পাটকাঠির মতো সাধারণ কৃষিজ বর্জ্যকে উচ্চমূল্যের ভবিষ্যৎ উপকরণে রূপান্তর করার এক উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক সাফল্যের কথা জানিয়েছেন ড. মো. আব্দুল আজিজের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল।
তারা সৌদি আরবের কিং ফাহাদ ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেলসে এই কাজটি সম্পন্ন করেছেন। তারা পাটকাঠি ব্যবহার করে অত্যন্ত স্থিতিশীল, উচ্চ কার্যক্ষম ও উচ্চ সক্রিয় গ্রাফিন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
এ গবেষণাকে টেকসই ন্যানোম্যাটেরিয়াল উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী Chemistry – An Asian Journal-এ।
গবেষণায় দেখানো হয়েছে, সহজ একটি তাপপ্রয়োগ পদ্ধতির মাধ্যমে, নিষ্ক্রিয় পরিবেশে পাটকাঠি থেকে ত্রিমাত্রিক সংযুক্ত (three-dimensional interconnected) গ্রাফিন কাঠামো তৈরি করা সম্ভব। গবেষকদের মতে, এই পদ্ধতি পরিবেশবান্ধব, শিল্পে প্রয়োগযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে গ্রাফিন উৎপাদনের পথ খুলে দেয়। যেসব দেশে পাট ব্যাপকভাবে চাষ হয়, সেখানে এই প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও বেশি।
পদ্ধতির প্রথম ধাপে পাটকাঠির গুঁড়া থেকে অ্যাক্টিভেটেড কার্বন ন্যানোশিট প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তী ধাপে উপাদানটিকে প্রায় ২ হাজার ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে উত্তপ্ত করা হয়, যার ফলে একটি উন্নত গ্রাফিন কাঠামো তৈরি হয়। গবেষণার ফলাফলে একস্তর গ্রাফিনের সঙ্গে সম্পর্কিত তীক্ষ্ণ ডিফ্র্যাকশন শিখর, খুব কম ত্রুটি এবং উচ্চমাত্রার স্ফটিক গঠন শনাক্ত হয়েছে।
ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে দেখা যায়, অতি পাতলা ন্যানোশিটগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি ছিদ্রযুক্ত ত্রিমাত্রিক নেটওয়ার্ক গঠন করেছে। মৌলিক বিশ্লেষণে নিশ্চিত করা হয়েছে, উপাদানটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিশুদ্ধ কার্বন দিয়ে তৈরি।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই গ্রাফিন তাপ ও রাসায়নিক—উভয় পরিবেশেই অত্যন্ত স্থিতিশীল। বাতাসে প্রায় ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত এটি জ্বলন শুরু না করে স্থিতিশীল থাকে। এমনকি শক্ত অ্যাসিড দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার পরও এর কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।
এই গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো এর ইলেকট্রোকেমিক্যাল কর্মদক্ষতা। গবেষকরা দেখিয়েছেন, সালফাইডের ইলেকট্রোঅক্সিডেশন প্রক্রিয়ায় এই গ্রাফিন খুব কম ভোল্টেজে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং উচ্চ কারেন্ট ঘনত্ব দেয়। এটি দ্রুত চার্জ আদান-প্রদান এবং শক্তিশালী ইলেকট্রোক্যাটালাইটিক সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়। ফলে সালফাইড শনাক্তকরণ, জলদূষণ পর্যবেক্ষণ ও পরিবেশগত সেন্সিং প্রযুক্তিতে এর ব্যবহার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
গবেষকরা আরও জানান, গ্রাফিন তার উচ্চ বিদ্যুৎ পরিবাহিতা, দ্রুত চার্জ-বাহক গতি, শক্ত যান্ত্রিক গঠন, নমনীয়তা, স্বচ্ছতা ও অসাধারণ তাপ পরিবাহিতার জন্য ইতোমধ্যেই সুপারক্যাপাসিটার, ব্যাটারি, সেন্সর, পানি পরিশোধন, শক্তি সঞ্চয়, ইলেকট্রনিক্স এবং ইলেকট্রোক্যাটালাইসিসে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত। পাটকাঠি থেকে তৈরি এই গ্রাফিন সেই সম্ভাবনাকে আরও বাস্তবমুখী করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টেকসই উন্নয়ন। সাধারণত গ্রাফিন উৎপাদন ব্যয়বহুল ও জটিল। সেখানে স্বল্পমূল্যের কৃষিজ বর্জ্য ব্যবহার করে উচ্চমানের গ্রাফিন তৈরি খরচ কমানোর পাশাপাশি কৃষিজ বর্জ্যের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করছে। গবেষকেরা এটিকে “বায়োমাস ভ্যালোরাইজেশন”-এর একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখছেন, যা ভবিষ্যতে বড় পরিসরে প্রাকৃতিক উৎস থেকে উন্নত উপকরণ উৎপাদনের পথ দেখাতে পারে।
গবেষণা সংশ্লিষ্টরা:
ড. মো. আব্দুল আজিজ (গবেষণা দলনেতা)
এস. এস. শাহ, এইচ. ইয়াং, এম. আশরাফ, এম. এ. এ. কাসেম, এ. এস. হাকিম
প্রকাশনা: Chemistry – An Asian Journal (Chem Asian J. 2022, 17, e202200567)