জোয়ার-বর্ষণে বিপর্যস্ত দক্ষিণাঞ্চল, বড় ক্ষতির মুখে কৃষি ও মৎস্য খাত

টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে তছনছ হয়ে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও মৎস্য খাত। কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে বরিশাল বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে প্লাবিত হয়েছে অসংখ্য পুকুর, ঘের ও জলাশয়। এতে ভেসে গেছে মাছ ও মাছের পোনা। প্রাথমিক হিসাবে কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৩৮ কোটি টাকার বেশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাতে প্রায় ১৮ কোটি এবং মৎস্য খাতে ২০ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া পটুয়াখালীতে দুর্যোগের মধ্যে মাছ ধরতে গিয়ে পাঁচ জেলের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অবিরাম বর্ষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চল। পাকা ধান, শাকসবজি, রোপা আমনের বীজতলা ও বিভিন্ন উদ্যান ফসল পানিতে ডুবে গেছে। অনেক এলাকায় জমে থাকা পানিতে সদ্য রোপণ করা ধানের চারা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল খামারবাড়ির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ৯ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে বরিশাল অঞ্

জোয়ার-বর্ষণে বিপর্যস্ত দক্ষিণাঞ্চল, বড় ক্ষতির মুখে কৃষি ও মৎস্য খাত

টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে তছনছ হয়ে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও মৎস্য খাত। কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে বরিশাল বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে প্লাবিত হয়েছে অসংখ্য পুকুর, ঘের ও জলাশয়। এতে ভেসে গেছে মাছ ও মাছের পোনা। প্রাথমিক হিসাবে কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৩৮ কোটি টাকার বেশি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাতে প্রায় ১৮ কোটি এবং মৎস্য খাতে ২০ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া পটুয়াখালীতে দুর্যোগের মধ্যে মাছ ধরতে গিয়ে পাঁচ জেলের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অবিরাম বর্ষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চল। পাকা ধান, শাকসবজি, রোপা আমনের বীজতলা ও বিভিন্ন উদ্যান ফসল পানিতে ডুবে গেছে। অনেক এলাকায় জমে থাকা পানিতে সদ্য রোপণ করা ধানের চারা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল খামারবাড়ির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ৯ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে বরিশাল অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ৪১ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৯ হাজার ৯১৯ মেট্রিক টন ফসল নষ্ট হয়েছে। যার আনুমানিক আর্থিক মূল্য ১৭ কোটি ৮৮ লাখ ২৯ হাজার ৯০০ টাকা।

জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ফসল আক্রান্ত হয়েছে বরগুনা জেলায়। সেখানে ৬ হাজার ৭০৯ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।

আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পিরোজপুরে, প্রায় ১ হাজার ৪৬৫ হেক্টর। একই জেলায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে ২৫৭ হেক্টর জমির ফসল, যা পুরো অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভোলা জেলা।

পিরোজপুরে প্রায় ২৩ হাজার ৯২৫ মেট্রিক টন আমনের বীজতলা এবং ১ হাজার ৬৮০ মেট্রিক টন গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি নষ্ট হয়েছে। ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৬৪৩ মেট্রিক টন, পটুয়াখালীতে ২৪৪ মেট্রিক টন, বরগুনায় ৪৯৮ মেট্রিক টন এবং ভোলায় ১ হাজার ৯৬০ মেট্রিক টন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কৃষি বিভাগের হিসাবে, ভোলায় প্রায় ৯ কোটি টাকা, পিরোজপুরে ৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, ঝালকাঠিতে ২ কোটি ৪৫ লাখ ৪ হাজার টাকা, পটুয়াখালীতে ১ কোটি ৩ লাখ ১৫ হাজার ৯০০ টাকা এবং বরগুনায় ৮৪ লাখ ১০ হাজার টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি পিরোজপুরে, যেখানে ২৫ হাজার ৮০০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এছাড়া পটুয়াখালীতে ৮ হাজার ৭৭০, ভোলায় ৩ হাজার ৮০০, ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৭১৫ এবং বরগুনায় ১ হাজার ১২৫ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এদিকে বরিশাল আঞ্চলিক মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল ও ঝালকাঠি ছাড়া বিভাগের বাকি জেলাগুলোতে মৎস্য খাতে এখন পর্যন্ত ২০ কোটি ৩০ লাখ ২৪ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ১৪৪টি ইউনিয়নের ৬ হাজার ৪৬৯টি মাছের পুকুর ও খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৪৫৫ হেক্টর পুকুর, ঘের ও জলাশয় প্লাবিত হয়ে ৭৪৭ টন মাছ, ৯৩ লাখ মাছের পোনা, ৪৫ মেট্রিক টন চিংড়ি ও বিপুল পরিমাণ পিএল (চিংড়ির পোনা) ভেসে গেছে।

মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, রুই, কাতলা, মৃগেল, মাগুর ও কৈসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে। অনেক চাষি নেট দিয়ে ঘের রক্ষার চেষ্টা করলেও প্রবল বৃষ্টি ও জোয়ারের কারণে তা সম্ভব হয়নি।

মৎস্য বিভাগ জানায়, দুর্যোগের সময় নদী ও সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে পটুয়াখালীর গলাচিপায় পাঁচ জেলের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া গলাচিপায় ১২ জন, কলাপাড়ায় ১২ জন এবং মির্জাগঞ্জে একজন জেলে আহত হয়েছেন।

বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই এমন ক্ষতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের কৃষক ও মৎস্যচাষিরা। অনেকের স্বপ্ন ভেসে গেছে জোয়ারের পানিতে।

কলাপাড়ার সোনাতলা গ্রামের আব্দুর রহিম বলেন, আশপাশের অনেক ঘের পানিতে ভেসে গেছে। এতে মৎস্যচাষিদের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।

একই উপজেলার হাজীপুর গ্রামের মো. পাভেল বলেন, আমিসহ এলাকার অনেকেই মাছের ঘের করেছিলাম। টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে সব মাছ ভেসে গেছে।

বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের কৃষক রফিক মিয়া বলেন, ভালো ফলনের আশা ছিল। কিন্তু বৃষ্টি ও জোয়ারে সেই স্বপ্ন ভেসে গেছে।

বরিশাল সদর উপজেলার চাঁদপুরা ইউনিয়নের কৃষক রিয়াজ বলেন, ধান কাটার আগেই ক্ষেত ডুবে গেছে। বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান কাটতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ও চালের মান দুটোই কমবে।

ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের কৃষক সিরাজ মিয়া বলেন, অনেক জমি এখনো পানির নিচে। অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশনের কারণে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের দাবি, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে ক্ষতিপূরণ ও সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা দিতে হবে। অন্যথায় অনেকেই আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না।

বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের কারণে বিভাগের বিভিন্ন জেলায় কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন।

অন্যদিকে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত চাষি ও উদ্যোক্তাদের তালিকা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow