দুই পা হারিয়েও হার মানেননি মানিক মিয়া
রাজধানীর ব্যস্ত এক সড়কের ফুটপাত। চারদিকে মানুষের ছুটে চলা, যানবাহনের হর্ন, ধুলা আর রোদের সঙ্গে মিশে আছে নগর জীবনের নিরন্তর কোলাহল। সেই কোলাহলের মাঝেই নীরবে নিজের কাজে ডুবে থাকেন দুই পা হারানো মানিক মিয়া। সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকটি রেঞ্চ, প্লাস, হাতুড়ি আর মেরামতের সরঞ্জাম। একে একে রিকশা আর ভ্যান নিয়ে আসেন চালকেরা। ধৈর্য নিয়ে সেগুলো মেরামত করেন তিনি। তার হাতের কাজে যেমন দক্ষতার ছাপ, তেমনি মুখে ফুটে ওঠে আত্মতৃপ্তির হাসি। মানিক মিয়ার বয়স ৬৫ বছর। বাড়ি ঢাকার কেরানীগঞ্জের আটি বাজার এলাকায়। ৪২ বছর ধরে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ফুটপাতে বসে রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ করছেন। এই ছোট্ট কর্মস্থলই তার আয়ের উৎস, তার আত্মমর্যাদার ঠিকানা। আজ থেকে ৪৪ বছর আগে, ১৯৮২ সালে এক মুহূর্তেই বদলে যায় মানিক মিয়ার জীবন। ট্রেনে করে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন। দাঁড়িয়ে ছিলেন গেটের কাছে। দীর্ঘ পথের ক্লান্তিতে চোখে নেমে এসেছিল ঘুমঘুম ভাব। সেই অসাবধানতার মুহূর্তেই ট্রেন থেকে পড়ে যান। এরপর ট্রেনের নিচে চলে যায় তার দুই পা। দুই পা হারিয়েও কারও কাছে হাত পাতেননি মানিক মিয়া/ছবি: জাগো নিউজ ঘটনার কথা বলতে গিয়ে এখনো কণ
রাজধানীর ব্যস্ত এক সড়কের ফুটপাত। চারদিকে মানুষের ছুটে চলা, যানবাহনের হর্ন, ধুলা আর রোদের সঙ্গে মিশে আছে নগর জীবনের নিরন্তর কোলাহল। সেই কোলাহলের মাঝেই নীরবে নিজের কাজে ডুবে থাকেন দুই পা হারানো মানিক মিয়া।
সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকটি রেঞ্চ, প্লাস, হাতুড়ি আর মেরামতের সরঞ্জাম। একে একে রিকশা আর ভ্যান নিয়ে আসেন চালকেরা। ধৈর্য নিয়ে সেগুলো মেরামত করেন তিনি। তার হাতের কাজে যেমন দক্ষতার ছাপ, তেমনি মুখে ফুটে ওঠে আত্মতৃপ্তির হাসি।
মানিক মিয়ার বয়স ৬৫ বছর। বাড়ি ঢাকার কেরানীগঞ্জের আটি বাজার এলাকায়। ৪২ বছর ধরে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ফুটপাতে বসে রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ করছেন। এই ছোট্ট কর্মস্থলই তার আয়ের উৎস, তার আত্মমর্যাদার ঠিকানা।
আজ থেকে ৪৪ বছর আগে, ১৯৮২ সালে এক মুহূর্তেই বদলে যায় মানিক মিয়ার জীবন। ট্রেনে করে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন। দাঁড়িয়ে ছিলেন গেটের কাছে। দীর্ঘ পথের ক্লান্তিতে চোখে নেমে এসেছিল ঘুমঘুম ভাব। সেই অসাবধানতার মুহূর্তেই ট্রেন থেকে পড়ে যান। এরপর ট্রেনের নিচে চলে যায় তার দুই পা।
দুই পা হারিয়েও কারও কাছে হাত পাতেননি মানিক মিয়া/ছবি: জাগো নিউজ
ঘটনার কথা বলতে গিয়ে এখনো কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে মানিক মিয়ার। বলেন, ‘গেটের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। চোখে একটু ঘুমঘুম ভাব ছিল। হঠাৎ পড়ে গেলাম। এরপর ট্রেনের নিচে আমার দুইটা পা চলে যায়।’
একটি দুর্ঘটনা শুধু তার শরীরের দুটি অঙ্গই কেড়ে নেয়নি, বদলে দিয়েছিল পুরো জীবন। দীর্ঘ এক বছর চিকিৎসার পর বাড়ি ফিরলেও সামনে ছিল অনিশ্চয়তার অন্ধকার। কীভাবে চলবে সংসার, কীভাবে চলবে জীবন—এই প্রশ্নই তখন সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়।
সেই সময়ে মানিক মিয়ার পাশে দাঁড়ান বড় ভাই। তিনি নিজেও রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ করতেন। প্রায়ই তার পাশে বসে সময় কাটাতেন মানিক মিয়া। একদিন বড় ভাই বললেন, বসে বসে করা যায়—এমন একটি কাজ শিখে নিতে। সেই পরামর্শই হয়ে ওঠে নতুন জীবনের শুরু।

দৃষ্টিহীনতাকে জয় করে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন সোহেল

পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স পাস, আয়েশার জীবনের একমাত্র আশা সরকারি চাকরি
মানিক মিয়া বলেন, ‘সুস্থ হওয়ার পরে ভাবলাম, কী করব। আমার বড় ভাই এই কাজ করতেন। উনি বললেন, তোর জন্য এই কাজটাই ভালো হবে। তখন থেকেই শুরু করি। এরপর আর থামিনি। ৪২ বছর ধরে এই কাজ করছি। আল্লাহ যেভাবে চালাচ্ছেন, সেভাবেই চলছে।’
দুর্ঘটনার পর অনেকেই ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পথে কখনো হাঁটেননি মানিক মিয়া। তার কাছে ভিক্ষা মানে আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলা।
দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি ভিক্ষা পছন্দ করি না। ভিক্ষা করা মানে জীবনের কাছে হেরে যাওয়া। মানুষ চেষ্টা করলে স্বাবলম্বী হতে পারে। আমি নিজের কাজ করে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।’
এই কয়েকটি বাক্যই যেন তার জীবনদর্শনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
এলিফ্যান্ট রোডের ফুটপাতে রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ করেন মানিক মিয়া/ছবি: জাগো নিউজ
প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফুটপাথেই চলে মানিক মিয়ার কাজ। কোনো নির্দিষ্ট দোকান নেই, নেই আধুনিক কোনো কর্মশালা। খোলা আকাশের নিচেই বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে তার কর্মজীবন। প্রতিদিন আয় হয় গড়ে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। এই আয়েই চলে তার সংসার।
মানিক মিয়ার তিন সন্তান। বড় ছেলে রাইড শেয়ারিংয়ে মোটরসাইকেল চালান। ছোট ছেলে কলেজে পড়াশোনা করছে। মেয়েকে বিএ পাস করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা করানোর চেষ্টা থেকে তিনি কখনো সরে আসেননি।
তবে প্রতিটি দিনই মানিক মিয়ার জন্য সমান নয়। বর্ষাকালে ফুটপাত ভিজে যায়, কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। গরমের দিনে তপ্ত রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। তবুও সংসারের দায়িত্ব তাকে প্রতিদিন কাজে টেনে আনে।

বাবার কোলে চড়ে চলাচল করা নাইছ স্নাতকে পেলেন প্রথম শ্রেণি

প্রতিবন্ধী নাজমিনের পাশে দাঁড়ালেন তারেক রহমান
মানিক মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টি হলে অনেক সমস্যা হয়। গরমেও কষ্ট হয়। জীবন তো কষ্টেরই। সবার জীবন একরকম না। কিন্তু সংসারের দায়িত্ব তো টানতেই হবে।’
সংগ্রামের এই দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে বড় অর্জন কী—এমন প্রশ্নে একটু হেসে উত্তর দেন মানিক মিয়া।
‘আমি এই কাজে মানুষের অনেক সম্মান পাই। ভিক্ষা করলে এই সম্মান পেতাম না। আমার কাজ ভালো বলে মানুষ আবার আসে। যারা একবার কাজ করায়, তারা পরে আবারও আমার কাছেই আসে।’ বলছিলেন মানিক মিয়া।
সংগ্রামী মানিক মিয়ার কাজে মুগ্ধ রিকশা ও ভ্যান চালকেরা/ছবি: জাগো নিউজ
এই সম্মানই যেন মানিক মিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। অর্থের পরিমাণ হয়তো সীমিত, কিন্তু আত্মসম্মানের জায়গায় তিনি নিজেকে কখনো দরিদ্র মনে করেন না।
নিজের মতো শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষদের উদ্দেশেও তার একটি বার্তা আছে। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ইচ্ছাশক্তি।
মানিক মিয়ার ভাষায়, ‘মানুষ ইচ্ছা করলে অনেক কিছুই পারে। চেষ্টা করলে অনেক কিছু হয়। অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের চেষ্টা করা উচিত।’

ঢাবিতে পড়েও চাকরি না পাওয়ার আফসোস জন্মান্ধ রাজিয়ার

স্বামী ছেড়ে গেছে, অন্ধ মেয়েকে আগলে রেখেছেন মা
এলিফ্যান্ট রোডে নিয়মিত রিকশা ও ভ্যান মেরামত করাতে আসা অনেক চালকের কাছেও মানিক মিয়া শুধু একজন মিস্ত্রি নন, বরং একজন সৎ ও বিশ্বস্ত মানুষ।
রিকশাচালক মো. সোহেল বলেন, ‘আমি প্রায় আট বছর ধরে ভাইয়ের (মানিক মিয়া) কাছে কাজ করাই। উনি কখনো অযথা টাকা নেন না। কাজও খুব ভালো করেন। তাই সমস্যা হলেই তার কাছেই চলে আসি।’
আরেক চালক আবদুর রহমান বলেন, “উনাকে দেখে কখনো মনে হয় না তিনি প্রতিবন্ধী। নিজের কাজ নিজেই করেন। আমরা অনেক সময় সাহায্য করতে চাই, কিন্তু তিনি বলেন—‘আমি যতটুকু পারি, নিজেই করব।’ এই আত্মসম্মানই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।”
এলিফ্যান্ট রোডের ফুটপাতে রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ করেন মানিক মিয়া/ছবি: জাগো নিউজ
মানিক মিয়া প্রসঙ্গে স্থানীয় দোকানদার মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে তাকে এখানে কাজ করতে দেখছি। বৃষ্টি, রোদ—কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। এলাকার সবাই তাকে সম্মান করেন। কারণ তিনি কখনো কারও কাছে হাত পাতেননি।’
মানিক মিয়ার কর্মস্থলে দাঁড়ালেই বোঝা যায়, তার চারপাশে গড়ে উঠেছে এক ধরনের নীরব আস্থা। নিয়মিত গ্রাহকদের অনেকেই অন্য কোথাও না গিয়ে সরাসরি তার কাছেই আসেন। তাদের মতে, মানিক মিয়ার হাতের কাজ যেমন নিখুঁত, তেমনি তার সততা ও আত্মসম্মানবোধও তাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। সমাজে প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি শুধু সহানুভূতি নয়, কর্মসংস্থানের সুযোগও নিশ্চিত করা গেলে আরও অনেক মানিক মিয়া মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবেন—এমনটাই মনে করেন তারা।

চোখে দেখেন না তবুও তিনি নিখুঁত মিস্ত্রি

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে স্বাবলম্বী / এলাকার ১০ হাজার ফোন নম্বর মুখস্থ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মিজানের
মানিক মিয়ার গল্প কোনো অলৌকিক সাফল্যের গল্প নয়। এটি প্রতিদিনের ঘাম, কষ্ট, দায়িত্ব আর আত্মমর্যাদার গল্প। একটি দুর্ঘটনা তার দুই পা কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু তার আত্মবিশ্বাস কেড়ে নিতে পারেনি। জীবন তাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে, কিন্তু তিনি পরাজয় মেনে নেননি।
চার দশকের বেশি সময় ধরে নিজের শ্রমে সংসার চালানো এই মানুষটির নিজের জীবন নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। বরং কৃতজ্ঞতা—এত প্রতিকূলতার মধ্যেও কারও কাছে হাত পাততে হয়নি।
তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বুকের ভেতর একটি ছোট্ট স্বপ্ন লুকিয়ে আছে। ছোট ছেলে যদি একটি সরকারি চাকরি পায়, তাহলে হয়তো এই দীর্ঘ সংগ্রামকে সার্থক মনে করবেন তিনি।
এমএমএআর
What's Your Reaction?