পাহাড়খেকোদের ছোবলে নীল ‘নাগিন পাহাড়’

পাহাড়-টিলা কেটে আশপাশে গড়ে উঠেছে অট্টালিকা পাহাড়ের চূড়া কেটে সমতল করে তৈরি হচ্ছে বসতি পাহাড়-নদী-সাগরের অপূর্ব মেলবন্ধনের জেলা বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। অপরিকল্পিত নগরায়ণে ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার ঐতিহ্য। পাহাড়খেকোদের লালসায় বিলীন হচ্ছে অসংখ্য পাহাড়। কেউ কাটছে কৌশলে, কেউ দিনদুপুরে। নগরীর এমন একটি এলাকা বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন চন্দ্রনগর এলাকার নাগিন পাহাড়। সময়ের ব্যবধানে পাহাড়টির আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অট্টালিকা। পাহাড়টির পাদদেশে তৈরি হয়েছে আরও বেশ কয়েকটি আবাসিক প্লট। যেগুলোতে হয়তো ধীরে ধীরে উঠবে ইট-পাথরের দালান। এতে ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে নাগিন পাহাড়। পরিবেশ-প্রতিবেশ হারাচ্ছে ভারসাম্য। চারপাশ থেকে পাহাড়খেকোদের ছোবলে যেন নীল নাগিন। নাগিন পাহাড়কে চারপাশ থেকে চেপে ধরছে সুউচ্চ ভবন/জাগো নিউজ সরেজমিনে দেখা যায়, নাগিন পাহাড়ের পাদদেশে গত কয়েক বছর আগেও বিশাল মাঠ ছিল। যে মাঠে স্থানীয় শিশু-কিশোররা খেলাধুলা করতো। এখন সেই মাঠও নেই। পাহাড়টির চারদিকে নতুন করে গড়ে উঠছে স্থাপনা। এসব স্থাপনায় নাম উল্লেখ করে সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়েছে। আবার দেওয়ালে লিখেও মালিক সেজেছেন অনেকে। বেশ কয়েকটি সীমানা দেওয়া প্লটও চোখে প

পাহাড়খেকোদের ছোবলে নীল ‘নাগিন পাহাড়’
  • পাহাড়-টিলা কেটে আশপাশে গড়ে উঠেছে অট্টালিকা
  • পাহাড়ের চূড়া কেটে সমতল করে তৈরি হচ্ছে বসতি

পাহাড়-নদী-সাগরের অপূর্ব মেলবন্ধনের জেলা বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। অপরিকল্পিত নগরায়ণে ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার ঐতিহ্য। পাহাড়খেকোদের লালসায় বিলীন হচ্ছে অসংখ্য পাহাড়। কেউ কাটছে কৌশলে, কেউ দিনদুপুরে। নগরীর এমন একটি এলাকা বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন চন্দ্রনগর এলাকার নাগিন পাহাড়।

সময়ের ব্যবধানে পাহাড়টির আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অট্টালিকা। পাহাড়টির পাদদেশে তৈরি হয়েছে আরও বেশ কয়েকটি আবাসিক প্লট। যেগুলোতে হয়তো ধীরে ধীরে উঠবে ইট-পাথরের দালান। এতে ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে নাগিন পাহাড়। পরিবেশ-প্রতিবেশ হারাচ্ছে ভারসাম্য। চারপাশ থেকে পাহাড়খেকোদের ছোবলে যেন নীল নাগিন।

পাহাড়খেকোদের ছোবলে নীল ‘নাগিন পাহাড়’নাগিন পাহাড়কে চারপাশ থেকে চেপে ধরছে সুউচ্চ ভবন/জাগো নিউজ

সরেজমিনে দেখা যায়, নাগিন পাহাড়ের পাদদেশে গত কয়েক বছর আগেও বিশাল মাঠ ছিল। যে মাঠে স্থানীয় শিশু-কিশোররা খেলাধুলা করতো। এখন সেই মাঠও নেই। পাহাড়টির চারদিকে নতুন করে গড়ে উঠছে স্থাপনা। এসব স্থাপনায় নাম উল্লেখ করে সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়েছে। আবার দেওয়ালে লিখেও মালিক সেজেছেন অনেকে। বেশ কয়েকটি সীমানা দেওয়া প্লটও চোখে পড়লো।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকাটির নাম চন্দ্রনগর। নাগিন পাহাড়ের চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ১৭টির মতো ইটভাটা ছিল। ২০০৭ সালে ফখরুদ্দিন সরকার আসার পর ইটভাটাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। এরপর ওই জায়গায় ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে বড় বড় অট্টালিকা। সংকুচিত হয়ে পড়েছে পাহাড়টি।

বায়েজিদের নাগিন পাহাড় রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব সময় নজরদারি থাকে। এর আগেও বেশ কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। অনেককে জরিমানা করা হয়েছে। আদালতেও বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে।-নগরীর কাট্টলী সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হুছাইন মুহাম্মদ

পাহাড়টির পাদদেশে রয়েছে একটি রিকশা গ্যারেজ। গ্যারেজে রিকশা-ভ্যান মেরামত করছিলেন আবুল কাশেম নামে এক মেকানিক। কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি ১০-১২ বছর। এখানে পাহাড়ের চারপাশে মাটি পড়ে ছিল। মাটি সরিয়ে স্থানীয়রা চলাচলের রাস্তা করেছে।’ তার চোখের সামনেই আশপাশের অনেকগুলো ভবন উঠেছে বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন

৪০ বছর ধরে চন্দ্রনগর এলাকায় বসবাস করছেন দেলোয়ার হোসেন। একসময়ে ওই এলাকার ইটভাটাগুলোতে শ্রমিকের কাজ করতেন। কথা হলে দেলোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি চন্দ্রনগর এলাকায় বসবাস করছি প্রায় ৪০ বছর ধরে। এখানে ১৭টি ইটভাটা ছিল। পুরো এলাকায় ছিল অসংখ্য টিলা। টিলার মাটি দিয়ে ভাটাগুলোতে ইট তৈরি করা হতো। ফখরুদ্দিন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সব ইটভাটা বন্ধ করে দেয়। তৎকালীন মেয়র মহিউদ্দীন চৌধুরী সিটি করপোরেশন থেকে ইটভাটাগুলো নষ্ট করেন। এরপর সব ইটভাটা উঠে গেছে।’

পাহাড়খেকোদের ছোবলে নীল ‘নাগিন পাহাড়’চূড়া সমান করে তৈরি হচ্ছে স্থাপনা/জাগো নিউজ

ইটভাটাগুলোর মালিকানার বিষয়ে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘দক্ষিণ পাশের ঝাড়–তলার কলসি কলোনির ইয়াকুব মুন্সির একটি ইটভাটা ছিল। আবুল কোম্পানির ছিল পাঁচটি। কাশেম চৌধুরীর ছিল তিনটি, অলি সওদাগরের দুটি, দেলোয়ার কোম্পানির একটি। আরও অনেকের ছিল। এদের কেউ এখন বেঁচে নেই।’

তিনি বলেন, ‘এখন কেউ আর পাহাড় কাটে না। বর্ষাকালে পাহাড় থেকে ঝিরির মতো হয়ে ধসে মাটি নিচে নেমে আসে। সেসব মাটি পরিষ্কার করলে পরের মৌসুমে আবার মাটি নামে। তবে পাহাড়টির ওপরের অবস্থা সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। ওপরে উঠতে হলে বাংলাবাজার রাস্তা হয়ে আসতে হয়। ওখানে অনেকে বসতি তৈরি করেছে। গাড়ি নিয়ে ওখানে যাওয়া যায় না।’

পাহাড় কাটা নিয়ে আইন কী বলে

ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী পাহাড় বা টিলা কেটে বা এর ওপর কোনো অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ। দ্যা বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট-১৯৫২ এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-১৯৯৬) অনুযায়ী পাহাড় ও টিলা কর্তন এবং সেখানে ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, যথাযথ কর্তৃপক্ষের (যেমন: চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিডিএ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউক কিংবা কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-কউক) লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো পাহাড় বা টিলা কাটা যাবে না এবং সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। অনুমতি ব্যতীত যে কোনো ধরনের নির্মাণকাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অবৈধ বলে গণ্য হয়।

পাশাপাশি বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী, সরকারি বা জাতীয় স্বার্থ ছাড়া অন্য কোনো কারণে পাহাড় ও টিলা কাটা বা রূপান্তর করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই আইন অমান্য করলে অননুমোদিত স্থাপনা উচ্ছেদসহ জেল ও জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়ে পাহাড় ও টিলা কাটা এবং স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রামের সিনিয়র আইনজীবী ও দেশের শীর্ষ মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) কেন্দ্রীয় মহাসচিব জিয়া হাবীব আহসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আইনিভাবে পাহাড় কাটার সুযোগ নেই। পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের সুযোগ নেই। সিডিএতে জনবলের সংকট রয়েছে। তারা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিলেও ভবন নির্মাণে পাহাড় কাটার সময় বাধা দিতে পারে না। তারাই (সিডিএ) নাগিন পাহাড়ের আশপাশে ভবন নির্মাণের প্ল্যান অনুমোদন দিয়েছে। অথচ ওইসব স্থানে পাহাড় টিলা ছিল। এভাবে চলতে থাকলে চট্টগ্রাম এসময় পাহাড়শূন্য হয়ে যাবে।’

আরও পড়ুন

গত ১ জুন নাগিন পাহাড়ে এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। অভিযানের সময় পাহাড় কাটার প্রমাণ পেয়ে চন্দনগর এলাকার গ্রিনভ্যালি আবাসিক-২ এর বাসিন্দা মহিউদ্দিন আরিফকে নোটিশ দিয়ে শুনানিতে ডাকা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মহিউদ্দিন আরিফ নিজেকে বায়েজিদ এলাকায় সাংবাদিক পরিচয় দেন।

এখন নাগিন পাহাড়টি যে অবস্থায় আছে, তাতেও পাহাড়খেকোদের কুদৃষ্টি রয়েছে। আশপাশে সবগুলো আবাসিক স্থাপনা হয়ে গেছে। এখন পাহাড়টি বর্তমান অবস্থায় যাতে সংরক্ষণ করা যায়, পরিবেশ অধিদপ্তর সব সময় সজাগ থাকে। আমরা নিয়মিত মনিটরিং করি।-পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা

নগরীর কাট্টলী সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হুছাইন মুহাম্মদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বায়েজিদের নাগিন পাহাড় রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব সময় নজরদারি থাকে। এর আগেও বেশ কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। অনেককে জরিমানা করা হয়েছে। আদালতেও বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে।’

নাগিন পাহাড়প্রকাশ্যে কাটা হয় পাহাড়/জাগো নিউজ

চলতি সপ্তাহে পরিবেশ অধিদপ্তরও নাগিন পাহাড় পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিয়েছে জানিয়ে বলেন, ‘সবমিলিয়ে বর্তমানে যে অবস্থায়, সে অবস্থায় আর যাতে কেউ পাহাড় কাটতে না পারে সে বিষয়ে সব সময় সতর্ক নজরদারি থাকবে।’

এ বিষয়ে কথা হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মনির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘নাগিন পাহাড় নিয়ে ২০২১ সালের পর থেকে বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। আদালতে মামলাগুলোর বিচার চলমান।’

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘পুরো চট্টগ্রাম অসংখ্য পাহাড়বেষ্টিত। নগরীর বায়েজিদে নাগিন পাহাড়টি একটি আলোচিত পাহাড়। একসময়ে পাহাড়টির পাদদেশে বেশ কয়েকটি ইটভাটা ছিল। বেশ কয়েক বছর আগে পরিবেশ অধিদপ্তর ইটভাটাগুলো গুঁড়িয়ে দেয়। পরবর্তীসময়ে দেখা যায় নাগিন পাহাড়ের আশপাশে বহুতল অনেক ভবন উঠেছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন নাগিন পাহাড়টি যে অবস্থায় আছে, তাতেও পাহাড়খেকোদের কুদৃষ্টি রয়েছে। আশপাশে সবগুলো আবাসিক স্থাপনা হয়ে গেছে। এখন পাহাড়টি বর্তমান অবস্থায় যাতে সংরক্ষণ করা যায়, পরিবেশ অধিদপ্তর সব সময় সজাগ থাকে। আমরা নিয়মিত মনিটরিং করি।’

যেভাবে নামকরণ ‘নাগিন পাহাড়’

বায়েজিদের চন্দ্রনগর এলাকার নাগিন পাহাড় নামকরণের কোনো দাপ্তরিক দলিল নেই। জনশ্রুতি রয়েছে- পাহাড়টির ভৌগোলিক গঠন বা আকৃতি ঠিক সাপের মতো ছিল। এর লম্বা ও আঁকাবাঁকা বিস্তৃতির কারণে স্থানীয় লোকজন পাহাড়টিকে ‘নাগিন পাহাড়’ বলেন।

পাহাড়টির নামকরণ নিয়ে দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমি এ এলাকায় ৪০ বছর ধরে বসবাস করি। গত কয়েকবছর ধরে পাহাড়টির নাম নাগিন পাহাড় বলে জানতে পারি। পাহাড়ি এলাকায় এমনিতে সাপের আনাগোনা বেশি থাকে। বিষাক্ত সাপের আনাগোনার কারণে স্থানীয়রা লোকমুখে বলতে বলতে পাহাড়টির নাম ‘নাগিন পাহাড়’ হয়েছে।

এমডিআইএইচ/এএসএ/ এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow