পরীক্ষার ফলাফল কি জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ?

মো. মাজহারুল ইসলাম প্রতি বছর মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের ওপর তীব্র মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। অসুস্থ সামাজিক প্রতিযোগিতা আর সর্বোচ্চ ফলাফল পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতামুখী মানসিকতা শিক্ষার্থীদের জীবনকে চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পারিবারিক মানসিকতা বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে; যেখানে মেধার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে পরীক্ষার খাতায় সর্বোচ্চ নম্বর বা গ্রেড। ফলাফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রতিবেশীদের আড্ডা পর্যন্ত সবখানেই চলে ফলাফলের চুলচেরা বিশ্লেষণ। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের একটি পরিমাপক অবশ্যই। তবে মেধা মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড নয়। তবুও কাঙ্ক্ষিত গ্রেড না পাওয়া শিক্ষার্থীটির মনের ভেতর তখন কী চলে সেই খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন কেউ বোধ করে না। যে শিক্ষার্থী সমাজ নির্ধারিত এই ভালো ফলাফল পায় না, তার ওপর নেমে আসে এক অদৃশ্য সামাজিক নির্যাতন। আরও পড়ুন শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্মার্ট কার্ড’! বদলে যেতে পারে শিক্ষাঙ্গনের চিত্র পরি

পরীক্ষার ফলাফল কি জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ?

মো. মাজহারুল ইসলাম

প্রতি বছর মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের ওপর তীব্র মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। অসুস্থ সামাজিক প্রতিযোগিতা আর সর্বোচ্চ ফলাফল পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতামুখী মানসিকতা শিক্ষার্থীদের জীবনকে চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পারিবারিক মানসিকতা বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে; যেখানে মেধার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে পরীক্ষার খাতায় সর্বোচ্চ নম্বর বা গ্রেড। ফলাফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রতিবেশীদের আড্ডা পর্যন্ত সবখানেই চলে ফলাফলের চুলচেরা বিশ্লেষণ।

পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের একটি পরিমাপক অবশ্যই। তবে মেধা মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড নয়। তবুও কাঙ্ক্ষিত গ্রেড না পাওয়া শিক্ষার্থীটির মনের ভেতর তখন কী চলে সেই খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন কেউ বোধ করে না। যে শিক্ষার্থী সমাজ নির্ধারিত এই ভালো ফলাফল পায় না, তার ওপর নেমে আসে এক অদৃশ্য সামাজিক নির্যাতন।

পরিবার ও চারপাশের মানুষের অবহেলায় তাকে যেন অপরাধী বানিয়ে ফেলা হয়। এই তীব্র গ্লানি ও অপমানের বোঝা সইতে না পেরে প্রতি বছর অনেক শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নেন। এই বাস্তবতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে আসলেই কি একটি পরীক্ষার ফল একটি প্রাণের চেয়ে মূল্যবান?

মাধ্যমিক পরীক্ষা প্রকৃতপক্ষে উচ্চশিক্ষার একটি প্রাথমিক ধাপ মাত্র; জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। পরীক্ষায় সাধারণ ফল করেও অধ্যবসায় ও চেষ্টার জোরে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন আমাদের চারপাশেই এমন মানুষের অভাব নেই। একটি পরীক্ষার ফলাফলের চেয়ে একটি জীবন যে অনেক বেশি মূল্যবান; এই বোধ আমাদের সমাজে গড়ে তুলতে হবে। পরিবারকেই প্রথম সন্তানের মানসিকতা বুঝতে হবে।

পরীক্ষায় তথাকথিত ভালো ফলাফল না করেও যে জীবনে সফল হওয়া যায়। দেশ ও মানুষের সেবা করা যায়। এই আত্মবিশ্বাস অভিভাবকদেরই বুঝিয়ে দিতে হবে। সর্বোচ্চ নম্বরের পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান অর্জন ও নৈতিকতা গঠনে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মুখস্থবিদ্যার জোরে সর্বোচ্চ ফল ছোঁয়ার চেয়ে একজন সংবেদনশীল ও সৎ মানুষ হয়ে ওঠাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবারের পাশাপাশি সমাজকেও তার আচরণ বদলাতে হবে। বিশেষত যারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে বা প্রত্যাশিত নম্বর পায়নি তাদের প্রতি। তাদের ধিক্কার না দিয়ে বুকে টেনে নিয়ে সাহস জোগাতে হবে। কারণ একটি ব্যর্থতা কোনো শিক্ষার্থীর সামগ্রিক সম্ভাবনার প্রতিফলন নয়। ভুলগুলো শুধরে নিয়ে কীভাবে আগামীতে নতুন উদ্যমে শুরু করা যায়, সেই পথ দেখানো সমাজের সব মানুষের কর্তব্য।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষা বোর্ডের উচিত মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও চাপমুক্ত ও যুগোপযোগী করা, যাতে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ তথ্যের পুনরাবৃত্তির চেয়ে নিজের মৌলিক মেধা ও দক্ষতার প্রকাশ ঘটাতে পারে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।

পরীক্ষার ফলাফল যা-ই হোক না কেন, প্রতিটি সন্তান যেন তার পরিবারে ও সমাজে নিরাপদ আশ্রয় পায়। তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। একটি জাতির প্রকৃত সাফল্যের পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার সন্তানদের মানসিক নিরাপত্তা ও মানবিক বিকাশে; গ্রেড পয়েন্টের সংখ্যায় নয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow