জুলাই আন্দোলনে কয়েকজনকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ প্রতিষ্ঠা করা ঠিক হবে না

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় এক দফায়। আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন সর্বোস্তরের মানুষ, পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। এ আন্দোলনে দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর আন্দোলনের অর্জন, প্রত্যাশা, উচ্চশিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাস সংরক্ষণ নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আশিকুজ্জামান আশিক। জাগো নিউজ: জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই আন্দোলনের গুরুত্ব কতটুকু বলে মনে করেন? ড. মো. রইছ উদ্দীন: আমি জুলাইয়ের ঘটনাকে শুধু একটি সরকারের পতন হিসেবে দেখি না। এটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত প্রতি

জুলাই আন্দোলনে কয়েকজনকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ প্রতিষ্ঠা করা ঠিক হবে না

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় এক দফায়। আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন সর্বোস্তরের মানুষ, পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। এ আন্দোলনে দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য।

গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর আন্দোলনের অর্জন, প্রত্যাশা, উচ্চশিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাস সংরক্ষণ নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আশিকুজ্জামান আশিক।

জাগো নিউজ: জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই আন্দোলনের গুরুত্ব কতটুকু বলে মনে করেন?

ড. মো. রইছ উদ্দীন: আমি জুলাইয়ের ঘটনাকে শুধু একটি সরকারের পতন হিসেবে দেখি না। এটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের বহিঃপ্রকাশ। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে যখন আন্দোলন এক দফার দাবিতে রূপ নেয়, তখন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষও যুক্ত হয়। সে কারণেই আমি এটিকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বলি। এই জাগরণ ছিল মানুষের মুক্তির জাগরণ।

তিনি বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ আন্দোলনে অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরও একটি অংশ নৈতিক অবস্থান থেকে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটি একটি গৌরবময় অধ্যায় হয়ে থাকবে। তবে দুঃখের বিষয়, এত আত্মত্যাগের পরও যে পরিবর্তনের স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো হয়নি।

জাগো নিউজ: আন্দোলনে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের জন্য কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন?

ড. মো. রইছ উদ্দীন: আমার মতে, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো শহীদ ও আহতদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া। যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের জাতীয় বীরের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। যারা আহত হয়েছেন, বিশেষ করে যারা স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, তাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মানুষ যখন দেশের জন্য নিজের জীবন বা শরীরের অঙ্গ হারায়, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বাস্তব সহায়তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

জাগো নিউজ: বর্তমানে আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

ড. মো. রইছ উদ্দীন: এ ধরনের প্রবণতা আমাকে উদ্বিগ্ন করে। এই আন্দোলনের কৃতিত্ব কোনো ব্যক্তি, দল বা সংগঠনের একার নয়। এটি ছিল সাধারণ মানুষের আন্দোলন। মাঠে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছিলেন না। একজন রিকশাচালক, কাঠমিস্ত্রি, দোকানদার, শ্রমজীবী মানুষ, এমনকি মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও জীবন দিয়েছেন। তাই একজন বা কয়েকজনকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে অন্যদের অবদান আড়াল করা ঠিক হবে না। এই বিজয় ছিল মানুষের সম্মিলিত বিজয়।

জাগো নিউজ: গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর ফিরে তাকালে মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে বলে মনে করেন?

ড. মো. রইছ উদ্দীন: মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বড়। সবাই ভেবেছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা এখনো অনেক জায়গায় বিভক্তি, পারস্পরিক দোষারোপ এবং কৃতিত্বের প্রতিযোগিতা দেখছি।

এই অধ্যাপক বলেন, পরিবর্তনের অর্থ শুধু সরকার বদল নয়; পরিবর্তনের অর্থ রাষ্ট্রীয় আচরণ, প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক মূল্যবোধের পরিবর্তন। এই জায়গায় আরও অনেক কাজ বাকি।

জাগো নিউজ: বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে আপনি বারবার কথা বলেছেন। কেন এটিকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

ড. মো. রইছ উদ্দীন: কারণ বিচারহীনতা থেকেই অন্যায় শক্তিশালী হয়। যারা প্রকৃত অপরাধ করেছে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্য যে দলেরই হোক, বিচার হবে অপরাধের ভিত্তিতে, মতাদর্শের ভিত্তিতে নয়। ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা না হলে ভবিষ্যতে আবারও একই ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

জাগো নিউজ: আন্দোলনের সময় আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

ড. মো. রইছ উদ্দীন: সেই সময় প্রতিবাদ করা খুব সহজ ছিল না। আমি শিক্ষক সমিতির ব্যানারে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে উদ্যোগ সফল হয়নি। পরে ব্যক্তিগতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবস্থান জানাই। আমি মনে করেছি, সন্তানের প্রশ্নে কোনো বিভাজন হতে পারে না।

তিনি বলেন, সেসময় আমাকে এবং আমার পরিবারকেও নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। বাসায় তল্লাশি হয়েছে, ভাঙচুর হয়েছে, হুমকিও এসেছে। কিন্তু এসবের পরও মনে হয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকার চেয়ে প্রতিবাদ করাই একজন শিক্ষকের দায়িত্ব।

জাগো নিউজ: জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কী উদ্যোগ নিচ্ছে?

ড. মো. রইছ উদ্দীন: আমরা চাই, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন এই ইতিহাস দলিল ভিত্তিকভাবে জানতে পারে। সে লক্ষ্যেই কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে একটি স্থায়ী ‘জুলাই স্তম্ভ’ নির্মাণের কাজ এগোচ্ছে। জুলাই স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয়ব্যাপী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা, গবেষণা ও সম্মাননা প্রদান করা হবে।

জবি উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষার্থী ইকরামুল হক সাজিদের পরিবারকে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যনির্ভর ডকুমেন্টারি নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে কোটা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরা হবে।

জাগো নিউজ: উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে এখন সবচেয়ে বেশি কোন পরিবর্তন প্রয়োজন?

ড. মো. রইছ উদ্দীন: বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিভাজনের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি ‘টিম জগন্নাথ’ ধারণায় বিশ্বাস করি। মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। একই সঙ্গে দাবি আদায়ের ক্ষেত্রেও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। ‘মব কালচার’ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইতিবাচক সংস্কৃতি নয়।

জাগো নিউজ: গণঅভ্যুত্থানের মূল শিক্ষা কী বলে মনে করেন?

ড. মো. রইছ উদ্দীন: সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো মত বা সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যের অধিকার নষ্ট করা যাবে না। মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আইনের শাসনের ওপর দাঁড়িয়ে একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারলেই জুলাইয়ের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।

জাগো নিউজ: জাগো নিউজকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. মো. রইছ উদ্দীন: জাগো নিউজকেও অনেক ধন্যবাদ।

এমডিএএ/ইএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow