ধলতার নামে ৪২ কেজিতে মণ, প্রতারিত কৃষক

চল্লিশ কেজিতে এক মণ। দেশের প্রচলিত ওজন পদ্ধতিতে এটাই নিয়ম। অথচ নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে কৃষিপণ্য বিক্রির সময় কৃষকদের দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত দুই কেজি। স্থানীয়ভাবে ‘ধলতা’ নামে পরিচিত এই প্রথার কারণে এক মণ পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে কৃষকদের গুনতে হচ্ছে ৪২ কেজি। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এ অনিয়মে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন উপজেলার হাজারো কৃষক। কৃষকদের অভিযোগ, শুধু ৪০ কেজিতেই নয়, ৫০ কেজি পণ্য বিক্রি করলেও দাম দেওয়া হয় ৪৭ কেজির। আর ৬০ কেজির বেশি হলে বাদ যায় আরও বেশি। ধলতার নামে এমন অতিরিক্ত পণ্য নেওয়া এখন উপজেলার প্রায় সব হাট-বাজারেই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। একই অবস্থা ধান, ভুট্টা, পাট, আলুসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও। প্রতিবাদ করলে কৃষকদের অপমান, দুর্ব্যবহার এমনকি পণ্য না কেনার হুমকির মুখেও পড়তে হয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের খগার হাট ও টুনির হাট, বালাপাড়া ইউনিয়নের ডাঙ্গারহাট, পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ হাট, নাউতারা ইউনিয়নের নাউতারা বাজার, গয়াবাড়ী ইউনিয়নের শুটিবাড়ির হাট, টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের একতা বাজার, খালিশা চাপানী ইউনিয়নের ডালিয়া নতুন বাজা

ধলতার নামে ৪২ কেজিতে মণ, প্রতারিত কৃষক

চল্লিশ কেজিতে এক মণ। দেশের প্রচলিত ওজন পদ্ধতিতে এটাই নিয়ম। অথচ নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে কৃষিপণ্য বিক্রির সময় কৃষকদের দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত দুই কেজি। স্থানীয়ভাবে ‘ধলতা’ নামে পরিচিত এই প্রথার কারণে এক মণ পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে কৃষকদের গুনতে হচ্ছে ৪২ কেজি। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এ অনিয়মে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন উপজেলার হাজারো কৃষক।

কৃষকদের অভিযোগ, শুধু ৪০ কেজিতেই নয়, ৫০ কেজি পণ্য বিক্রি করলেও দাম দেওয়া হয় ৪৭ কেজির। আর ৬০ কেজির বেশি হলে বাদ যায় আরও বেশি। ধলতার নামে এমন অতিরিক্ত পণ্য নেওয়া এখন উপজেলার প্রায় সব হাট-বাজারেই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। একই অবস্থা ধান, ভুট্টা, পাট, আলুসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও। প্রতিবাদ করলে কৃষকদের অপমান, দুর্ব্যবহার এমনকি পণ্য না কেনার হুমকির মুখেও পড়তে হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের খগার হাট ও টুনির হাট, বালাপাড়া ইউনিয়নের ডাঙ্গারহাট, পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ হাট, নাউতারা ইউনিয়নের নাউতারা বাজার, গয়াবাড়ী ইউনিয়নের শুটিবাড়ির হাট, টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের একতা বাজার, খালিশা চাপানী ইউনিয়নের ডালিয়া নতুন বাজার ও গোডাউনের বাজার, ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের চাপানী হাট, পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের কলোনি বাজারসহ ডিমলা উপজেলার প্রায় সব বাজারেই একই চিত্র।

মঙ্গলবার সাপ্তাহিক উপজেলার শুটিবাড়ির পেঁয়াজ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ টাকায়। তবে সেই মণের সঙ্গে অতিরিক্ত দুই কেজি পেঁয়াজ দিতে হচ্ছে কৃষকদের। এর বাইরে প্রতিমণে ১০ টাকা করে খাজনাও আদায় করা হচ্ছে। বাজারের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদেরও কৃষকদের বস্তা থেকে ইচ্ছেমতো পেঁয়াজ তুলে নিতে দেখা যায়।

ব্যবসায়ীদের গুদামে গিয়ে দেখা যায়, একটি বস্তায় ৪২ কেজি ৯০০ গ্রাম পেঁয়াজ থাকলেও কৃষকদের মূল্য দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৪০ কেজির। এ নিয়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হলেও শেষ পর্যন্ত কম দামে পণ্য বিক্রি করেই ফিরতে হচ্ছে কৃষকদের।

কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সার-সেচের উচ্চমূল্য ও বাজারে ফসলের কম দামের কারণে এমনিতেই তারা সংকটে রয়েছেন। তার ওপর ধলতার নামে অতিরিক্ত পণ্য দিতে গিয়ে প্রতিমণে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এতে অনেক কৃষকের পক্ষে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

কৃষক আরমান হোসেন বলেন, পেঁয়াজ, ধান, পাট যা-ই বিক্রি করি না কেন, ৪২ কেজিতে মণ ধরতে হয়। প্রতিবাদ করলে খারাপ ব্যবহার করে, মারতে আসে। ফসলের দাম কম, তার ওপর এই জুলুম। আমরা বাঁচব কীভাবে?

আরেক কৃষক মাহবুবুর রহমান বলেন, যে হাটেই যাই, একই অবস্থা। আমরা ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি হয়ে গেছি। প্রশাসন চাইলে এসব বন্ধ করতে পারে, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

স্থানীয় কয়েকজন কৃষক জানান, অনেক বাজারে এখনো পুরোনো দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা ব্যবহার করা হয়। ডিজিটাল ওজন ব্যবস্থা না থাকায় ওজন কারচুপির সুযোগও থেকে যাচ্ছে।

ব্যবসায়ী লিয়াকত আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই প্রতি মণে দুই কেজি ধলতা নেওয়া হচ্ছে। উপজেলার প্রায় সব হাট-বাজারেই একই নিয়ম চলে আসছে।

তবে শুটিবাড়ি বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আব্দুল বাতেন বলেন, সমিতির পক্ষ থেকে ধলতা নেওয়ার কোনো লিখিত সিদ্ধান্ত নেই। বিষয়টি নিয়ে প্রায়ই ঝামেলা হয়। আমরাও চাই এই প্রথা বন্ধ হোক। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, ধলতার নামে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত পণ্য নেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি সম্পূর্ণ অনিয়ম এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান, সে বিষয়ে প্রশাসন আন্তরিকভাবে কাজ করছে। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি হাট-বাজারে মনিটরিং জোরদার এবং সঠিক ওজন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।

সচেতন মহলের দাবি, কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বাজার তদারকি জোরদার, সঠিক ওজন নিশ্চিত এবং ধলতার নামে অতিরিক্ত পণ্য নেওয়া বন্ধে প্রশাসনের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। না হলে কৃষকের ঘাম ঝরানো ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow