জিল্লুর রহমান শুভ্র'র ৪টি কবিতা

কোনো এক ক্যাফেতে   অনেক চেষ্টা করেও বোঝাতে পারিনি এই যযাতিয় পাখি-বিহীন সন্ধ্যা আমার নয়। তোমার আঙুলে রাশিচক্রের যে নীলাভ অঙ্গুরীয় ঘুমের ভান করে আমার তামাশা দেখছে, তাকে বড্ড হৃদয়হীন মনে হয়। তোমার কফির ধোঁয়া হরবোলা পাখির মতো তোমার জলজলাটের গান গেয়েই যাচ্ছে; যে গান দূর সমুদ্রের উদাস তিমিরকেও বিরক্ত করে। তোমার গোলাপি ঠোঁট টিয়ে পাখির ঠোঁটে বয়ে আনে না ফসলের ঘ্রাণ। মেদবহুল আকাঙ্খার ছায়া ছাড়া তোমার চোখে দেখি না দুধের বলকের মতো ভালোবাসার বলক।  এই সমস্ত পাথুরে ক্যাফেতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে জর্জ ফ্লয়েডের মতো। আমি নৌকার রঙিন পালে হাওয়ায় হাওয়ায় ওড়াতে চাই কলম্বাসের স্বপ্ন, ঈগলের ডানায় ভাসাতে চাই সুকান্ত’র ক্ষুধার রাজ্য। প্রাগৈতিহাসিক কুঠারে ‘অসম্ভব’এর আঁতুড়ঘর ভেঙে আদম-হাওয়ার সমাধিতে লিখতে চাই এপিটাফ--আর কত ঘুমাবেন! জীবনে টেলিভিশন দেখেছেন? পরচুলা পরা সময় খড়গ হাতে আমাকে তাড়িয়ে আনে এই জীবনানন্দের বাংলায় মায়াকোভস্কিকে স্বাগত জানাতে। মাইকেলেঞ্জেলোকে বেতাল অন্ধকারের পেঁচাদের সন্ধ্যাভাষায় প্রতিবাদ লিপি লিখে জানাতে চাই ডেভিডকে বিবস্ত্র করে পুরুজাতিকে হেয় করেছেন। হাভানা চুরুট খেতে খেতে খুঁজতে চাই অন্ধক

জিল্লুর রহমান শুভ্র'র ৪টি কবিতা

কোনো এক ক্যাফেতে

 

অনেক চেষ্টা করেও বোঝাতে পারিনি এই যযাতিয় পাখি-বিহীন সন্ধ্যা আমার নয়। তোমার আঙুলে রাশিচক্রের যে নীলাভ অঙ্গুরীয় ঘুমের ভান করে আমার তামাশা দেখছে, তাকে বড্ড হৃদয়হীন মনে হয়। তোমার কফির ধোঁয়া হরবোলা পাখির মতো তোমার জলজলাটের গান গেয়েই যাচ্ছে; যে গান দূর সমুদ্রের উদাস তিমিরকেও বিরক্ত করে। তোমার গোলাপি ঠোঁট টিয়ে পাখির ঠোঁটে বয়ে আনে না ফসলের ঘ্রাণ। মেদবহুল আকাঙ্খার ছায়া ছাড়া তোমার চোখে দেখি না দুধের বলকের মতো ভালোবাসার বলক। 


এই সমস্ত পাথুরে ক্যাফেতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে জর্জ ফ্লয়েডের মতো। আমি নৌকার রঙিন পালে হাওয়ায় হাওয়ায় ওড়াতে চাই কলম্বাসের স্বপ্ন, ঈগলের ডানায় ভাসাতে চাই সুকান্ত’র ক্ষুধার রাজ্য। প্রাগৈতিহাসিক কুঠারে ‘অসম্ভব’এর আঁতুড়ঘর ভেঙে আদম-হাওয়ার সমাধিতে লিখতে চাই এপিটাফ--আর কত ঘুমাবেন! জীবনে টেলিভিশন দেখেছেন?


পরচুলা পরা সময় খড়গ হাতে আমাকে তাড়িয়ে আনে এই জীবনানন্দের বাংলায় মায়াকোভস্কিকে স্বাগত জানাতে। মাইকেলেঞ্জেলোকে বেতাল অন্ধকারের পেঁচাদের সন্ধ্যাভাষায় প্রতিবাদ লিপি লিখে জানাতে চাই ডেভিডকে বিবস্ত্র করে পুরুজাতিকে হেয় করেছেন। হাভানা চুরুট খেতে খেতে খুঁজতে চাই অন্ধকারে ডিগবাজি খাওয়া বিপ্লব, রমণীয় সাধুসঙ্গে লিপ্ত বাতাসের সঙ্গে লালনের আখড়ায় দেহতত্ত্ব।

 

 

বিধির গেঁড়াকল

 

বেঁচে থাকার অর্থ নেই, তবুও বেঁচে থাকতে হয়। বেঁচে থাকার অর্থ আছে, তবুও চলে যেতে হয়। ঘামের শেকল পরা এই জীবন যখন বেহালার করুণ সুরে বাজে, বিমূঢ় স্বপ্নের পলেস্তারা যখন ঝুরঝুর করে খসে পড়ে, চাওয়া-পাওয়ার মেঘদল ইচ্ছের পৌরহিত্য না করে যখন ঘুমিয়ে পড়ে নদীর বিছানায়, তখন জীবনের মানেগুলো কেবলই অন্ধকার হাতড়ায়; যে অন্ধকার চলে গেছে অন্ধকারের সওয়ার হয়ে, যেখানে আলোর হরিণীদের অন্ধ চোখে সূর্যাস্ত নামে। 


জীবনের ঘ্রাণ নেই, ছিপছিপে অন্ধকারে কেবলই সাপিনীর হিসহিস। এ প্রপঞ্চময় জীবনকে ছুঁড়ে ফেলি বারবার লাশকাটা ঘরে। কেউ নেয় না তাকে ছুরির নিচে। অনাদরে ঠেলে দেয় আমারই কাছে। অগত্যা জেগে উঠি স্বপ্নের ভেতর আলোর বিভ্রমে। সোনা রোদ-ঝরা বিকেলে নারীর স্তনের মতো অদ্ভূত সুখ পাখির ডানায় ভেসে আসে যখন আমার অনুভবের বৃক্ষে, ঝিরিঝিরি বাতাসে পুলকিত কাঁপন লাগে চেতনাবোধে। এরিস্টিপ্পাস অথবা চার্বাক তখন নোঙর ফেলে লোভের বন্দরে। বাঁচার তীব্র বাসনা হ্রেষাধ্বনির মতো চিৎকার করে গ্র্যাভিতির আস্তাবলে। 


গোপন অন্ধকার থেকে মাঝেমাঝে হুঁশিয়ারি আসে; যে হুঁশিয়ারি একদা পেয়েছিল ফেরাউন, এবং আর সব মৃত। আলোকবর্ষের সীমানা ছাড়িয়ে কিংবা গভীর গোপনে আমার শ্বাস-প্রশ্বাসের তালুকের যিনি খবরদারি করেন তাম্রাক্ষে, হয়ত তিনি বলবেন... যা করছি বিধিসম্মতভাবে। 
আসমুদ্র হিমাচল নতজানু তার বিধির কাছে। তবুও আড়চোখের পরকলায় প্রশ্নের ছায়া কেবল দীর্ঘতর হয়... মানুষ কী পারবে তার বিধির গেঁড়াকল ভাঙতে?

 

দুর্গ

 

চাঁদের প্ররোচনায় নির্জ্ঞান বাসনা খুন করছে আমাদের ঘুম। ছুটছি দুর্গের পানে, দখল চাই। তিতিরদের বেহুদা কান্না, বুনো কুকুরদের খিদে, আড়মোড়া ভাঙা বৃক্ষদের দীর্ঘশ্বাস, পথহারা নদীদের গোপন কছেল্লা, বিলীয়মান সোনালু ফুলের হাপিত্যাস, কোনোকিছুই আমাদের অনার্য কপালের কিম্ভূত আয়তক্ষেত্রে আঁকে না মানবিক বলিরেখা। 


দশচক্রে আমরা কেমন যেন হয়ে গেছি! আর বসি না অনিকেত অন্ধকারে গুটিসুটি মেরে নিজেদের ছায়ার মতো। প্রশ্ন করি না আকাশগঙ্গার ন্যায়... আমরা কে?


কেবলই ছুটছি উদভ্রান্ত ঘোড়াদের মতো; সারসদের ঘুমঘর থেকে উটেদের হেরেমখানায়, ক্যাঙ্গারুদের ফুলশয্যায়, ক্যাসিনো কুমিরদের স্নানঘরে, বাদুরদের রেস্তরাঁয়। সুখ নামক এক কঠিন অসুখের খোঁজে।

 
আমাদের চোখে নেই বিশল্য স্নেহের আভাস, ত্বকের নিচে কেবলই গৃধ্নু হায়েনাদের চিৎকার। স্তাবকদের বেসাতি এখন ব্যঞ্জনবর্ণের ব্যঞ্জনায়। বিবেকের স্বর কেবলই প্রবঞ্চনার অনুপ্রাস। যদি কেউ হৃদয় প্রসারিত করে কেবলই নামে বৃহস্পতির হাহাকার। অন্ধ দেবতারা অট্টহাসে, আর ঘৃণিত বোধের চাবুকের নিচে ছুঁড়ে মারে লোভের শুষ্ক পাতা। 


এই এক পৃথিবী! নিধিরাম সর্দার, তালপাতার সেপাই, মেধাহীন কবন্ধ কঙ্কাল, অভিধান খোঁটা কঠিন শব্দের কবুতর, সবাই দুর্গের দখল চায়। কেউ জানে না পৃথিবী অদ্ভুত কচ্ছপের পিঠে; ক্রমশ এগুচ্ছে সূর্যের দিকে।

 

বেঁচে আছি বিবস্ত্র যন্ত্রণার মতো 

আর কত ভাল থাকি বন্ধু এই অযাচিত ভণ্ড দেবতাদের দেশে! তাদের পৃথুল দেহের রিরংসার ঝড়ে লণ্ডভণ্ড আমাদের সখিনারা হেরে যাচ্ছে নিজেদের নিঃশ্বাসের কাছে জবুথবু ভীতির কাছে। আমরা জানি না রাষ্ট্র কতটা মানবিক হলে ভিখিরির শরীর থেকে খসবে না পচা মাংস, নিষ্পাপ নারীর দেহ যৌতুকের বলি হয়ে পড়ে থাকবে না অন্ধকার রেললাইনের ধারে, বেকার যুবকের বুক পকেটে পুলিশ খুঁজে পাবে না চিরকুট... মা, বাবা ক্ষমা করে দিয়ো! 


আমরা কেউ জানি না। রাষ্ট্র কতটা মানবিক হলে আঁধার পল্লীতে বিবস্ত্র ক্ষুধার কাছে জোছনা পোশাক হয়ে নামবে, বস্তির শিশুদের অন্নপ্রাশন হবে সীসামুক্ত বাতাসের প্রশ্রয়ে, অন্ধরা খুঁজে পাবে জোছনা দেখার প্রশস্ত বারান্দা, আর আস্তাবলের ঘোড়াগুলো তাদের স্বাধীনতা যা নিয়ত চাবুকের নিচে দরকষাকষি করে আমাদের ভুলের মতন! 


আমি তাড়িত হই প্রশ্নবোধে, শোষিতের বিবর্ণ ঝুলিতে কত বড় স্বপ্ন থাকে? আকাশের সমান? শুকনো রুটির সমান? যদি আকাশের সমান হত, এতদিন ঠুলিপরা রাষ্ট্রের মূঢ় আস্ফালন, অতলান্তিক দম্ভ, চিড়েচ্যাপটা দরদ এবং আঁধারের সঙ্গে লুকোচুরি প্রেম টেনেহেঁচড়ে নিয়ে যেত শল্য চিকিৎসকদের কাঁচির নিচে; আর তারা নিজেরাই কেটেকুটে দেখত অসুস্থ রাষ্ট্রের হৃৎপিণ্ডে দূষিত রক্তের অক্সিজেন! রাষ্ট্রের সৌভাগ্য তা হয়নি। নিয়তি দূর নক্ষত্রের বর্ম পরে রাষ্ট্রের দিকে নির্লজ্জ পাহারায়! জানি, তাদের স্বপ্ন একেবারেই সামান্য। শুকনো রুটির সমান। বাতাসের ফিসফিসানির মতো অনুচ্চারিত, নিঃসঙ্গ গম্বুজের মতো ভারাক্রান্ত।


আর কত ভাল থাকি! পা বাড়ালেই চোখের খোঁয়াড়ে অনিয়মের স্তুপ। স্থুলদর্শী ভণ্ডদের দাবার ঘোড়া আর স্ত্রৈণ কবিদের মিনমিনে ঈর্ষার থলথলে মেদ এসব আমাকে নিয়ে যায় বিভ্রম আর বিভ্রান্তির জালে। মাকড়সার কৌশলে বেরোবার চেষ্টা করি, তবে মাকড়সার জালে মাকড়সাই যদি আটকে যায়, তখন কীভাবে আর ভাল থাকা যায়!
 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow