টাঙ্গুয়ার হাওরে ভ্রমণের সেরা সময় কখন?

মিষ্টি জলের হাওর-বাঁওড় বাংলাদেশের অন্যতম বিস্ময়। বর্ষাকালে যেন এক সমুদ্দুর, যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। আকাশ আর জলের মিলনের মাঝে মাঝে চোখে পড়ে একেকটি বাড়ি। যেন জলের ওপর ভেলার মতো বাড়িগুলো ভাসছে। দূর থেকে একেকটি বাড়িকে মনে হয় একেকটি দ্বীপ। চারপাশের জলের নাচনের মধ্যে মহিষের মতো গলা উঁচু করে আকাশ দেখে হিজল-করচ গাছ। তার পাশ দিয়ে নৌকা নিয়ে চলাচল করে হাওরের মানুষ। নতুন কোনো পর্যটক যদি হাওরের রূপ-মাধুরী প্রথম দেখেন, তাহলে তার কাছে সমুদ্র বলে ভ্রম হতে পারে। জ্যোৎস্না রাতে হাওর তার সৌন্দর্যের সুধা ঢেলে দেয়। মানুষ অবলোকন করে হাওরের অপরূপ দৃশ্য। কখনো কখনো জ্যোৎস্না রাতে ভরা হাওরে বসে গানের আসর। হাওর যে মানুষকে এতটা মুগ্ধ করতে পারে, তা না দেখলে বোঝার উপায় নেই। ভরা হাওরের ঠিক বিপরীত চিত্র ফুটে ওঠে শুকনো মৌসুমে। শীত ঋতুতে বসে রঙ-বেরঙের পাখির মেলা। হাওর পাড়ে দেখা যায় বিভিন্ন ঘাস ও নলখাগড়ার ঝোপ। এই ঝোপ-ঝাড়গুলো বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আশ্রয় ও প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাওরের মাঠে-ঘাটে ফোটে বুনোফুল, ভ্রমর গান গেয়ে মধু সংগ্রহ করে। শুকনো মাঠে সোনালি ধানের হাসির ঝিলিক, বাথানে গরু-মহিষ-ছাগল, বিল

টাঙ্গুয়ার হাওরে ভ্রমণের সেরা সময় কখন?

মিষ্টি জলের হাওর-বাঁওড় বাংলাদেশের অন্যতম বিস্ময়। বর্ষাকালে যেন এক সমুদ্দুর, যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। আকাশ আর জলের মিলনের মাঝে মাঝে চোখে পড়ে একেকটি বাড়ি। যেন জলের ওপর ভেলার মতো বাড়িগুলো ভাসছে। দূর থেকে একেকটি বাড়িকে মনে হয় একেকটি দ্বীপ। চারপাশের জলের নাচনের মধ্যে মহিষের মতো গলা উঁচু করে আকাশ দেখে হিজল-করচ গাছ। তার পাশ দিয়ে নৌকা নিয়ে চলাচল করে হাওরের মানুষ।

নতুন কোনো পর্যটক যদি হাওরের রূপ-মাধুরী প্রথম দেখেন, তাহলে তার কাছে সমুদ্র বলে ভ্রম হতে পারে। জ্যোৎস্না রাতে হাওর তার সৌন্দর্যের সুধা ঢেলে দেয়। মানুষ অবলোকন করে হাওরের অপরূপ দৃশ্য। কখনো কখনো জ্যোৎস্না রাতে ভরা হাওরে বসে গানের আসর। হাওর যে মানুষকে এতটা মুগ্ধ করতে পারে, তা না দেখলে বোঝার উপায় নেই। ভরা হাওরের ঠিক বিপরীত চিত্র ফুটে ওঠে শুকনো মৌসুমে। শীত ঋতুতে বসে রঙ-বেরঙের পাখির মেলা।

হাওর পাড়ে দেখা যায় বিভিন্ন ঘাস ও নলখাগড়ার ঝোপ। এই ঝোপ-ঝাড়গুলো বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আশ্রয় ও প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাওরের মাঠে-ঘাটে ফোটে বুনোফুল, ভ্রমর গান গেয়ে মধু সংগ্রহ করে। শুকনো মাঠে সোনালি ধানের হাসির ঝিলিক, বাথানে গরু-মহিষ-ছাগল, বিলে মাছ ধরার ব্যস্ততা নিয়ে দেশের অপূর্ব দর্শনীয় ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ স্থান হাওর। মিষ্টি জলের ধূ ধূ এই সাগর সহজেই ইন্দ্রজালের মতো মোহাবিষ্ট করে ভালো লাগার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

কোথায় ‘টাঙ্গুয়ার হাওর’

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরটি বিস্মিত করে যে কাউকেই। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য পাহাড় ও হাওরের জলরাশি তার নিচে জলজ উদ্ভিদ দেখতে হাজারো পর্যটক ছুটে চলেন, ঘোরেন টাঙ্গুয়ার জলবুকে। জুন থেকেই শুরু হয় ‘টাঙ্গুয়ার মৌসুম’।

যা যা দেখতে পাবেন

ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জে স্রষ্টা যেন অকৃপণ হাতে বিলিয়ে দিয়েছেন অফুরন্ত সম্পদ, সম্ভাবনা আর অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য। সারি সারি হিজল, করচসহ বিভিন্ন জাতের গাছপালা। হাওরের বুকে জলজ উদ্ভিদ, লতা, গুল্ম, গুচ্ছ জলরাশি, বিরল ও বিলুপ্ত প্রায় নানা জাতের মৎস্য সম্পদ। পাখির এক নিরাপদ আবাসস্থল টাঙ্গুয়ার হাওর। শুধু তা-ই নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মূল্যবান সম্পদের কারণে টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের মানচিত্রে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছে।

haor

বর্ষায় দিগন্তবিস্তৃত জলরাশির ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে হিজল ও করচ গাছের বাগান। তখন তীরের গ্রামগুলোকে মনে হয় ছোট ছোট দ্বীপ। হাওরের উত্তরে সবুজে মোড়া মেঘালয় পাহাড়। পাহাড়ের পাদদেশে স্বাধীনতা উপত্যকা, শহীদ সিরাজ লেক, নিলাদ্রী ডিসি পার্ক। হাওরে ঘেরা এ অঞ্চলে সারাদিনই আকাশে শুভ্র মেঘের ওড়াউড়ি চলে। বিকেলের রোদে মেঘের ছায়া পড়ে নীল হয়ে ওঠে হাওরের জল। তখন পুরো এলাকাকে স্বপ্নের মতো মনে হয়।

যাদুকাটা ও পাতলাই

টাঙ্গুয়ার হাওরের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে অনন্য সুন্দর যাদুকাটা আর পাতলাই নদী। হাওর ভ্রমণের পাশাপাশি পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে এ দুই নদী। এই দুটি নদীর পানি যেমন টলটলে; তেমনই এর দুই পাশের দৃশ্যও অনন্য সুন্দর। যাদুকাটা নদী ধরে চলে যাওয়া যায় ভারত সীমান্তবর্তী বারেকের টিলায়। আর যাদুকাটা তীরের বিশাল শিমুল বাগানও ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ফুলে ফুলে ভরা থাকে।

ভ্রমণের সেরা সময়

বছরের প্রতি মৌসুমেই হাওরের চেহারা বদলে যায়। তবে ভ্রমণের উপযুক্ত সময় বর্ষার মাঝামাঝি থেকে শরৎ পর্যন্ত। মাসের হিসেবে জুনের শেষ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাওর ভ্রমণের সেরা সময়। তাছাড়া শীতের সময়ে গেলে দেখা মিলবে চেনা-অচেনা হাজারো অতিথি পাখ-পাখালির।

অপেক্ষায় নৌকা-হাউজ বোট

টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরে বেড়াতে বেশ ভালো সুযোগ-সুবিধা আছে পর্যটকদের জন্য। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পর্যটকদের জন্য ভাড়ায় মেলে বেশ কিছু ছোট-বড় নৌকা ও হাউজ বোট। এসব হাউজ বোটে আছে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। জ্যোৎস্না রাতে নৌকায় নেচে–গেয়ে আনন্দ করেন পর্যটকেরা। তবে এসব নৌকা ভাড়া নিতে আগে যোগাযোগ করা ভালো। পাশাপাশি স্পিড বোটও আছে। স্পিড বোটের ভাড়া বেশি। যারা কম সময়ে হাওর ঘুরে দেখতে চান, তাদের জন্য স্পিড বোট ভালো।

হাউজ বোট ভাড়া করতে হলে আগে থেকেই বুকিং করতে হয়। এ জন্য ইন্টারনেট সার্চ করতে পারেন। হাউজ বোটে ভ্রমণ করতে চাইলে আপনার কাজ হবে শুধু সুনামগঞ্জ বা তাহিরপুর পৌঁছানো। এরপর ভ্রমণের সব দায়িত্ব হাউজ বোটের। তবে হাউজ বোট সুনামগঞ্জ শহরের সাহেব বাড়ি ঘাট থেকে ছাড়বে, নাকি তাহিরপুর থেকে ছাড়বে, তা আগে থেকেই জেনে নিতে হবে। সাহেব বাড়ি ঘাট থেকে হাউজ বোট ছাড়লে তখন কষ্ট করে তাহিরপুর যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ

প্রতিদিন ঢাকার সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে মামুন ও শ্যামলী পরিবহনের বাস সরাসরি সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এ ছাড়া মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে একাধিক বাস ছেড়ে যায়। এসব নন-এসি বাসে জনপ্রতি টিকিট কাটতে খরচ হবে ৮২০-৮৫০ টাকা। ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ পৌঁছাতে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় লাগে।

সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ

সিলেটের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড থেকে সুনামগঞ্জ যাওয়ার লোকাল ও সিটিং বাস আছে। সিটিং বাস ভাড়া ১০০ টাকা, সুনামগঞ্জ যেতে ২ ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। অথবা শাহজালাল মাজারের সামনে থেকে লাইট গাড়িতে ২০০ টাকায় সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়।

haor

সুনামগঞ্জ থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর

সুনামগঞ্জ নেমে সুরমা নদীর ওপর নির্মিত বড় ব্রিজের কাছে লেগুনা বা সিএনজি অথবা বাইক করে তাহিরপুরে সহজেই যাওয়া যায়। তাহিরপুরে নৌকাঘাট থেকে আকার এবং সামর্থ অনুযায়ী নৌকা বা স্পিড বোট ভাড়া করে বেড়িয়ে আসুন টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে।

থাকা-খাওয়া

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় টাঙ্গুয়ার হাওরে রাতযাপনের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৩ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্পের রেস্ট হাউজে অবস্থান করা যায়। ঘর ভাড়া করতে চাইলে টেকেরঘাট এলাকায় হাওর বিলাস নামে কাঠের বাড়িতে কম মূল্যে রুম ভাড়া নিয়ে থাকতে পারবেন। তবে টাঙ্গুয়ার হাওরে নৌকায় এক রাত থাকার অভিজ্ঞতা নিলে অবশ্যই ভালো লাগবে।

বর্তমানে টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে আসার জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন শতাধিক হাউজ বোট আছে। এগুলোতে খাওয়া-দাওয়া, রাতে থাকাসহ ২ দিন ১ রাত ভ্রমণের সব ব্যবস্থা থাকে। খরচ হবে জনপ্রতি ৬-৮ হাজার টাকা। তবে দল যদি অনেক বড় হয়, যেমন ১৬-২০ জনের মতো হলে; তখন জনপ্রতি ভাড়া অনেকটাই কমে আসবে। তখন জনপ্রতি ৪-৫ হাজার টাকার মতো খরচ হবে।

নৌকা ভাড়া

নৌকার ভাড়া কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন নৌকার আকার, ধারণক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা, মৌসুম ইত্যাদি। এ ছাড়া ছুটির দিনে ভাড়া সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকে। এক রাত থাকার জন্য ছোট নৌকাগুলোর ভাড়া পড়ে ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা, মাঝারি আকারের নৌকাগুলোর ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার এবং বড় নৌকাগুলোর ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকার মতো।

সতর্কতা

হাওর ভ্রমণকালে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট সঙ্গে নিন। হাওরে বজ্রপাত হলে নৌকার ছৈয়ের নিচে অবস্থান করুন। খরচ কমাতে যে কোনো কিছুর জন্য দামাদামি করে নিবেন। একসঙ্গে গ্রুপ করে গেলে খরচ কম হবে। ৪-৫ জন বা ৮-১০ জনের গ্রুপ হলে ভালো।

পরিবেশ রক্ষায় করণীয়

টাঙ্গুয়ার জলাবনের কোনো রূপ ক্ষতিসাধন না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। খাবারের অতিরিক্ত অংশ বা উচ্ছিষ্ট, প্যাকেট ইত্যাদি হাওরের পানিতে ফেলা থেকে বিরত থাকুন। রাতের বেলা অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো উৎপন্ন করবেন না। উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী মাইক বা যন্ত্র পরিহার করুন। টাঙ্গুয়ার মাছ, বন্যপ্রাণী কিংবা পাখি ধরা বা এদের জীবন হুমকির মধ্যে পড়ে এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow