নিঃস্ব দম্পতির জিওব্যাগই এখন শেষ আশ্রয়

সন্ধ্যা নদীর পাড়ে বিকেলের শেষ আলো যখন পানির ঢেউয়ে ঝিকমিক করে ওঠে, তখন নদীর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন নুরজাহান বেগম। যেন নদীর বুকের ভেতরেই খুঁজে ফেরেন হারিয়ে যাওয়া জীবনের গল্প। যে নদী একসময় ছিল তাদের জীবিকা ও স্বপ্নের সঙ্গী, সেই নদীই আজ কেড়ে নিয়েছে সহায়-সম্বল, বসতভিটা আর স্বাভাবিক জীবন। বরিশালের বাবুগঞ্জে বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের রমজানকাঠী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নদীভাঙনের শিকার হাবিবুর রহমান ফকির ও তার স্ত্রী নুরজাহান বেগম এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চার দফা ভাঙনে তাদের প্রায় ৬৫ শতক জমি, বাড়িঘর, গাছপালা ও দীর্ঘদিনের সাজানো সংসার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে নদী রক্ষায় ফেলা সরকারি জিওব্যাগের ওপর অস্থায়ীভাবে নির্মিত একটি ছোট টিনের ঘরেই বসবাস করছেন তারা। স্থানীয়রা জানান, প্রায় পাঁচ বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ওই ঘরেই দিন কাটছে বৃদ্ধ দম্পতির। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বেড়ে গেলে অনেক সময় ঘরের নিচ দিয়ে স্রোত বয়ে যায়। কখনও পানি ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতরেও। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা জলোচ্ছ্বাস দেখা দিলে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটতে হয় আশপাশের লোকজনের বাড়িতে। তারপরও জন্মভূমির মায়া ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারে

নিঃস্ব দম্পতির জিওব্যাগই এখন শেষ আশ্রয়

সন্ধ্যা নদীর পাড়ে বিকেলের শেষ আলো যখন পানির ঢেউয়ে ঝিকমিক করে ওঠে, তখন নদীর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন নুরজাহান বেগম। যেন নদীর বুকের ভেতরেই খুঁজে ফেরেন হারিয়ে যাওয়া জীবনের গল্প। যে নদী একসময় ছিল তাদের জীবিকা ও স্বপ্নের সঙ্গী, সেই নদীই আজ কেড়ে নিয়েছে সহায়-সম্বল, বসতভিটা আর স্বাভাবিক জীবন।

বরিশালের বাবুগঞ্জে বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের রমজানকাঠী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নদীভাঙনের শিকার হাবিবুর রহমান ফকির ও তার স্ত্রী নুরজাহান বেগম এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চার দফা ভাঙনে তাদের প্রায় ৬৫ শতক জমি, বাড়িঘর, গাছপালা ও দীর্ঘদিনের সাজানো সংসার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে নদী রক্ষায় ফেলা সরকারি জিওব্যাগের ওপর অস্থায়ীভাবে নির্মিত একটি ছোট টিনের ঘরেই বসবাস করছেন তারা।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় পাঁচ বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ওই ঘরেই দিন কাটছে বৃদ্ধ দম্পতির। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বেড়ে গেলে অনেক সময় ঘরের নিচ দিয়ে স্রোত বয়ে যায়। কখনও পানি ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতরেও। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা জলোচ্ছ্বাস দেখা দিলে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটতে হয় আশপাশের লোকজনের বাড়িতে। তারপরও জন্মভূমির মায়া ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারেননি তারা।

নুরজাহান বেগম বলেন, ‘এই জায়গার সঙ্গে আমাদের পুরো জীবন জড়ানো। আগে জমিতে ফসল হতো, সেই ফসল বিক্রি করে সংসার চলত। বাড়িঘর, জমিজমা—সব নদী গিলে খাইছে। এখন শুধু স্মৃতিগুলোই আছে। নদীর দিকে তাকাইয়া সেগুলাই মনে করি।’

কথা বলতে বলতে বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন তিনি। চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল দীর্ঘদিনের কষ্ট আর অনিশ্চয়তার ছাপ। তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্টে দিন চলে। তবুও মানুষের কাছে হাত পাততে লজ্জা লাগে। আল্লাহ যেভাবে রাখছে, সেভাবেই আছি।’

স্বামী হাবিবুর রহমান ফকির জানান, একসময় তিনি এলাকায় সচ্ছল মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। রাজমিস্ত্রির কাজের পাশাপাশি কৃষিজমির আয়েও ভালোভাবেই চলত সংসার। কিন্তু নদীভাঙনের আঘাতে সবকিছু হারিয়ে আজ তিনি প্রায় নিঃস্ব।

তিনি বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটায় জন্ম হইছে, বড় হইছি। চারবার ঘর নদীতে গেছে। সব শেষ হওয়ার পরে সরকার জিওব্যাগ ফেলছে। এখন সেই জিওব্যাগের ওপরেই ঘর কইরা থাকি।’

নদীভাঙনের দুশ্চিন্তা ও আর্থিক সংকটের চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনবার ব্রেইন স্ট্রোক করেছেন বলেও জানান তিনি। বর্তমানে কানে কম শোনেন এবং আগের মতো ভারী কাজ করতে পারেন না। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে আয়ও অনেক কমে গেছে। তাদের দুই ছেলে আলাদা পরিবার নিয়ে অন্যত্র ভাড়া বাসায় থাকেন। তারাও আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে তেমনভাবে দাঁড়াতে পারছেন না।

এলাকাবাসী জানান, সন্ধ্যা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে এই অঞ্চলের বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেউ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেও অনেকেই স্মৃতির টানে এখনও নদীপাড় আঁকড়ে পড়ে আছেন।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল আহসান খান হিমু বলেন, বিষয়টি জেনে খুব খারাপ লেগেছে। আমি পরিবারটির খোঁজখবর নিয়েছি। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে সহযোগিতার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব।

বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসমা উল হুসনা বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এই পরিবারের বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক। আমরা তাদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে সরকারি সহায়তার আওতায় আনার চেষ্টা করব। একইসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত অন্য পরিবারগুলোর বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow