দেশে যেভাবে নির্ধারণ করা হয় চিত্রকর্মের দাম

একটি চিত্রকর্মের দাম ৫ হাজার টাকা, আরেকটির ৫ লাখ! এত পার্থক্য কেন? একই আকারের দুটি ছবির দামও এক নয়, কেন? শিল্পরসিক ও সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই এই প্রশ্ন তৈরি হয়। বাংলাদেশে শিল্পকর্ম বা আর্টওয়ার্কের মূল্য নির্ধারণের নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা বা মানদণ্ড নেই। বরং শিল্পীর পরিচিতি, কাজের মান, কাজের মাধ্যম, আকার, বাজারের চাহিদা, সংগ্রাহকদের আগ্রহ এবং শিল্পকর্মের ঐতিহাসিক গুরুত্বসহ নানা বিষয় বিবেচনায় নির্ধারণ করা হয় শিল্পকর্মের দাম। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি চিত্রকর্মের মূল্য নির্ধারণ অনেকটা শিল্প ও বাজারের সমন্বিত প্রক্রিয়া। এখানে যেমন সৃজনশীলতার মূল্য আছে, তেমনি রয়েছে শিল্পীর দীর্ঘদিনের সাধনা, অভিজ্ঞতা এবং শিল্পবাজারে তার অবস্থানের প্রভাব। শিল্পীর পরিচিতি ও ক্যারিয়ারের প্রভাবশিল্পকর্মের মূল্য নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো শিল্পীর পরিচিতি। ‘একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর কাজ সাধারণত নতুন শিল্পীর তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হয়। কারণ সংগ্রাহকরা শুধু একটি ছবি কেনেন না, তারা শিল্পীর সৃষ্টিশীল যাত্রা ও শিল্পচর্চার মূল্যও বিবেচনা করেন’, জাগো নিউজকে বলেন ঢাকার আর্ট গ্যালারি কলাকেন্দ

দেশে যেভাবে নির্ধারণ করা হয় চিত্রকর্মের দাম

একটি চিত্রকর্মের দাম ৫ হাজার টাকা, আরেকটির ৫ লাখ! এত পার্থক্য কেন? একই আকারের দুটি ছবির দামও এক নয়, কেন? শিল্পরসিক ও সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই এই প্রশ্ন তৈরি হয়।

বাংলাদেশে শিল্পকর্ম বা আর্টওয়ার্কের মূল্য নির্ধারণের নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা বা মানদণ্ড নেই। বরং শিল্পীর পরিচিতি, কাজের মান, কাজের মাধ্যম, আকার, বাজারের চাহিদা, সংগ্রাহকদের আগ্রহ এবং শিল্পকর্মের ঐতিহাসিক গুরুত্বসহ নানা বিষয় বিবেচনায় নির্ধারণ করা হয় শিল্পকর্মের দাম। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি চিত্রকর্মের মূল্য নির্ধারণ অনেকটা শিল্প ও বাজারের সমন্বিত প্রক্রিয়া। এখানে যেমন সৃজনশীলতার মূল্য আছে, তেমনি রয়েছে শিল্পীর দীর্ঘদিনের সাধনা, অভিজ্ঞতা এবং শিল্পবাজারে তার অবস্থানের প্রভাব।

বাংলাদেশে চিত্রকর্মের দাম নির্ধারণ হয় যেভাবে

শিল্পীর পরিচিতি ও ক্যারিয়ারের প্রভাব
শিল্পকর্মের মূল্য নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো শিল্পীর পরিচিতি। ‘একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর কাজ সাধারণত নতুন শিল্পীর তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হয়। কারণ সংগ্রাহকরা শুধু একটি ছবি কেনেন না, তারা শিল্পীর সৃষ্টিশীল যাত্রা ও শিল্পচর্চার মূল্যও বিবেচনা করেন’, জাগো নিউজকে বলেন ঢাকার আর্ট গ্যালারি কলাকেন্দ্রের পরিচালক শিল্পী ও কিউরেটর ওয়াকিলুর রহমান।

একই প্রসঙ্গে গ্যালারি কায়ার পরিচালক শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী বলেন, ‘কোনো শিল্পী যদি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত প্রদর্শনী করেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পান কিংবা তার কাজ গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহে স্থান পায়, তাহলে তার শিল্পকর্মের বাজারমূল্য স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুটি শিল্পকর্ম একই মানের হলেও শিল্পীর পরিচিতি ও শিল্পজগতে অবস্থানের কারণে দামের পার্থক্য তৈরি হয়। অনেক সংগ্রাহক ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বিবেচনায়ও শিল্পকর্ম কিনে থাকেন।’

বাংলাদেশে চিত্রকর্মের দাম নির্ধারণ হয় যেভাবে

মাধ্যমের ওপর নির্ভর করে দাম
নবীন শিল্পী মাহমুদ রহমান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকরা অনুষদ থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন বেশ কবছর আগে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘চিত্রকর্ম তৈরিতে ব্যবহৃত মাধ্যমও মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তেলরঙ, অ্যাক্রিলিক, জলরং, মিশ্রমাধ্যম, প্রিন্টমেকিং কিংবা ডিজিটাল আর্ট, প্রতিটি মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় ও কাজের প্রক্রিয়া ভিন্ন।’

চিত্রশিল্পী ওয়াকিলুর রহমান বলেন, ‘অয়েল পেইন্টিং সাধারণত বেশি সময় ও উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি হয়। ফলে এসব কাজের দাম তুলনামূলক বেশি হয়ে থাকে। অন্যদিকে জলরং বা কাগজভিত্তিক কিছু কাজ অপেক্ষাকৃত কম দামে বিক্রি হতে দেখা যায়। যদিও শিল্পীর দক্ষতা ও কাজের গুরুত্বের কারণে সেসবের দামও ব্যতিক্রম হয়।’

বাংলাদেশে চিত্রকর্মের দাম নির্ধারণ হয় যেভাবে

আঁকার ও উপকরণের খরচ
শিল্পীরা সাধারণত ক্যানভাস, রং, ফ্রেম, বার্নিশ, স্টুডিও খরচ এবং কাজের সময়কে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনা করেন। বড় আকারের কাজ তৈরিতে বেশি উপকরণ ও শ্রমের প্রয়োজন হয় বলে সেগুলোর দামও বেশি হয়। ওয়াকিলুর রহমানের মতে, শুধু আকারই মূল বিষয় নয়, অনেক সময় ছোট একটি কাজ তার শিল্পগুণ, বিরলতা কিংবা বিশেষ ধারণার কারণে বড় কাজের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হতে পারে।’

বাজারের চাহিদা ও সংগ্রাহকদের আগ্রহ
বাংলাদেশের শিল্পবাজার এখনও বিকাশমান হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত সংগ্রাহক এবং তরুণ শিল্পপ্রেমীদের আগ্রহ বেড়েছে। ফলে নির্দিষ্ট কিছু শিল্পীর কাজের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্পসংগ্রাহক সৈয়দ আমিনুল ইসলাম কায়সার বলেন, ‘কোনো শিল্পীর কাজ যদি নিয়মিত বিক্রি হয় এবং সংগ্রাহকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়, তাহলে তার কাজের মূল্য ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ব্যাপারটা অনেকটাই অন্য সব সংগ্রহযোগ্য সম্পদের বাজারের মতো।’

বাংলাদেশে চিত্রকর্মের দাম নির্ধারণ হয় যেভাবে

প্রদর্শনী ও আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব
দেশ-বিদেশের প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ, পুরস্কার অর্জন কিংবা আন্তর্জাতিক আর্ট ফেয়ারে উপস্থিতি শিল্পীর কাজের বাজারমূল্য বাড়াতে সহায়তা করে। কারণ এসব অর্জন শিল্পীর গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করে। শিল্পবোদ্ধাদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ প্রদর্শনের সুযোগ পেলে শিল্পীর শিল্পকর্ম নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়। এর প্রভাব স্থানীয় বাজারেও পড়ে।

গ্যালারি কীভাবে ছবির দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখে
বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্যালারি শিল্পীর সঙ্গে আলোচনা করে শিল্পকর্মের দাম নির্ধারণ করে। তারা শিল্পীর পূর্ববর্তী শিল্পকর্মের বিক্রয়মূল্য, বাজার পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের আগ্রহ বিশ্লেষণ করে একটি গ্রহণযোগ্য দাম নির্ধারণের চেষ্টা করে।

গ্যালারি কায়ার পরিচালক শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী বলেন, ‘আমরা শিল্পীর কাজের ধারাবাহিকতা, প্রদর্শনীর ইতিহাস এবং বাজারের বাস্তবতা বিবেচনা করি। খুব বেশি দাম নির্ধারণ করলে বিক্রি করা কঠিন হয়, আবার খুব কম দাম লিখলে শিল্পীর মূল্যায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’

বাংলাদেশে চিত্রকর্মের দাম নির্ধারণ হয় যেভাবে

নতুন শিল্পীদের জন্য চ্যালেঞ্জ
নতুন শিল্পীদের ক্ষেত্রে তাদের কাজের মূল্য নির্ধারণ বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকে শুরুতে কম দামে শিল্পকর্ম বিক্রি করেন, যাতে সংগ্রাহকদের আগ্রহ তৈরি হয়। তবে শিল্পবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অযৌক্তিকভাবে কম দাম নির্ধারণ করলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পীর বাজারমূল্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের পরামর্শ, নতুন শিল্পীদের উচিত অভিজ্ঞ শিল্পী, গ্যালারি ও শিল্পসংগঠকদের সঙ্গে আলোচনা করে ধীরে ধীরে নিজেদের মূল্য কাঠামো তৈরি করা।

ভবিষ্যতে কি নির্দিষ্ট কাঠামো আসবে
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাংলাদেশের আর্ট মার্কেট আরও বড় হলে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব বৃদ্ধি পাবে। অনলাইন আর্ট প্ল্যাটফর্ম, আন্তর্জাতিক নিলাম এবং করপোরেট সংগ্রহ বৃদ্ধির ফলে শিল্পকর্মের মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও নতুন মানদণ্ড তৈরি হতে পারে।

তবে শেষ পর্যন্ত শিল্পকর্মের মূল্য শুধু রং, ক্যানভাস বা আকারের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিল্পীর চিন্তা, সৃজনশীলতা, সময়, অভিজ্ঞতা এবং শিল্পবাজারের গ্রহণযোগ্যতা। আর সে কারণেই শিল্পের মূল্য নির্ধারণকে অনেকেই বলেন ‘এটি যেমন অর্থনীতির বিষয়, তেমনি নন্দনতত্ত্বেরও বিষয়’।

এমআই/আরএমডি

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow