নারী শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতার বিষয়ে সোচ্চার থাকবো

10 hours ago 3

ঘনিয়ে আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের দিনক্ষণ। ৯ সেপ্টেম্বরের জন্য মুখিয়ে আছেন ভোটার, প্রার্থী, শিক্ষক-কর্মকর্তারা। প্রার্থীদের যেন কোনো বিশ্রাম নেওয়ার জো নেই। ক্যাম্পাসের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন দিনরাত। উদ্দেশ্য একটাই- সব ভোটারের কাছে পৌঁছানো এবং ভোট-দোয়া, পরামর্শ চাওয়া।

এমন ব্যস্ততম মুহূর্তে নিজের পরিকল্পনা নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও ডাকসু নির্বাচনে ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী এস এম ফরহাদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক হাসান আলী

জাগো নিউজ: নির্বাচনী প্রচারণায় অনেক ব্যস্ত সময় পার করছেন। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

ফরহাদ: আলহামদুলিল্লাহ, আমরা খুব ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের সাপোর্ট করছে। আমরা সব জায়গায় শিক্ষার্থীদের কথা শোনা, জানা, আমাদের কমিটমেন্ট সবার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। শিক্ষার্থীদের রেসপন্সে আমরা সন্তুষ্ট। তবে আমরা শঙ্কিত বেশ কয়েকটি কারণে। গত কয়েকদিন আগে আমাদের ফেস্টুন ভাঙচুর করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া, সার্কুলার দেওয়া, নীতিমালাগুলো পরিষ্কার না করা, পরবর্তীসময়ে ক্লারিফিকেশন তাদের নিজের মতো করে দেওয়া- এসব বিষয় নিয়ে আমরা শঙ্কিত।

জাগো নিউজ: গত কয়েকদিন আগে আপনাদের ফেস্টুন ভাঙা হয়েছে। এটি কারা করেছে বলে মনে করেন?

ফরহাদ: আমরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। একটি ছবি পেয়েছি, ছবির ব্যাপারে সেই ছেলেটি ব্যাখ্যা দিয়েছে সে ভাঙেনি, সে সরিয়েছে। এটি কারা করেছে সেটা সিসিটিভি ফুটেজ চেক করলেই দেখা যায়। কিন্তু প্রশাসনের ব্যর্থতা হচ্ছে, এখন পর্যন্ত এই ফুটেজগুলো আমাদের জন্য অ্যাভেইলেবল করা হয়নি। যদিও তারা আমাদের জানিয়েছে কারা করেছে এটি তারা শনাক্ত করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে দেখিনি।

কেউ বোরকা কেন পরে সেটা নিয়ে মোরাল পুলিশিং হয় আবার কেউ অন্য পোশাক কেন পরে সেটা নিয়েও মোরাল পুলিশিং হয়। দুটোই অনেক প্রবলেমেটিক। হিজাবফোবিয়াও প্রবলেমেটিক, কাউকে আবার ড্রেস বাইন্ডিং করে দেওয়াও প্রবলেমেটিক। এই জিনিসগুলো বন্ধ করে দিয়ে নারী শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা দেওয়ার বিষয়ে সোচ্চার থাকবো

জাগো নিউজ: নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা অনুভব করেন?

ফরহাদ: যথেষ্ট শঙ্কা অনুভব করছি। কারণ, এখন পর্যন্ত প্রশাসন দ্বিচারিতামূলক আচরণ করছে। কারও যেন একটা প্রেশার ফিল করছে তারা। নিজেদের মতো নীতিমালা তৈরি করা, হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া, একটা গ্রুপকে বারবার ফ্লোর দেওয়ার চেষ্টা করা, তারা কিছু করলে সেটা নিয়মনীতি অন্য কেউ করলে রেস্ট্রিকশন দেওয়া। যেমন- আমাদের যে ফেস্টুনগুলো আমরা লাগিয়েছিলাম। আগের দিন আমরা তাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম এ ব্যাপারে নীতিমালা কী?

তারা আমাদের জানিয়েছিল, এগুলো লাগালে কোনো সমস্যা নেই, শুধু গাছপালা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালের কোনো ক্ষতি করা যাবে না। যখন আমরা নিয়ম মেনে এগুলো লাগালাম তখন রাত ২টা বাজে। হঠাৎ সার্কুলার দেওয়া হয়েছে, এগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। এ ধরনের দ্বিচারিতা কমিশন নিয়মিত করে যাচ্ছে যেটা শঙ্কার কারণ।

জাগো নিউজ: জিএস নির্বাচিত হলে শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যক্তিগতভাবে কী করার পরিকল্পনা আছে?

ফরহাদ: প্রাথমিকভাবে তিনটি পরিকল্পনা। প্রথমত, ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত হওয়ার ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, সব সমস্যার যে মূল, শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে কাজ করতে চাই। শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা, প্রশাসনকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করে শক্তিশালী করা, ইনস্টিটিউশনগুলো আলাদা আলাদা করে অ্যাক্টিভেট করা।

তৃতীয়ত, ক্যাম্পাস পুরোটা একটা পলিটিক্যাল অরগানাইজেশন হয়ে গেছে। এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে এসে আরও একাডেমিক করা। ক্যাম্পাসে পলিটিক্স থাকবে, কিন্তু সেটি হবে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য। পুরোদস্তুর রাজনৈতিক হয়ে যাওয়া, আলাপে-আড্ডায় সব জায়গায় এটি খুবই প্রবলেমেটিক।

আমরা যে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবো না, সেটার প্রমাণ আমাদের প্যানেলের মধ্যেই আছে। শিবিরের সঙ্গে যারা দ্বিমত করে তারা আমাদের প্যানেলে আছে। সর্ব মিত্র চাকমা, সে কয়েকদিন আগেও শিবিরের সমালোচনা করেছে, এখনো করে। শিবিরের সমালোচনা করে এমন অনেকেই আমাদের প্যানেলে আছে

এখান থেকে যেমন পলিটিক্যাল অর্জন থাকবে একাডেমিক অর্জনও থাকবে। একজন শিক্ষার্থীর স্কিল ডেভেলপমেন্ট, অনার্স থেকে শুরু করে মাস্টার্স পর্যন্ত এ সময়টা একজন শিক্ষার্থী কীভাবে কাটাবে তার একটি পরিকল্পনা থাকবে। চাকরির ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী কীভাবে এগিয়ে যেতে পারে সেই ব্যাপারেও স্কিল ট্রেইনিং থাকতে হবে। পলিটিক্যাল জায়গায় যখন রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় প্রয়োজন পড়বে তখন সেখানে একটা অবস্থান গ্রহণ করা, আর বাকি সময় একাডেমিক বিষয়গুলোর অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে আমাদের কনসার্ন থাকবে।

জাগো নিউজ: নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে?

ফরহাদ: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। অর্ধেকের বেশি নারী শিক্ষার্থী বাইরে থাকে। ক্যাম্পাসে এলে তাদের খাবারের কোনো পরিবেশ নেই। রাস্তায় খেতে হয়, হলে অনাবাসিক কার্ড নিয়ে ঢুকতে পারে না। হলের শিক্ষার্থীরা অনাবাসিক কার্ড দিয়ে ঢুকতে পারা এবং খাওয়া-দাওয়া করার অ্যাক্সেস পাওয়া দরকার।

কেউ বোরকা কেন পরে সেটা নিয়ে মোরাল পুলিশিং হয় আবার কেউ অন্য পোশাক কেন পরে সেটা নিয়েও মোরাল পুলিশিং হয়। দুটোই অনেক প্রবলেমেটিক। হিজাবফোবিয়াও প্রবলেমেটিক, কাউকে আবার ড্রেস বাইন্ডিং করে দেওয়াও প্রবলেমেটিক। এই জিনিসগুলো বন্ধ করে দিয়ে নারী শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতাটা দেওয়ার বিষয়ে সোচ্চার থাকবো। সবচেয়ে বড় যে সমস্যা, আবাসিক হলে নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্টাফদের ব্যবহার। তারা অনেকটা বসসুলভ আচরণ করে, যা মন চায় তাই করে। তাদের একটা ট্রেনিংয়ের আওতায় নিয়ে এসে ইভ্যুলিয়েশনের আওতায় আনা।

নারী শিক্ষার্থীদের হল মাত্র পাঁচটা। তাদের শতভাগ আবাসন ব্যবস্থা করা, দ্রুত সময়ে না পারলে অন্তত পক্ষে যাদের ক্ষেত্রে পারবে না তাদের আবাসন ভাতাটা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা, একাডেমিক এরিয়ায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রেন্ডলি পরিবেশ তৈরি করা। কোনো নারী শিক্ষার্থী যৌন নির্যাতনের শিকার হলে যৌন নির্যাতন সেল ভালো রেসপন্স করে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সৃষ্টি হয়। এ বিষয়গুলো সমাধানে কাজ করবো।

জাগো নিউজ: নির্বাচিত হলে শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করতে কোনো উদ্যোগ নেবেন কি না?

ফরহাদ: ইসলামী ছাত্রশিবিরের বেশিরভাগ প্রোগ্রামই গবেষণামুখী। আমাদের পাঁচ শতাংশেরও কম কর্মসূচি পলিটিক্যাল। বাকি ৯৫ শতাংশই শিক্ষার্থীদের স্কিলনির্ভর। গত এক বছরেও লক্ষাধিক শিক্ষার্থীকে আমরা স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় নিয়ে এসেছি। যেখানে ভাষা, টেকনিক্যাল স্কিল, জব স্কিলসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমরা প্রায়োরিটাইজ করেছি। এগুলো আমাদের সংগঠনের ইন্টার্নাল রেগুলার প্রোগ্রাম।

যেমন কেউ যদি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যেতে চায়, যে দেশে যেতে চায় সে দেশে আমাদের টিম তৈরি করা আছে। তারা তাদের প্রিপারেশন থেকে শুরু করে, সেখানে পৌঁছানো এবং পার্টটাইম জব পর্যন্ত বিভিন্নভাবে সহায়তা করে। অন্য সব ক্ষেত্রেই একজন শিক্ষার্থী যে সমস্যাগুলো ফেস করে, সেগুলো সমাধানের জন্য আমাদের ইন্টার্নাল সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। যদি আমরা নির্বাচিত হই সেগুলো আমরা সংগঠনের বাইরে সব শিক্ষার্থীর জন্যই উন্মুক্ত করে দেবো।

জাগো নিউজ: নির্বাচিত হলে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবেন কি না?

ফরহাদ: কোনো প্রশ্নই আসে না। আমরা যে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবো না, সেটার প্রমাণ আমাদের প্যানেলের মধ্যেই আছে। শিবিরের সঙ্গে যারা দ্বিমত করে তারা আমাদের প্যানেলে আছে। সর্ব মিত্র চাকমা, সে কয়েকদিন আগেও শিবিরের সমালোচনা করেছে, এখনো করে। শিবিরের সমালোচনা করে এমন অনেকেই আমাদের প্যানেলে আছে। হিজাব-নন হিজাব এই ডিবেটটা এখানেই সমাধান, দুই ক্যাটাগরিই আমাদের প্যানেলে আছে। ‘বাঙালি-অবাঙালি’ সমস্যাও এখানে সলভড। আমাদের প্যানেলের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের একটা রিফ্লেকশন আছে।

আমাদের প্যানেলে স্পোর্টস এক্সপার্ট আছে, দেশসেরা ডিবেট চ্যাম্পিয়ন আছে, স্কিল নিয়ে কাজ করেছে এমন প্যানেলিস্ট আছে, ব্ল্যাকবেল্টধারী অ্যাথলেট আছে, একাডেমিক্যালি ৪ আউট অফ ৪ পাওয়া তিন জন শিক্ষার্থী আছে। আবার পলিটিক্যালি সাউন্ড, জুলাই আন্দোলনে সারাদেশে পাইওনিয়রের ভূমিকা রেখেছে এমন লোকও আছে।

এছাড়াও ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করে এমন প্রার্থী আছে, নারীদের হেলথ অ্যান্ড হাইজিন নিয়ে কাজ করে এমন একটিভিস্ট আছে। সব ধরনের ক্যাটাগরির লোক আমাদের প্যানেলে আছে। যেই রিফ্লেকশনটা আমরা প্যানেলে করেছি সেই রিফ্লেকশন আমাদের কাজেও হবে। সুতরাং, দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের কোনো প্রশ্নই আসে না।

জাগো নিউজ: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ফরহাদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

এমএইচএ/এএসএ/এমএফএ/জেআইএম

Read Entire Article