নয়; বরং এমন একটি আর্থিক কাঠামো, যা সাধারণ মানুষের জীবন নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও সম্ভাবনাময় করে তোলে। বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে অনেক অগ্রগতি করেছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ডিজিটাল সেবায়ও বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে আয়বৈষম্য, জীবনয
পুরান ঢাকার একটি ছোট্ট বাজারে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক স্কুলশিক্ষক। হাতে বাজারের ব্যাগ, চোখেমুখে ক্লান্তি। মাছের দাম জিজ্ঞেস করে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। পরে দোকানদারকে বললেন, ‘অল্প কিছু দিন।’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর ছোট ছেলেটি হয়তো বুঝতে পারেনি, কিন্তু বাবার চোখের অস্বস্তি স্পষ্ট ছিল। এই দৃশ্য এখন বাংলাদেশের হাজারো মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা। তারা রাষ্ট্রের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ভাষা বোঝে না; তারা বোঝে চাল, ডাল, ওষুধ, ভাড়া আর সন্তানের শিক্ষার ব্যয়।
একটি রাষ্ট্রের বাজেট মূলত কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি সেই রাষ্ট্রের নৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। বাজেট বলে দেয়, রাষ্ট্র কাদের কথা বেশি ভাবছে, কাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং কাদের ওপর বোঝা চাপাচ্ছে। তাই জনবান্ধব বাজেট মানে শুধু কিছু জনপ্রিয় ঘোষণা নয়; বরং এমন একটি আর্থিক কাঠামো, যা সাধারণ মানুষের জীবন নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও সম্ভাবনাময় করে তোলে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে অনেক অগ্রগতি করেছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ডিজিটাল সেবায়ও বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে আয়বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামাজিক অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে।
এই বাস্তবতায় একটি জনবান্ধব বাজেটের প্রথম শর্ত হলো—মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মানুষের আয় যদি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে উন্নয়নের পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। বর্তমানে শহর ও গ্রাম—উভয় জায়গায়ই মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা চাপে পড়েছে। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে, ছোট উদ্যোক্তারা টিকে থাকার লড়াই করছেন, আর নিম্ন আয়ের মানুষ চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছেন।
দুঃখজনকভাবে আমাদের বাজেট প্রণয়নের সংস্কৃতিতে এখনো অনেক সময় মানুষের চেয়ে অবকাঠামো বড় হয়ে ওঠে। বড় সেতু, উড়ালসড়ক বা মেগা প্রকল্প অবশ্যই প্রয়োজনীয়; কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজন মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিনিয়োগ। একজন কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, গার্মেন্টকর্মী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবন যদি নিরাপদ না হয়, তবে উন্নয়ন কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়।
একটি জনবান্ধব বাজেটে তাই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করা জরুরি। বাংলাদেশে বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিডি বা বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি থাকলেও সেগুলোর আওতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রকৃত উপকারভোগী অনেক সময় বঞ্চিত হন, আবার রাজনৈতিক প্রভাব বা দুর্নীতির কারণে সুবিধা চলে যায় অযোগ্যদের হাতে। ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ডেটাবেইস তৈরি করে এই খাতে স্বচ্ছতা আনা সম্ভব।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দও জনবান্ধব রাষ্ট্রের অন্যতম সূচক। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখনো জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কম ব্যয় করে। অথচ একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো মানবসম্পদ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সংকট, ওষুধের অপ্রতুলতা এবং স্বাস্থ্যসেবার বাণিজ্যিকীকরণ সাধারণ মানুষকে অসহায় করে তুলছে। অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য বাড়ছে—একদিকে ব্যয়বহুল ইংরেজি মাধ্যম ও বেসরকারি শিক্ষা, অন্যদিকে অবকাঠামোহীন সরকারি প্রতিষ্ঠান।
ফিনল্যান্ড, নরওয়ে বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো দেখিয়েছে, মানবসম্পদে বিনিয়োগই টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল ভিত্তি। দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে উঠে এসে শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছিল। বাংলাদেশও যদি সত্যিকারের উন্নত রাষ্ট্র হতে চায়, তবে বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে মানুষকে।
করব্যবস্থার সংস্কারও এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বেশি। ফলে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই একই হারে ভ্যাট বা করের চাপ বহন করে। এটি সামাজিক ন্যায্যতার পরিপন্থি। একজন দিনমজুর যখন চাল, তেল বা সাবান কিনে একই ধরনের কর দেন, তখন তা কার্যত বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। উন্নত অর্থনীতিতে ধনীদের ওপর তুলনামূলক বেশি কর আরোপ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কর-সুবিধা একটি স্বীকৃত নীতি।
একটি সত্য প্রায়ই আমরা ভুলে যাই—বাজেটের সফলতা কেবল রাজস্ব আয়ের অঙ্ক দিয়ে মাপা যায় না; মাপতে হয় মানুষের মুখের হাসি দিয়ে। রাষ্ট্র যদি মানুষের জীবনে স্বস্তি না আনতে পারে, তবে উন্নয়নের ভাষণ মানুষের কাছে ক্রমে অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে করজাল সম্প্রসারণের নামে প্রায়ই মধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়, অথচ বড় অঙ্কের কর ফাঁকি বা অবৈধ অর্থপাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ তুলনামূলক কম দেখা যায়। জনবান্ধব বাজেটের অর্থ হবে—সৎ করদাতাকে সম্মান দেওয়া এবং বড় দুর্নীতি ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া।
একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাজেটের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য করতে হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু কর্মসংস্থানের অভাব এই সম্ভাবনাকে হতাশায় পরিণত করছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছেন, কিন্তু চাকরির বাজার তাদের ধারণ করতে পারছে না। অনেকে বিদেশমুখী হচ্ছেন, আবার অনেকে দীর্ঘদিন বেকার থাকছেন। এই বাস্তবতা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক অস্থিরতারও কারণ।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং স্থানীয় উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। ব্যাংকঋণ সহজ করা, উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে তহবিল গঠন এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণের মাধ্যমে তরুণদের অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করা যেতে পারে।
কৃষি খাতের কথাও আলাদা করে বলতে হয়। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার মূল ভিত্তি এখনো কৃষক। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষক অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পান না। সারের দাম, সেচব্যয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের চাপ তাদের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। কৃষিকে শুধু ভর্তুকির খাত হিসেবে নয়, জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ালে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
একটি সত্য প্রায়ই আমরা ভুলে যাই—বাজেটের সফলতা কেবল রাজস্ব আয়ের অঙ্ক দিয়ে মাপা যায় না; মাপতে হয় মানুষের মুখের হাসি দিয়ে। রাষ্ট্র যদি মানুষের জীবনে স্বস্তি না আনতে পারে, তবে উন্নয়নের ভাষণ মানুষের কাছে ক্রমে অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান সংকট। এই সময়ে প্রয়োজন এমন একটি বাজেট, যা কেবল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নয়, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দেবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ রাষ্ট্রের বাজেটও শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রতি সেই বিশ্বাসের দলিল। মানুষ যদি মনে করে রাষ্ট্র তার পাশে আছে, তার কষ্ট বোঝে, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে—তবেই একটি বাজেট সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব হয়ে ওঠে।
কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো মেগা প্রকল্প নয়, কোনো উঁচু ভবন নয়; রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। সেই মানুষ যদি নিরাপদ, মর্যাদাবান ও আশাবাদী না হয়, তবে উন্নয়নের সব হিসাবই একসময় শূন্য হয়ে যায়।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]
এইচআর/এমএফএ/এমএস
What's Your Reaction?