সম্প্রতি ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়ায় অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। নিজেদের উপকূলীয় এলাকা থেকে ২ হাজার মাইলেরও (৩ হাজার কিলোমিটারের বেশি) বেশি দূরে অবস্থিত এ ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে।
এমন ঘটনা পর তেহরানের সামরিক সক্ষমতা এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা কতদূর, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সিএনএন-কে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় শুক্রবার (২০ মার্চ) সকালে ইরান ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়ার মার্কিন-ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে দুটি মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তবে কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই ঘাঁটিতে আঘাত হানতে পারেনি। সামরিক ঘাঁটিকে শত্রুদেশের নাগালের বাইরে রাখার জন্য মহাসাগরের অত্যন্ত দুর্গম এলাকা ডিয়েগো গার্সিয়ায় তৈরি করা হয়েছিল; সেখানে এটিই প্রথম কোনো হামলার প্রচেষ্টা।
হামলাটি সফল না হলেও এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান তাদের নিজেদের ওপর আরোপ করা ২ হাজার কিলোমিটার পাল্লার সীমাবদ্ধতা হয়তো আর মেনে চলছে না। এর ফলে আগের ধারণার চেয়েও দূরবর্তী মার্কিন ও ইউরোপীয় লক্ষ্যবস্তুর ওপর তেহরান আঘাত হানতে পারে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মিডলবারি কলেজ অফ গ্লোবাল সিকিউরিটির বিশিষ্ট পণ্ডিত জেফরি লুইস সিএনএন-কে বলেন, ইরান একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছিল। তবে ২০১৭ সালে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আলী হোসেইনি খামেনি ২ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ওপর সীমা আরোপ করায় তা মহাকাশে যান উৎক্ষেপণের কাজে ব্যবহার করা শুরু হয়। লুইস বলেন, ‘তারা খামেনির মত পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছিল। এখন তিনি মৃত।’
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পার্সি মনে করেন, আমেরিকার মূল ভূখণ্ড আপাতত নিরাপদ। তবে তিনি বলেন, ‘এই হামলা থেকে বোঝা যায় যে আমেরিকার যে ঘাঁটিগুলো ইরানের নাগালের বাইরে মনে করা হতো, সেগুলো আসলে এখন আওতার মধ্যে চলে এসেছে। এর মধ্যে ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে সরিয়ে রাখা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।’
পার্সি আরও উল্লেখ করেন, এই ঘটনাটি রোমানিয়াসহ যেসব ইউরোপীয় দেশ মার্কিন বাহিনীকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, তাদের নতুন করে ভাবাতে পারে। এর ফলে ওই ঘাঁটিগুলোও এখন ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যা খুব শিগগিরই আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পারে। তবে ২০২৫ সালের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির একটি মূল্যায়ন অনুযায়ী, তেহরান চাইলে ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিকভাবে কার্যকর আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে।
জেমস মার্টিন সেন্টার ফর নন-প্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার সিএনএন-কে বলেন, ‘মানুষ প্রায়ই ভুলে যায় মহাকাশযান উৎক্ষেপণের প্রযুক্তি আর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি মূলত একই।’
তিনি মনে করেন, ইরান হয়তো তাদের ‘কায়েম-১০০’-এর মতো রকেটগুলোকে ব্যালিস্টিক কাজে ব্যবহার করে এই দীর্ঘ দূরত্বে পৌঁছেছে অথবা ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরক ওজন কমিয়ে পাল্লা বাড়িয়েছে।
তবে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানার জন্য প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য ইরানের আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পার্সি। তার মতে, ডিয়েগো গার্সিয়ার মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঠিক অবস্থান বা গতিবিধির তথ্য ইরান সম্ভবত রাশিয়া বা চীনের কাছ থেকে পাচ্ছে। সিএনএন-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, রাশিয়া বর্তমানে মার্কিন সেনা, জাহাজ ও বিমানের অবস্থান সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে ইরানকে সহায়তা করছে।