তিস্তা নদীবেষ্টিত প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ১৯৮৭ সালে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের মিলন পাড়া এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় উত্তর সোনাখূলী মিলন পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু দীর্ঘ ৩৯ বছরেও তেমন আলো ছড়াতে পারেনি বিদ্যালয়টি। মাত্র ৬-৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে চলছে সেখানকার শিক্ষা কার্যক্রম। ৬-৭ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে বিদ্যালয়টিতে চারজন শিক্ষক-শিক্ষিকা দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে বিদ্যালয়ের নথিতে ১০৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেও শ্রেণিকক্ষে তাদের উপস্থিতি নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। রোববার (৯ আগস্ট) দ্বিতীয় শিফটে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে উপস্থিত পাওয়া গেছে মাত্র সাতজন শিক্ষার্থী। বিপরীতে বিদ্যালয়টিতে কর্মরত রয়েছেন চারজন শিক্ষক। তারা হলেন- প্রধান শিক্ষক শ্রী হরিহর চন্দ্র রায় এবং সহকারী শিক্ষক জোলমাতুন নুর, সেলিনা বেগম ও সেগুপ্তা মারিয়া।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ২৫ জন, প্রথম শ্রেণিতে ২২ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১১ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ১১ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ১৮ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ১৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। সব মিলিয়ে বিদ্যালয়ের নথিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০৫ জন।
বিদ্যালয়টিতে দুই শিফটে পাঠদান হয়। প্রথম শিফটে প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি এবং দ্বিতীয় শিফটে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস হয়। গত রোববার দুপুর ২টার পর দ্বিতীয় শিফটের ক্লাস চলাকালে সরেজমিনে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণিতে উপস্থিত ছিল দুইজন, চতুর্থ শ্রেণিতে পাঁচজন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী ছিল না।
খাতা-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক হলেও শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি এত কম কেন, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ, বাড়ি বাড়ি যোগাযোগ এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বিষয়ে তদারকির মতো উদ্যোগও যথেষ্ট নয় বলে জানান তারা।
বিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়েও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তারা জানান, বিদ্যালয়ে মানসম্মত টয়লেট নেই। বিদ্যালয় চলাকালীন সময়ে খেলার মাঠে বেঁধে রাখা হয় গরু-ছাগল। এতে মাঠে গবাদিপশুর মলমূত্র পড়ে থাকে। ফলে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া শ্রেণিকক্ষের বিভিন্ন স্থানে মাকড়সার জাল, ভাঙাচোরা চেয়ার-বেঞ্চ ও ধুলোবালি পড়ে থাকতে দেখা যায় বলেও জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তার হোসেন, শওকত আলী ও আলী আজগরসহ কয়েকজন বলেন, শিক্ষকদের অবহেলার কারণে বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের পাশের কিন্ডার-গার্টেন ও মাদ্রাসায় ভর্তি করছেন।
এদিকে একই এলাকার উত্তর সোনাখূলী আশ্রয়ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে পাওয়া যায়নি বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম এবং সহকারী শিক্ষক মোসাম্মৎ পান্না বেগম, অনুপমা রানী রায় ও মরিয়ম নেছাসহ চারজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম সকালে বিদ্যালয়ে এসে হাজিরা খাতায় ৯ ও ১০ আগস্টের দুই দিনের স্বাক্ষর করেন। এরপর সকাল ১১টার পর তিনি বিদ্যালয় থেকে চলে যান। দাপ্তরিক কাজে বিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে এ বিষয়ে কোনো নথিপত্র দেখাতে পারেননি বিদ্যালয়ে উপস্থিত অন্য শিক্ষকরা।
অন্যদিকে উত্তর সোনাখূলী মিলন পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী হরিহর চন্দ্র রায়কেও সরেজমিনে বিদ্যালয়ে পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকদের কাছ থেকে জানা যায়, তিনি দাপ্তরিক কাজে উপজেলা সদরে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে গেছেন।
তবে প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের বাইরে যাওয়ার বিষয়টি মুভমেন্ট রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করেছেন কি না, জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কোনো নথি দেখাতে পারেননি বিদ্যালয়ে উপস্থিত অন্য শিক্ষকরা। একইভাবে প্রধান শিক্ষক অনুপস্থিত থাকাকালে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে কোনো সহকারী শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়ার লিখিত কাগজপত্রও তারা দেখাতে পারেননি।
অর্থাৎ, সরেজমিনে দেখা দুই বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই প্রধান শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের বাইরে ছিলেন। তবে তাদের অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দেখাতে পারেননি বিদ্যালয়ে উপস্থিত অন্য শিক্ষকরা।
অভিযোগের বিষয়ে উত্তর সোনাখূলী মিলন পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী হরিহর চন্দ্র রায় বলেন, ‘৬-৭ জন শিক্ষার্থী থাকার বিষয়টি সঠিক নয়। আমাদের বিদ্যালয়ে ১০৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। অভিভাবকেরা সচেতন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কিছুটা কম। আমরা তাদের খোঁজখবর নিয়ে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছি। শিক্ষকরাও নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন। ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে কেউ সামান্য দেরিতে আসতেই পারেন।’
উত্তর সোনাখূলী আশ্রয়ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাহিদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই, এটা আমার ভুল হয়েছে। বাজারে আসেন, দেখা করি। কথা হবে।’
ডিমলা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বীরেন্দ্রনাথ রায় বলেন, ‘ইতোমধ্যে ওই বিদ্যালয়ের খোঁজখবর নিতে একজন প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছে। তারা প্রতিবেদন দিলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, ‘বিদ্যালয় দুটির বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হবে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’