ঢাকার গুলিস্তান। ভিড়, ভাড়া, ভোগান্তি সবকিছুর মাঝেই এক ভিন্ন জগতের ঠিকানা বায়তুল মোকাররমকে ঘিরে গড়ে ওঠা ধর্মীয় সামগ্রীর বাজার। শহরের কোলাহল আর রাজনৈতিক ব্যস্ততার ভিড়ে এখানে ঢুকলেই মনে হয় অন্য এক পরিবেশে পা রাখা হলো। সারি সারি দোকানে সাজানো আছে তসবিহ, টুপি, জায়নামাজ, আতর, ইসলামিক বই, মিসওয়াক, পাঞ্জাবি ও পায়জামা। ভক্তি, ব্যবসা আর ঐতিহ্য মিলে এখানে গড়ে উঠেছে এক আধ্যাত্মিক বাজার।
দোকানের সামনে দাঁড়ালেই রঙিন তসবিহ ঝুলছে সারি সারি। কারো হাতে আতরের শিশি, কারো হাতে জায়নামাজ। মসজিদের ভেতরে নামাজ শেষ করে মানুষজন এক মুহূর্ত থেমে যাচ্ছেন এসব দোকানে। কেউ কিনছেন টুপি, কেউ তসবিহ, আবার কেউ ব্যাগ ভরে নিয়ে যাচ্ছেন ইসলামিক বই। প্রতিটি দোকানেরই আছে আলাদা আলাদা গল্প, আলাদা ইতিহাস।
এই বাজারের পুরোনো মুখ নাসির উদ্দিন। বয়স আনুমানিক ষাট ছুঁইছুঁই, ২৫ বছর ধরে ইসলামিক বই বিক্রির সঙ্গে জড়িত। একসময় লাইব্রেরিতে কাজ করতেন। ধীরে ধীরে ইসলামের প্রতি আগ্রহ থেকেই শুরু করেন ইসলামিক বইয়ের ব্যবসা। একগাল হেসে তিনি বললেন, ‘আমার দোকানে কোরআন শরীফ, হাদিস, নবীর জীবনী থেকে শুরু করে নানান ইসলামিক সাহিত্য পাওয়া যায়। যারা ধর্মীয় জ্ঞান চর্চা করতে চান, তাদের কাছে বই এখনো অমূল্য।’
কয়েক কদম এগোলেই চোখে পড়বে মিসওয়াকের দোকান। দোকানের কর্ণধার মোহাম্মদ সিরাজ, যিনি ৪০ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে আছেন। সিরাজের চোখেমুখে আত্মতৃপ্তি। ধর্মীয় অনুশীলন আর জীবিকার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন যেন তার জীবন কাহিনি। তার দোকানে সাজানো আরব, আফ্রিকান, দেশি, বিভিন্ন গাছের নানা ধরনের মিসওয়াক। তিনি জানালেন, কোয়ালিটি অনুযায়ী দাম ওঠানামা করে। ভালো মিসওয়াকের দাম একটু বেশি হলেও নামাজিরা সেটা নেন। এটা শুধু দাঁতের জন্য নয়, সুন্নাতেরও অংশ।
কিছুটা দূরে আতর ও তসবিহর দোকানে ব্যস্ত মাহিন মাহমুদ। দোকানে দাঁড়িয়েই আতরের সুবাসে ভরে ওঠে চারপাশ। ক্রেতারা ছোট শিশি হাতে নিয়ে গন্ধ পরীক্ষা করছেন। কারো মুখে হাসি, কারো চোখে ভক্তির আলো। গ্রাহক সামলাতে সামলাতেই মাহিন জানালেন, আমাদের দোকানে দেশি-বিদেশি নানান ধরনের আতর আছে। ৫০ টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকার আতরও পাওয়া যায়। কাঠ, মুক্তো, পাথর নানা ধরনের তসবিহও আছে তার দোকানে।
এই বাজারের নজরকাড়া পণ্য টুপি। এখানে ৩৫ বছর ধরে ব্যবসা করছেন এনামুল হক। সাদা, রঙিন, কারুকাজ করা নানান ধরনের টুপি সাজানো থাকায় দোকানটা দেখে যেন মনে হয় ছোট্ট এক জাদুঘর। তার দোকানে ১০ টাকা থেকে শুরু করে ১২০০ টাকার টুপিও আছে। তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘শুধু নামাজিরাই নয়, অনেকেই উপহার দেওয়ার জন্য টুপি কেনেন। আমাদের এখানে দেশি হাতের কাজের টুপির পাশাপাশি বিদেশি টুপিও পাওয়া যায়।’
এখানে আরও আছে জায়নামাজের দোকান। দোকানের কর্মচারী উজ্জ্বল জানালেন, শুক্রবার অনেকেই এসে শুধু নামাজ পড়ার জন্য জায়নামাজ নেন। আমরাও আন্তরিকতা দেখিয়ে নামাজ পড়তে জায়নামাজ দেই। আমাদের এখানে ৮০ টাকা থেকে শুরু করে ১১০০ টাকার জায়নামাজ পাওয়া যায়।
ধর্মীয় পোশাকও এখানে বিক্রি হয়। পাঞ্জাবি, পায়জামা ও আরবি স্টাইলের জুব্বাও পাওয়া যায় এসব দোকানে। দাম মান ভেদে ভিন্ন। উৎসব কিংবা মাহফিলের সময় এগুলোর চাহিদা বেড়ে যায়।
‘আমি এখানে নিয়মিত নামাজ পড়তে আসি, এই পথ দিয়েই যাতায়ত’, কথাগুলো বলছিলেন তানভীর আহমেদ। তিনি বলেন, বাজারের ভিড় বা হট্টগোলের মধ্যে ঢুকলেও ভিন্ন এক পরিবেশ পাই। দোকানগুলো পরিচ্ছন্ন, সাজানো এবং সবসময় নতুন কিছু চোখে পড়ে। এখানে আসলে শুধু কেনাকাটা নয়, এক ধরনের আধ্যাত্মিক তৃপ্তিও মেলে।
শফিকুল নামের এক ক্রেতা বলেন, আমি এই বাজারে প্রায়শই আসি। এখানে বিক্রি হওয়া প্রতিটি জিনিসের মান খুব ভালো। তসবিহ, টুপি, মিসওয়াক বা জায়নামাজ সবকিছুই দীর্ঘস্থায়ী এবং যত্নসহ তৈরি।
এই বাজারের বেচাকেনার একটা বিশেষ সময়ও আছে। রমজান মাসে চাহিদা তুঙ্গে থাকে। ইফতার, তারাবিহ আর ঈদের প্রস্তুতি ঘিরে তখন এই বাজার জমে ওঠে। এছাড়া প্রতি শুক্রবার, ইসলামী মেলা, মাহফিল, ঈদে মিলাদুন্নবী ও অন্যান্য বিশেষ দিনে এখানে ভিড় উপচে পড়ে। ব্যবসায়ীরা বলেন, এসব সময় বিক্রি দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেড়ে যায়।
বায়তুল মোকাররমের এই বাজার শুধুই বেচা-কেনার জায়গা নয়। প্রতিটি দোকানের পেছনে আছে বিশ্বাস, আস্থা আর ভক্তির গল্প। ইসলামের চর্চা, আচার-অনুষ্ঠান আর মানুষের আধ্যাত্মিক প্রয়োজনের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে এই ব্যবসা।
কেউ কিনছেন ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য, কেউ উপহার হিসেবে, আবার কেউ ধর্মীয় অনুভূতি পূরণের উদ্দেশ্যে। এই বাজারের প্রতিটি জিনিস যেন মানুষকে একটু হলেও ধর্মের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
কেএসকে/জেআইএম