ট্রেতে বাড়ছে চাষের চারা, পলিনেট হাউজে বদলাচ্ছে রাজশাহীর কৃষি

একসময় বৃষ্টি হলেই বীজতলা নষ্ট হওয়ার দুশ্চিন্তায় থাকতেন কৃষকরা। এখন সেই চারা তৈরি হচ্ছে প্লাস্টিকের ট্রেতে। নারকেলের ছোবড়া থেকে তৈরি কোকোপিটে, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের পলিনেট হাউসে বেড়ে উঠছে হাজার হাজার সবজির চারা। রাজশাহীর পবা উপজেলায় কয়েকজন কৃষকের এই উদ্যোগ শুধু উন্নতমানের চারা উৎপাদনেই নয়, জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সম্ভাবনাও বাড়ছে। রাজশাহীর পবা উপজেলার কশবা এলাকায় কৃষক নজরুল ইসলামের বাড়ির আঙিনায় গড়ে উঠেছে প্রায় ২০০ বর্গমিটার আয়তনের একটি পলিনেট হাউজ। এখানেই প্লাস্টিকের বিশেষ ট্রেতে কোকোপিট ব্যবহার করে উৎপাদন করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সবজির চারা। নিজের জমিতে চাষের পাশাপাশি এসব চারা বিক্রি করেও বাড়তি আয় করছেন তিনি। শুধু স্থানীয় কৃষকই নন, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও কৃষকরা উন্নতমানের চারা সংগ্রহ করতে আসছেন তার এই নার্সারিতে। আরও পড়ুন আম রক্ষার ফ্রুট ব্যাগই এখন চাষির গলার কাঁটা বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প (প্রথম সংশোধিত)-এর আওতায় ২০০ বর্গমিটার জায়গায় সরকারি অর্থায়নে কৃষক নজরুল ইসলামকে পলিনেট হাউজ নির্মাণ করে দেন কৃষি সম্প্রসারণ

ট্রেতে বাড়ছে চাষের চারা, পলিনেট হাউজে বদলাচ্ছে রাজশাহীর কৃষি

একসময় বৃষ্টি হলেই বীজতলা নষ্ট হওয়ার দুশ্চিন্তায় থাকতেন কৃষকরা। এখন সেই চারা তৈরি হচ্ছে প্লাস্টিকের ট্রেতে। নারকেলের ছোবড়া থেকে তৈরি কোকোপিটে, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের পলিনেট হাউসে বেড়ে উঠছে হাজার হাজার সবজির চারা। রাজশাহীর পবা উপজেলায় কয়েকজন কৃষকের এই উদ্যোগ শুধু উন্নতমানের চারা উৎপাদনেই নয়, জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সম্ভাবনাও বাড়ছে।

রাজশাহীর পবা উপজেলার কশবা এলাকায় কৃষক নজরুল ইসলামের বাড়ির আঙিনায় গড়ে উঠেছে প্রায় ২০০ বর্গমিটার আয়তনের একটি পলিনেট হাউজ। এখানেই প্লাস্টিকের বিশেষ ট্রেতে কোকোপিট ব্যবহার করে উৎপাদন করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সবজির চারা। নিজের জমিতে চাষের পাশাপাশি এসব চারা বিক্রি করেও বাড়তি আয় করছেন তিনি। শুধু স্থানীয় কৃষকই নন, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও কৃষকরা উন্নতমানের চারা সংগ্রহ করতে আসছেন তার এই নার্সারিতে।

বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প (প্রথম সংশোধিত)-এর আওতায় ২০০ বর্গমিটার জায়গায় সরকারি অর্থায়নে কৃষক নজরুল ইসলামকে পলিনেট হাউজ নির্মাণ করে দেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এছাড়া পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে পবা উপজেলার খড়খড়ি এলাকায় একটি পলিনেট হাউজও স্থাপন করা হয়। সেই উদ্যোগ দেখে অনেক কৃষক এখন নিজ উদ্যোগেও পলিনেট হাউজ নির্মাণে আগ্রহী হচ্ছেন।

‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিরাপদ ও মানসম্মত চারা উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। পলিনেট হাউসে উৎপাদিত চারা রোগবালাইমুক্ত, সমবয়সী এবং জমিতে রোপণের পর দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কৃষকদের এই প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো রাজশাহীতেও প্রচলিত বীজতলা নানা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। খড়া, তীব্র তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং বিভিন্ন রোগবালাইয়ের কারণে সময়মতো মানসম্মত চারা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে মৌসুমি সবজি চাষে বিলম্ব হচ্ছে, উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং কৃষককে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় পলিনেট হাউজে ট্রে-ভিত্তিক চারা উৎপাদনকে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

ট্রেতে বাড়ছে চাষের চারা, পলিনেট হাউসে বদলাচ্ছে রাজশাহীর কৃষি

জানা গেছে, পলিনেট হাউস মূলত গ্রিনহাউসের আদলে তৈরি একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, যেখানে চারা উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা, আলো ও আর্দ্রতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এতে ভারী বৃষ্টি, অতিরিক্ত রোদ, পোকামাকড় ও ভাইরাসজনিত রোগের প্রভাব কমে আসে। প্রচলিত মাটির বীজতলার পরিবর্তে এখানে ব্যবহৃত হয় নারকেলের ছোবড়া থেকে তৈরি জীবাণুমুক্ত কোকোপিট। এই মাধ্যমে চারার শিকড় সহজে বিস্তার লাভ করে এবং মাটিবাহিত রোগের ঝুঁকিও কমে যায়।

নজরুল ইসলামের পলিনেট হাউসে প্রতিটি বীজ আলাদা সেলে থাকা প্লাস্টিক ট্রেতে বপন করা হয়। ট্রেগুলোতে আগে থেকেই কোকোপিট ভরে রাখা হয়। এরপর নির্দিষ্ট পরিচর্যা ও সেচের মাধ্যমে মাত্র ১৮ থেকে ২০ দিনের মধ্যে চারাগুলো রোপণের উপযোগী হয়ে ওঠে। ট্রে থেকে চারা তুললেও শিকড়ের কোনো ক্ষতি হয় না। ফলে জমিতে রোপণের পর চারার মৃত্যুহার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি থাকে।

‌‘আগে মাটির বীজতলায় চারা তৈরি করতাম। কিন্তু একটু বেশি বৃষ্টি হলেই বীজতলা নষ্ট হয়ে যেত, আবার গরম বেশি পড়লেও চারার ক্ষতি হতো। এতে সময় ও অর্থের ক্ষতি হতো। পরে কৃষি বিভাগের পরামর্শে পলিনেট হাউজে কোকোপিট ব্যবহার করে ট্রেতে চারা উৎপাদন শুরু করি। এখন প্রায় ৯০ শতাংশ বীজ অঙ্কুরিত হয় এবং চারাগুলোও সমানভাবে বেড়ে ওঠে।’

পলিনেট হাউজের ভেতরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে শেডনেট ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি পোকামাকড় দমনে বিভিন্ন আধুনিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উৎপাদিত হওয়ায় চারাগুলো সমানভাবে বৃদ্ধি পায় এবং রোপণের পর দ্রুত জমির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

বর্তমানে পলিনেট হাউসে কাঁচা মরিচ, বারোমাসি মরিচ, টমেটো, বেগুন, লাউ, পেঁপেসহ বিভিন্ন সবজির চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। প্রতিটি চারা দুই থেকে তিন টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ছাদবাগানের জন্যও বিভিন্ন ধরনের সবজির চারা পাওয়া যায় এখানে।

ট্রেতে বাড়ছে চাষের চারা, পলিনেট হাউসে বদলাচ্ছে রাজশাহীর কৃষি

উদ্যোক্তা কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, আগে মাটির বীজতলায় চারা তৈরি করতাম। কিন্তু একটু বেশি বৃষ্টি হলেই বীজতলা নষ্ট হয়ে যেত, আবার গরম বেশি পড়লেও চারার ক্ষতি হতো। এতে সময় ও অর্থের ক্ষতি হতো। পরে কৃষি বিভাগের পরামর্শে পলিনেট হাউজে কোকোপিট ব্যবহার করে ট্রেতে চারা উৎপাদন শুরু করি। এখন প্রায় ৯০ শতাংশ বীজ অঙ্কুরিত হয় এবং চারাগুলোও সমানভাবে বেড়ে ওঠে।

তিনি আরও বলেন, শিকড় ভালো থাকায় জমিতে লাগানোর পর চারার মৃত্যুহার খুবই কম। শুধু নিজের জমিতে ব্যবহার করছি না, আশপাশের অনেক কৃষকও এখান থেকে চারা নিয়ে আবাদ করছেন। শুরুতে পলিনেট হাউজে নির্মাণে কিছুটা খরচ হয়েছে, তবে এখন চারা বিক্রি করেও ভালো আয় হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও চারা উৎপাদন নিয়ে আগের মতো দুশ্চিন্তা করতে হয় না। কৃষকরা সময়মতো উন্নতমানের চারা পাচ্ছেন, এতে সবাই উপকৃত হচ্ছেন।

‘আমাদের এখানে কাঁচা মরিচ, বারোমাসি মরিচ, টমেটো, বেগুন, লাউ, পেঁপেসহ বিভিন্ন ধরনের চারা পাওয়া যায়। কোকোপিটে উৎপাদিত চারার শিকড় ভালো হয় এবং নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। কৃষকদের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। সরকারি অর্থায়নে এই হাউজ করে দেওয়া হয়েছে। চাহিদা বাড়লে হাউজের আয়তন আরও বাড়ানো হবে।’

পাশের এলাকার কৃষক খালেদ বলেন, আগেও এখান থেকে বেগুনের চারা নিয়েছিলাম। ফলন ভালো হয়েছিল। এবার আবার ৩০০টি গ্রিন বল বেগুনের চারা কিনেছি। এছাড়াও বারোমাসি চারা এখানে পাওয়া যায়। ফলনও ভালো বেশ ভালোই হয় বলে জানান তিনি।

আরেক কৃষক সিদ্দিক মোল্ল্যা বলেন, প্রথমবারের মতো ৫০০টি মরিচের চারা কিনেছি। জমিতে লাগানোর পর ফলন ভালো হলে ভবিষ্যতে এখান থেকেই নিয়মিত চারা নেব।

পলিনেট হাউসের পরিচর্যাকারী খালেদ মাহমুদ বলেন, আমাদের এখানে কাঁচা মরিচ, বারোমাসি মরিচ, টমেটো, বেগুন, লাউ, পেঁপেসহ বিভিন্ন ধরনের চারা পাওয়া যায়। কোকোপিটে উৎপাদিত চারার শিকড় ভালো হয় এবং নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। কৃষকদের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। সরকারি অর্থায়নে এই হাউজ করে দেওয়া হয়েছে। চাহিদা বাড়লে হাউজের আয়তন আরও বাড়ানো হবে।

ট্রেতে বাড়ছে চাষের চারা, পলিনেট হাউসে বদলাচ্ছে রাজশাহীর কৃষি

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, প্রচলিত বীজতলায় বীজ বপনের পর অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, তীব্র রোদ কিংবা ছত্রাকজনিত রোগে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চারা নষ্ট হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে পুনরায় বীজ বপন করতে হয়, এতে সময় ও উৎপাদন ব্যয় দুটোই বেড়ে যায়। কিন্তু ট্রেতে প্রতিটি বীজ আলাদা সেলে থাকায় একটি চারার সমস্যা অন্য চারায় ছড়ায় না। ফলে চারার মান সমান থাকে এবং বীজের অপচয়ও কম হয়।

পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিরাপদ ও মানসম্মত চারা উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। পলিনেট হাউজে উৎপাদিত চারা রোগবালাইমুক্ত, সমবয়সী এবং জমিতে রোপণের পর দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কৃষকদের এই প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী বলেন, রাজশাহীতে আধুনিক চারা উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে মানসম্মত চারা উৎপাদন বাড়লে কৃষক সময়মতো আবাদ করতে পারবেন, উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং সবজি উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।

এনএইচআর/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow