পুরোদমে চলছে চারুকলার বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি

দরজায় কড়া নাড়ছে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। আর পহেলা বৈশাখে একটি বড় জায়গা দখল করেছে চারুকলার শোভাযাত্রা। এবার প্রথমবারের মতো নানা বিতর্ক তুঙ্গে দিয়ে নতুন নামে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে বৈশাখী শোভাযাত্রা। গেল বছরগুলোর মতই এবারো জোরেশোরে চলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলার শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের চারুকলা অনুষদের ডীন। চারুকলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আনন্দ ও মঙ্গল, এই দুটো জিনিস নিয়ে বিভিন্ন জনের, বিভিন্ন মতের কারণে বৃহত্তর সিদ্ধান্তে এবার বৈশাখী শোভাযাত্রা হচ্ছে। এর মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি উদ্যোগ নেওয়া হলো, যাতে জাতি উৎসবমুখর পরিবেশে নববর্ষ উদযাপন করতে পারে।’ এদিকে বাঙালি ও বাঙালিয়ানা সংস্কৃতির মেলবন্ধনের উৎসব পহেলা বৈশাখের বাকি ৪দিন। অন্যান্য বছরের মত এবারও দিন-রাত এক করে কাজ করে যাচ্ছেন এখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ছোট-বড় বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে কাজ করছেন। অনুষদের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কর্মশাল

পুরোদমে চলছে চারুকলার বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি

দরজায় কড়া নাড়ছে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। আর পহেলা বৈশাখে একটি বড় জায়গা দখল করেছে চারুকলার শোভাযাত্রা। এবার প্রথমবারের মতো নানা বিতর্ক তুঙ্গে দিয়ে নতুন নামে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে বৈশাখী শোভাযাত্রা। গেল বছরগুলোর মতই এবারো জোরেশোরে চলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলার শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের চারুকলা অনুষদের ডীন।

চারুকলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আনন্দ ও মঙ্গল, এই দুটো জিনিস নিয়ে বিভিন্ন জনের, বিভিন্ন মতের কারণে বৃহত্তর সিদ্ধান্তে এবার বৈশাখী শোভাযাত্রা হচ্ছে। এর মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি উদ্যোগ নেওয়া হলো, যাতে জাতি উৎসবমুখর পরিবেশে নববর্ষ উদযাপন করতে পারে।’

এদিকে বাঙালি ও বাঙালিয়ানা সংস্কৃতির মেলবন্ধনের উৎসব পহেলা বৈশাখের বাকি ৪দিন। অন্যান্য বছরের মত এবারও দিন-রাত এক করে কাজ করে যাচ্ছেন এখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ছোট-বড় বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে কাজ করছেন। অনুষদের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কর্মশালায় আঁকা ছবি ও বিভিন্ন শিল্পকর্ম বিক্রি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে আর্থিক অনুদানের অর্থ থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা রং তুলি হাতে নিয়ে মাটির জিনিসপত্রে, মুখোশে বদহারি রঙে রাঙিয়ে তুলছেন। এছাড়া কেউ কেউ অবয়বের বিভিন্ন প্রতিকৃতির চাটাই বুনছেন, কেউবা আঠা দিয়ে চাটাইতে কাগজের আবরণ দিচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ এবং শোভাযাত্রায় বড় মোটিফ থাকছে ৫টি। শোভাযাত্রায় বাউল সংস্কৃতির ওপর আঘাতের প্রতিবাদে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মূল কাঠামো হিসেবে থাকছে ‘দোতারা’। এ ছাড়া শান্তির প্রতীক হিসেবে পায়রা, লোকজ মোটিফ হিসেবে হাতি ও ঘোড়া এবং নতুন দিনের সূচনার বার্তা দিতে থাকছে মোরগ। এছাড়া থাকছে ইতিহাস নির্ভর পটচিত্র।

এবারের নববর্ষ আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে চারুকলা অনুষদের ৭১তম ব্যাচকে। কথা হয় ব্যাচটির গ্রাফিক্স ডিজাইনে শিক্ষার্থী অভি মজুমদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এবার আমরা অনেক কম সময় পেয়েছি। হাতে মাত্র কয়েকটি দিন রয়েছে, আমরা রাত-দিন এক করে কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমরা কাজ শেষ করে ফেলব।’

একই ব্যাচের আরেক শিক্ষার্থী ও ভাস্কর্য বিভাগের সুপ্রিয় বলেন, ‘প্রতিবরাই আমরা ২০ দিন বা ১ মাসের মতো সময় পাই কিন্তু এবার তা আমরা পাইনি। এবারের কাজ বেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করছি, বেশ ভালোভাবেই কাজ শেষ হবে। এখানে যারা কাজ করে, তারা তো অবৈতনিক এবং আমাদের অর্থায়নেই কিন্তু পুরো কাজটি হয়। বিশেষ করে মাস্ক, পেইন্টিংসহ যেসব কাজ আমরা করছি সেগুলো বিক্রি করেই কিন্তু আমাদের কাজগুলো হয়। এবারো সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে এবারের প্রস্তুতি চলছে।’

বৈশাখের এমন আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থেকে চলতি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ দেখা গেছে, বেশ চোখে পড়ার মতন। কথা হয় চারুকলার ভাস্কর্য তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাইরুজ ফাইজার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি শোভাযাত্রায় বড় মোটিফ পায়রা তৈরির দায়িত্বে রয়েছি। যখন একটি রাফ (রুক্ষ) লেআউট থেকে এতো-বড় জিনিস এতো জনের সংস্পর্শে যখন তৈরি হয়, তখন এটি ভালো রাখা বিষয়।’

শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন প্রসঙ্গে ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ রিজিমে কিন্তু নাম পরিবর্তনে কোন সমস্যা হয়নি। তাদের পতনের পর ধর্মীয় একধরনের মব থেকে মঙ্গলকে হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে জড়িয়ে নাম পরিবর্তন করা সত্যি দুঃখজনক। যদি নাম পরিবর্তন বিষয়টি নতুনত্বের বিষয় হয়, তাহলে অবশ্যই বৃহৎ কারণ থাকতো। কিন্তু সেটি নেই, আমরা তো দেখেছি কিভাবে সবদিকে কিভাবে মব করা হয়েছে।’

বৈশাখী শোভাযাত্রা নামে শোভাযাত্রা হচ্ছে, এমন বিষয়টি সেইফ রোল প্লে (নিরাপদ ভূমিকা) পালন করা হচ্ছে বলে ফাইরুজ উল্লেখ করেন। এদিকে ভাস্কর্য স্নাতকোত্তর বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী মাধবী বিশ্বাস বলেন, ‘শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনে কি যায়, আসে। সবাই সম্মিলিত অংশগ্রহণে বৈশাখ উদযাপন করব এটিই তো চাওয়া। যার ফলে আগে এই শোভাযাত্রার যেই উদ্দেশ্য ছিল, সেটি এখনও রয়েছে।’

বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বৈশাখের এই কর্মযজ্ঞে পিছিয়ে নেই সাবেক শিক্ষার্থীরা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘদিন পর দেশে এসে বৈশাখের শোভাযাত্রার প্রস্তুতিতে অংশ নিয়েছেন চারুকলার সাবেক শিক্ষার্থী অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত। তিনি বলেন, ‘চারুকলার বৈশাখের প্রস্তুতি আমাদের জীবনের একধরনের জীবনের অংশ। চারুকলা থেকে তো অনেক শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। আমরা যেখানেই থাকি, আমাদের মন কিন্তু এখানে চলে আসে। তাছাড়া আমাদের সময় আর এখনকার সময়ের মধ্যে আমি কোন পার্থক্য খুঁজে পাই না। আগে যেমন ভালোবাসা-ভালোলাগা ছিল, এখনো তেমন রয়েছে।’

এদিকে বৈশাখের শোভাযাত্রার প্রস্তুতি অর্ধেকের বেশি শেষ হয়েছে জানিয়ে চারুকলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘এ বছর সময় তো অল্প। তাই রাত-দিন এক করে অ্যালামনাই, শিক্ষার্থী শিল্পীরা সাধ্যমতো কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ চলছে, সবমিলিয়ে বলব প্রস্তুতি ভালোই চলছে।’

উল্লেখ্য, নববর্ষের দিন আনন্দ শোভাযাত্রা সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হবে। রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর, বাংলা একাডেমি হয়ে শোভাযাত্রাটি পুনরায় চারুকলা অনুষদে এসে শেষ হবে। নববর্ষের দিন ক্যাম্পাসে বিকাল ৫ টার পর কোনভাবেই প্রবেশ করা যাবে না, শুধু বের হওয়া যাবে। নববর্ষের আগের দিন ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার পর ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারযুক্ত গাড়ি ছাড়া অন্য কোন গাড়ি প্রবেশ করতে পারবে না। নববর্ষের দিন ক্যাম্পাসে কোন ধরনের যানবাহন চালানো যাবে না এবং মোটরসাইকেল চালানো সম্পূর্ণ নিষেধ। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসবাসরত কোন ব্যক্তি নিজস্ব গাড়ি নিয়ে যাতায়াতের জন্য শুধুমাত্র নীলক্ষেত মোড় সংলগ্ন গেইট ও পলাশী মোড় সংলগ্ন গেইট ব্যবহার করতে পারবেন।

আনন্দ শোভাযাত্রা থেকে বৈশাখী শোভাযাত্রা: আশির দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরূদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একইসঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে সর্বপ্রথম আনন্দ শোভাযাত্রার প্রবর্তন হয়। ওই বছরই ঢাকাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এই আনন্দ শোভাযাত্রা। সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীগণ পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এই আনন্দ শোভাযাত্রা বের করার উদ্যোগ প্রতি বছর অব্যাহত রাখে। জানা যায়, ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এই আনন্দ শোভাযাত্রা মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবে নাম লাভ করে। প্রায় তিন দশক পর গত বছর ২০২৫ সালে চারুকলার এই শোভাযাত্রা ফিরে আনন্দ শোভাযাত্রা নামে। পরবর্তীতে নানা তর্ক-বিতর্কের মুখে এবছর ২০২৬ সাল থেকে শোভাযাত্রা হতে যাচ্ছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে।

২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদনক্রমে বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কোর মানবতার অধরা বা অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান লাভ করে। গেল বছর নাম পরিবর্তনের পর ইউনেস্কো গণমাধ্যমকে জানায়, নামকরণ সংক্রান্ত জাতীয় সিদ্ধান্তে তারা কোনো অবস্থান নেয় না। তবে সরকার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করতে হয়। এ বিষয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জানিয়েছে, এবার বৈশাখী শোভাযাত্রার বিষয়টি ইউনেস্কোকে জানানো হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow