‘পরিচয়হীন’ মানসিক রোগীর ঠাঁই হয়নি কোনো হাসপাতালে, পথেই হলো ঠিকানা
রাজধানীর রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো অসংখ্য মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের ভিড়ে তিনি একজন সাধারণ নারী। কিন্তু গত কয়েকদিনে তার জীবন বাঁচাতে এক যুবকের যে আপ্রাণ লড়াই, তা দেশের গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অমানবিক ও ভঙ্গুর প্রতিচ্ছবি উন্মোচন করেছে। আটটি হাসপাতাল ঘুরেও শেষ পর্যন্ত জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং আইনি অভিভাবকের মারপ্যাঁচে চিকিৎসার অধিকার পাননি মুমূর্ষু ওই নারী। নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে রক্তশূন্য শরীর আর ৬০/৪০ রক্তচাপ নিয়ে তাকে আবারও ফিরে যেতে হয়েছে ফুটপাতে। কঙ্কালসার পিঠ দেখে থমকে যাওয়া সকাল ঘটনার শুরু গত শুক্রবার (২২ মে) আনুমানিক সকাল ৮টা ৩০ মিনিটের দিকে। মিরপুর-২ এর ৬০ ফিট রোডের বারেক মোল্লা মোড়ের বাসিন্দা এক যুবক বাসার প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে নিচে নামেন। গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে পার হওয়ার সময় হঠাৎ তার নজর পড়ে ওই নারীর পিঠের দিকে। অপুষ্টি ও অনাহারে ভেসে থাকা তিনটি পিঠের হাড় দেখে যুবকের বুক কেঁপে ওঠে। দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত কোনো কঙ্কালের মতো দেখাচ্ছিল তাকে। যুবকটি প্রথমে দোকান থেকে রুটি এবং পরে হোটেলের মোরগ পোলাও কিনে এনে বারবার খাওয়ার আকুতি জানান ওই নারীকে। তবে খাবার গ্র
রাজধানীর রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো অসংখ্য মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের ভিড়ে তিনি একজন সাধারণ নারী। কিন্তু গত কয়েকদিনে তার জীবন বাঁচাতে এক যুবকের যে আপ্রাণ লড়াই, তা দেশের গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অমানবিক ও ভঙ্গুর প্রতিচ্ছবি উন্মোচন করেছে। আটটি হাসপাতাল ঘুরেও শেষ পর্যন্ত জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং আইনি অভিভাবকের মারপ্যাঁচে চিকিৎসার অধিকার পাননি মুমূর্ষু ওই নারী। নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে রক্তশূন্য শরীর আর ৬০/৪০ রক্তচাপ নিয়ে তাকে আবারও ফিরে যেতে হয়েছে ফুটপাতে।
কঙ্কালসার পিঠ দেখে থমকে যাওয়া সকাল
ঘটনার শুরু গত শুক্রবার (২২ মে) আনুমানিক সকাল ৮টা ৩০ মিনিটের দিকে। মিরপুর-২ এর ৬০ ফিট রোডের বারেক মোল্লা মোড়ের বাসিন্দা এক যুবক বাসার প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে নিচে নামেন। গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে পার হওয়ার সময় হঠাৎ তার নজর পড়ে ওই নারীর পিঠের দিকে। অপুষ্টি ও অনাহারে ভেসে থাকা তিনটি পিঠের হাড় দেখে যুবকের বুক কেঁপে ওঠে। দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত কোনো কঙ্কালের মতো দেখাচ্ছিল তাকে।
যুবকটি প্রথমে দোকান থেকে রুটি এবং পরে হোটেলের মোরগ পোলাও কিনে এনে বারবার খাওয়ার আকুতি জানান ওই নারীকে। তবে খাবার গ্রহণের মতো শক্তিও তার শরীরে ছিল না তখন, ফলে তা প্রত্যাখ্যান করেন।
অভিভাবকহীনতা ‘অপরাধ’, ফিরিয়ে দিলো সব হাসপাতাল
অনাহারে মৃতপ্রায় ওই নারীকে হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন যুবকটি। একজন পুরুষ হিসেবে নারীর গায়ে হাত দেওয়া সমীচীন হবে না ভেবে তিনি সেখানে থাকা দুজন ভিক্ষুক নারীকে তাদের সারাদিনের আয়ের সমপরিমাণ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সঙ্গে নেন। একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তারা পৌঁছান শ্যামলীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে।
সেখানে ডিউটি ডাক্তার রোগীকে দেখে প্রেসক্রিপশন করলেও সাফ জানিয়ে দেন—জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হয় না। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ, যে নিজের নামই বলতে পারেন না, তার এনআইডি কোথা থেকে আসবে— এই প্রশ্নের কোনো উত্তর মেলেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র কিছু ইনজেকশন দিয়ে রোগীকে আবারও রাস্তায় বা কোনো নিরাপদ জায়গায় ফেলে আসার পরামর্শ দেয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ফিরিয়ে দেওয়ার পর যুবকটি বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। তার পরামর্শে রোগীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও শুক্রবার হওয়ায় সাইকিয়াট্রিক আউটডোর বন্ধ ছিল।
বেসরকারি হাসপাতালে ছোটাছুটি
প্রথমে ফার্মগেটের হাই-টেক মডার্ন সাইকিয়াট্রিক হসপিটালে অধ্যাপক মেজর ডা. আব্দুল ওহাবের অনুমতিতে রোগীকে ভর্তি নেওয়া হয়। জামাকাপড় কিনে ও অগ্রিম টাকা দিয়ে যুবকটি অফিসে যান। কিন্তু বিকেলেই হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, রোগীকে ফার্মগেটে রাখা যাবে না, কেরানীগঞ্জের আটিবাজার সেন্টারে নিতে হবে। রাতে আবার ফোন আসে যে রোগী মলমূত্র ত্যাগ করে কাপড় নষ্ট করায় তারা আর রাখতে ইচ্ছুক নন। শনিবার সকালে ডা. ওহাব জানান, রোগীর মানসিক সমস্যার চেয়ে শারীরিক ইনফেকশন বেশি, তাই জেনারেল হাসপাতালে নিতে হবে।
আরও পড়ুন
বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, হাসপাতালে বোম ডিসপোজাল ইউনিট
টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে ১০ বার সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ
এরপর নেওয়া হয় কাজীপাড়ার এক্সিম ব্যাংক হাসপাতালে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. কানিজ ফাতেমা অনন্যার সহায়তায় রোগীকে এখানে ভর্তি করা হয়। কিন্তু অফিসে পৌঁছানোর পরপরই ফোন আসে— রোগী সাইকোটিক আচরণ করছেন, রুমের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, তাই রাখা যাবে না।
এবার নেওয়া হলো মোহাম্মদপুরের নিরাময় ক্লিনিকে। এক্সিম ব্যাংক হাসপাতালের স্টাফের পরামর্শে রোগীকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে এখানে আনা হয়। কিন্তু এখানেও সেই চিরচেনা দেওয়াল— ‘এনআইডি এবং লিগ্যাল গার্ডিয়ান’ লাগবে। তিনটি শেল্টার হোমে ফোন করেও কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
শেষ চেষ্টা আর হতাশা
অ্যাম্বুলেন্স চালকের সহযোগিতায় শেষমেশ ধানমন্ডি-২৭ এর জেনেটিক প্লাজায় অবস্থিত সুপারম্যাক্স হেলথকেয়ার লিমিটেড হাসপাতালে রোগীকে ভর্তি করা হয়। পিজি হাসপাতালের ডা. মানস কান্তি মজুমদারের অধীনে শুরু হয় চিকিৎসা। রুটিন টেস্টে দেখা যায় নারীর রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে নেমে দাঁড়িয়েছে ৬০/৪০-এ, হিমোগ্লোবিন মাত্র ৬। রোগীর রক্তের গ্রুপ ‘ও’ পজিটিভ (O+) হওয়ায় ওই যুবক নিজেই রাতে এক ব্যাগ রক্ত দেন।
কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তি বদলায়নি। পরদিন রোববার সুপারম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও জানিয়ে দেয়— তারা আর রোগী রাখবেন না, ডেডিকেটেড মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
ব্যর্থতার দায় কার, রাষ্ট্র নাকি জনতার
টানা তিনদিনের অমানুষিক চেষ্টা, অর্থ ব্যয় এবং ৮টি হাসপাতালের দুয়ারে ঘুরে যুবকটি তখন মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ও নিঃশেষ। দেশের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার এই নির্মমতার কাছে পরাজিত হয়ে গত রোববার বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে রোগীকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করিয়ে আবারও রাস্তার পাশে রেখে আসতে বাধ্য হন তিনি।
বিকেলে যখন মুষলধারে বৃষ্টি নামছিল, তখন বারেক মোল্লা মোড়ে বা পাশের খোলা রাস্তায় হয়তো ভিজছিলেন তীব্র রক্তশূন্যতায় ভুগতে থাকা ওই নারী। যুবকটি নিজের অসহায়ত্ব থেকে পাশের একটি হোটেলে কিছু টাকা জমা রেখে এসেছেন, যাতে একজন ওয়েটার প্রতিদিন তিনবেলা অন্তত কিছু খাবার ও পানি ওই নারীর মুখে তুলে দেয়।
অসহায় যুবকটির ফেসবুক স্ট্যাটাসের শেষ লাইনে ঝরে পড়েছে এক বুক হাহাকার আর তীব্র ক্ষোভ। ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘আমার ক্ষুদ্র জায়গা থেকে আমি সবটুকু চেষ্টা করেও এই ভদ্রমহিলাটাকে কোনো চিকিৎসা করাতে পারলাম না। এই দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা কবে মানবিক আর রোগীবান্ধব হবে আমি জানি না। রাষ্ট্র তুমি ব্যর্থ, এটুকুই বলবো।’
এসইউজে/কেএসআর
What's Your Reaction?