লিওনেল মেসিকে নিয়ে আপনার এমন হয় কি না জানি না, আমার হয়। কিবোর্ডে আঙুল চলে না। ভাবতে থাকি। ভাবতেই থাকি। হয়তো কিছু লাইনও লেখা হয়। তবে পছন্দ হয় না। ব্যাকস্পেস চেপে মুছে ফেলি। আবার লিখি। মুছে ফেলি। আবার লিখতে থাকি। এভাবে লেখা-মোছা আবার লেখা চলতে থাকে। ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না কেউ ফার্স্ট পেজের মেকআপ রুম থেকে হুংকার দিয়ে বলে... তাড়াতাড়ি... সিটিপি ছেড়ে দিলাম।
এমনটা হয় কেন? শব্দের অভাব নেই। লেখা অজস্র। তবু কেন এমন বিপন্নতা ? এবং শুধু মেসিকে নিয়েই। তখনই আমার মনে পড়ে... রয়েছি সবুজ মাঠে-ঘাসে—/আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হ’য়ে আকাশে-আকাশে;/জীবনের রং তবু ফলানো কি হয়/এই সব ছুঁয়ে ছেনে’;—সে এক বিস্ময়/ পৃথিবীতে নাই তাহা—আকাশেও নাই তার স্থল,/চেনে নাই তারে ওই সমুদ্রের জল... জীবনানন্দের লাইনগুলো পড়ার পর আমি আশ্বস্ত হই। যেহেতু মেসির খেলায় জীবনের রং ছড়িয়ে আছে, তাই নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে, সহজ শব্দে তাকে ধরা যাবে না। সেই চেষ্টাও বৃথা। মেসির খেলা আর জীবনের বিস্তার যে একই জিনিস। শব্দে কে কবে ধরতে পেরেছে সেই মাধুরী!
মাঠে যে মেসিকে অলস পায়ে হাঁটতে দেখেন। সচকিত পায়ে গোলের দিকে যে মেসি ছুটে যায়—তাকে ধরতে হলে কেবল শব্দ নয় সুরের কাছে অঞ্জলি পেতে দাঁড়াতে হয়। ওটা ফুলের গন্ধের মতো! আকুল করা। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদক কী চমৎকার লিখেছেন... “সেই মুহূর্ত, যখন মনে হলো সময়ের কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করেছে, আকাশ আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে, বাস্তবতা যেন অলৌকিকের কাছে হার মানছে। আর স্টেডিয়ামের সব শক্তি এসে কেন্দ্রীভূত হলো গাঢ় নীল জার্সি পরা, ধীর পায়ে হাঁটা, নির্লিপ্ত সেই মানুষটির চারপাশে। হাঁটতে হাঁটতেই তিনি শুরু করলেন অদ্ভুত এক জাদু—ফাঁকা জায়গাগুলোকে টেনে আনলেন নিজের কাছে, চারপাশের সবকিছুকে নিজের কক্ষপথে ঘুরিয়ে নিলেন। অন্যদিকের প্রতিরোধও যেন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছিল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো মাঠটাই হয়ে উঠল ‘মেসির জগৎ’।”
ফুটবল গুলে খাওয়া গার্ডিয়ান প্রতিবেদক জনাথন লিউ যদি মেসির খেলা দেখে এতটা মুগ্ধ হন, সাধারণের কী অবস্থা হবে আন্দাজ করা যায়! কিন্তু তারা কী করে সেটা ভাষায় প্রকাশ করবে? করার দরকার আছে কি? মেসির খেলা দেখার ভালোলাগাটুকুই কি যথেষ্ট নয়? তবু কেউ যদি টেউয়ের মতো মেসির ড্রিবল থেকে গোল করা দেখে গেয়ে ওঠে... ‘আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে বসন্তের বাতাসটুকুর মতো...’ আমি অন্তত তাকে অতি রোমান্টিক বলতে চাই না।
ফুটবল বোঝা সহজ নয়। ট্যাকটিক্স। লো ডিফেন্স। প্রেসিং। কতরকম খটমট নাম যে আছে। কিন্তু মেসিকে দেখলে মনে হয় খেলাটা খুব সহজ। বল ধরো। ঢেউয়ের মতো ভেসে যাও। পাখির মতো হালকা পাস বাড়াও। গোল করো। এর বাইরে কিছু কি পড়ে থাকে? রায়ান ও’হ্যানলনের লেখাটায় চোখ বুলিয়ে আসি চলুন... ‘একটি ম্যাচ থেকেই তৈরি হয় অগণিত তথ্যের ভান্ডার। তবু ফুটবল এমন এক খেলা, যেখানে সবকিছু সংখ্যায় ব্যাখ্যা করা যায় না। ২২ জন খেলোয়াড়ের পারস্পরিক সমন্বয়, বল পায়ে সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত, পায়ের সঙ্গে বলের অনিশ্চিত আচরণ—সব মিলিয়ে ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয়, সবচেয়ে অনিশ্চিত এবং সবচেয়ে জটিল খেলা। তাই এটাকে বোঝাতে আমরা প্রায়ই জাদু কিংবা অলৌকিক উপমা ব্যবহার করি। সেসবের জীবন্ত প্রতীক লিওনেল মেসি। গত দুই দশক ধরে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন—ফুটবলকে সহজ করে তুলেছেন, যা আমরা মাঠে দেখি—গোল করা, সুযোগ তৈরি করা, ড্রিবলিং, পাসিং, এমনকি মাঠে হাঁটার মধ্যেও তিনি সেরা।’ এরপর আর কিছু না লিখলেও চলে। মেসির হাঁটা দেখে আমার অবশ্য ওস্তাদ আমির খানের রাগ বিস্তার মনে পড়ে। দরবারি কানাড়া। উনি কি যে মধুর করে কমল গান্ধারে সুর লাগাতেন... অলস পায়ে হাঁটতে হাঁটতে চমক জগানো শিহর-দোলায় মেসি যেমন বলে পা ছোঁয়ান। আজ ফাইনালে আরও একবার ওটা দেখতে চাই। আর কোনো চাওয়া নেই!