তোফায়েল আহমেদের বিদায়: নীরবতায় সরব ইতিহাস
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না; তা ছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার তরুণ সমাজের রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি হিসেবে তিনি ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং একাধিকবার মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশে অল্প বয়সে সংসদ সদস্য হওয়ার ইতিহাস আরও আছে। কিন্তু তোফায়েল আহমেদকে আলাদা করে চিহ্নিত করে তাঁর সময়, তাঁর ভূমিকা এবং তাঁর রাজনৈতিক সাহস। তিনি ছিলেন উত্তাল ঊনসত্তর ও একাত্তরের এক অগ্নিমুখর তরুণ, যিনি লাখো মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ছাত্রনেতাদের যে ক্ষুদ্র বৃত্তটি ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়, তোফায়েল আহমদ ছিলেন তাদের অন্যতম। তাঁর মৃত্যু আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—রাষ্ট্র কি যথাযথভাবে তাঁকে সম্মান জানিয়েছে? তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না; তা ছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার তরুণ সমাজের রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি হিসেবে তিনি ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং একাধিকবার মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশে অল্প বয়সে সংসদ সদস্য হওয়ার ইতিহাস আরও আছে। কিন্তু তোফায়েল আহমেদকে আলাদা করে চিহ্নিত করে তাঁর সময়, তাঁর ভূমিকা এবং তাঁর রাজনৈতিক সাহস। তিনি ছিলেন উত্তাল ঊনসত্তর ও একাত্তরের এক অগ্নিমুখর তরুণ, যিনি লাখো মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ছাত্রনেতাদের যে ক্ষুদ্র বৃত্তটি ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়, তোফায়েল আহমদ ছিলেন তাদের অন্যতম।
তাঁর মৃত্যু আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—রাষ্ট্র কি যথাযথভাবে তাঁকে সম্মান জানিয়েছে?
তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন গণআন্দোলনের সংগঠক এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসের একজন প্রত্যক্ষ অংশীদার। এমন একজন মানুষের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে মাত্রার শ্রদ্ধা ও স্মরণ প্রত্যাশিত ছিল, তা দৃশ্যমান হয়নি বলেই অনেকের মনে হয়েছে।
অনেকে বলতে পারেন, অতীতেও এমন ঘটেছে। সত্যি বলতে, মতিয়া চৌধুরীর মৃত্যুর সময়ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তখন অনেকে যুক্তি দিয়েছিলেন, ক্ষমতার কাঠামোয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। সেই সমালোচনা রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়—বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণের একটি ন্যূনতম মানদণ্ড কি থাকা উচিত নয়?
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান সরকার ও বিএনপি—উভয়েই নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার বহনকারী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। নির্বাচনী প্রচারে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতার ঘোষণা, জাতীয়তাবাদ—এসব প্রশ্ন বারবার সামনে আসে। তাহলে একজন মুক্তিযোদ্ধা ও জাতীয় রাজনীতির প্রবীণ ব্যক্তিত্বের বিদায়ে যথোচিত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও কি একই দায়বদ্ধতা থাকা উচিত নয়?
গণমাধ্যমের ভূমিকাও আলোচনার দাবি রাখে। কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে তাঁর মৃত্যু নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাভারেজ দেখা যায়নি। তবে এটাও সত্য যে আজকের কর্পোরেট গণমাধ্যম মূলত বাজার, দর্শকসংখ্যা এবং তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক গুরুত্বকে বেশি প্রাধান্য দেয়। আদর্শিক অবস্থান বা ঐতিহাসিক মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদমূল্যের প্রধান বিবেচ্য বিষয় নয়। ফলে এই নীরবতা বিস্ময়কর না হলেও উদ্বেগের।
অনেকে ভুলে যেতে চান, কিন্তু বাস্তবতা হলো—আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও দলটির সমর্থক, কর্মী ও অনুসারীরা সমাজ থেকে হারিয়ে যায়নি। তোফায়েল আহমদের জানাজায় মানুষের উপস্থিতি সেটাই প্রমাণ করেছে। সেখানে উপস্থিত সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থক ছিলেন না, কিন্তু একজন মানুষের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং জনসংযোগ তাঁকে দলীয় সীমানার বাইরেও গ্রহণযোগ্যতা দেয়। তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল সেই সামাজিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।
জীবনের শেষ সময়ে তোফায়েল আহমেদকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহুবার মিথ্যা মৃত্যুসংবাদ ও বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণার শিকার হতে হয়েছে। মৃত্যুর পরও একদল মানুষ ধর্মীয় উদ্ধৃতি ব্যবহার করে তাঁকে নিয়ে উপহাস করেছে। এটি শুধু রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার নয়, আমাদের সামাজিক অবক্ষয়েরও একটি প্রতিফলন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মতবিরোধ থাকবে, সমালোচনা থাকবে, এমনকি কঠোর বিরোধিতাও থাকবে। কিন্তু মৃত্যুর পর একজন মানুষকে নিয়ে বিদ্বেষ ছড়ানো কোনো সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। মৃত্যুর অনিবার্যতা সকল মানুষের জন্য সমান সত্য। সেই বোধ থেকেই মৃত ব্যক্তির প্রতি ন্যূনতম মানবিক সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা আসে।
আমরা হাদী হত্যাকাণ্ড নিয়েও ব্যথিত হয়েছিলাম। কারণ রাজনৈতিক সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে আমরা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছি। রাষ্ট্র যখন কাউকে বিশেষ মর্যাদা দেয়, তখন সেই সিদ্ধান্তও জনসমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকে না। গণতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন করার অধিকার নাগরিকের আছে।
কিন্তু আজকের প্রশ্নটি ভিন্ন। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থান এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা একজন মানুষকে তাঁর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ সম্মান না দেখানো কি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি সংকটের ইঙ্গিত নয়?
তোফায়েল আহমেদের রাজনীতি নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তাঁর দল, তাঁর সিদ্ধান্ত কিংবা তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্কও থাকতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের একটি মৌলিক সত্য অস্বীকার করা যায় না—তিনি ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
রাষ্ট্র যদি তার ইতিহাসের নির্মাতাদের সম্মান করতে কুণ্ঠাবোধ করে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের মর্যাদাও ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আর সেই কারণেই তোফায়েল আহমেদের বিদায়ের মুহূর্তে রাষ্ট্রের এই নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা শুধু একজন ব্যক্তিকে নিয়ে নয়; এটি আমাদের জাতীয় স্মৃতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ইতিহাসবোধকে নিয়েও।
লেখক : ব্রিটেনপ্রবাসী কলামিস্ট।
এইচআর/জেআইএম
What's Your Reaction?