প্রেমের গল্প: যাত্রী ছাউনি

জি বি এম রুবেল আহম্মেদ প্রখর রোদ। দুপুর দুটা। গ্রীষ্মের উত্তপ্ত দুপুরের মতো পরিবেশ। যেন আগুনের শিখায় কাঁপছে চারপাশ। লাল টুকটুকে শাড়িতে যেন দীপিকা নিজেই এক টুকরো বসন্ত। যাত্রী ছাউনির জানালার গ্রিলে ঝুলে থাকা হরেক রঙের ফুল তার চোখে এনে দেয় স্বপ্নীল দৃশ্য। প্রকৃতির সাথে সাথে আজ তার মনেও বইছে বসন্তের হাওয়া। কপালে লাল টিপ, গলায় হার, কমলার কোয়ার মতো দুটি ঠোঁট—যে চোখের দিকে তাকায়, সে চোখ ফেরাতে পারে না। অথচ সেই চোখ দুটিই এখন অধীর অপেক্ষায় টলমল। মিরপুর বাসস্টপেজে বারোটায় পৌঁছার কথা রুদ্রের। দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও কোনো ছায়া নেই। অপেক্ষার সময় যেতে চায় না। একবার ইচ্ছে হলো একটি তাজা লাল টুকটুকে গোলাপ ছিঁড়ে খোঁপায় বাঁধতে। আবার ভাবলো, হয়তো রুদ্র তার প্রিয় ফুলটি হাতে করে এনে খোঁপায় পরিয়ে দেবে। প্রায় একবছর হয়ে এলো তাদের ফেসবুকে পরিচয়। দুজনের দুই প্রান্তে বাড়ি। আজ তাদের প্রথম সাক্ষাৎ হবে। যাত্রী ছাউনিতে বসে বসে ভাবতে লাগলো তাদের প্রথম পরিচয় পর্বের কথা—‘আপনি কি দীপিকা রানী?’‘জি, কিন্তু আপনাকে তো চিনতে পারলাম না।’‘আমাকে চেনার কথা না, আমার বন্ধুর মুখে আপনার প্রশংসা শুনেছি।’‘প্রশংসা করার মতো আমার কিছু নেই।

প্রেমের গল্প: যাত্রী ছাউনি

জি বি এম রুবেল আহম্মেদ

প্রখর রোদ। দুপুর দুটা। গ্রীষ্মের উত্তপ্ত দুপুরের মতো পরিবেশ। যেন আগুনের শিখায় কাঁপছে চারপাশ। লাল টুকটুকে শাড়িতে যেন দীপিকা নিজেই এক টুকরো বসন্ত। যাত্রী ছাউনির জানালার গ্রিলে ঝুলে থাকা হরেক রঙের ফুল তার চোখে এনে দেয় স্বপ্নীল দৃশ্য। প্রকৃতির সাথে সাথে আজ তার মনেও বইছে বসন্তের হাওয়া। কপালে লাল টিপ, গলায় হার, কমলার কোয়ার মতো দুটি ঠোঁট—যে চোখের দিকে তাকায়, সে চোখ ফেরাতে পারে না। অথচ সেই চোখ দুটিই এখন অধীর অপেক্ষায় টলমল।

মিরপুর বাসস্টপেজে বারোটায় পৌঁছার কথা রুদ্রের। দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও কোনো ছায়া নেই। অপেক্ষার সময় যেতে চায় না। একবার ইচ্ছে হলো একটি তাজা লাল টুকটুকে গোলাপ ছিঁড়ে খোঁপায় বাঁধতে। আবার ভাবলো, হয়তো রুদ্র তার প্রিয় ফুলটি হাতে করে এনে খোঁপায় পরিয়ে দেবে।

প্রায় একবছর হয়ে এলো তাদের ফেসবুকে পরিচয়। দুজনের দুই প্রান্তে বাড়ি। আজ তাদের প্রথম সাক্ষাৎ হবে। যাত্রী ছাউনিতে বসে বসে ভাবতে লাগলো তাদের প্রথম পরিচয় পর্বের কথা—
‘আপনি কি দীপিকা রানী?’
‘জি, কিন্তু আপনাকে তো চিনতে পারলাম না।’
‘আমাকে চেনার কথা না, আমার বন্ধুর মুখে আপনার প্রশংসা শুনেছি।’
‘প্রশংসা করার মতো আমার কিছু নেই।’
‘নিশ্চয়ই আপনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত?’
‘জি, ঠিকই জেনেছেন। তা আপনার পরিচয়? কার কাছে এসব জানলেন?’
‘আমার বন্ধু। তাকে অবশ্য আপনি চিনবেন। তার নানাবাড়ি আপনার এলাকায়...’

এভাবেই তাদের যোগাযোগ বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে দীপিকার মায়ায় পড়ে যায় রুদ্র। গত বছর বসন্তের কোনো এক মধুর বিকেলে তাদের কথোপকথন শুরু হয়েছিল। আজ সাক্ষাতে তারা দুজন দুজনকে বাস্তবে দেখবে। দীপিকাও তাকে খুব ভালোবাসে। বলতে গেলে তাকে ছাড়া আর কিছুই মাথায় আসে না।

সেই কখন থেকে কল দিচ্ছে দীপিকা, রুদ্রের ধরা-ছোঁয়ার নামগন্ধই নেই। ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ রুদ্র কল ব্যাক করল—‘দুঃখিত প্রিয়, ফোন সাইলেন্ট ছিল। বাসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তাই ফোন ধরতে পারিনি। জ্যামের কারণে পৌঁছতে লেট হচ্ছে। প্লিজ ওয়েট আ লিটল লংগার।’
দীপিকার কোনো কথা বলার নেই। সে অভিমানে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আস্তে করে উত্তর দিলো, ‘ওকে, আমি সেখানেই বসা। ইচ্ছে হলে আসেন।’ বলে লাইন কেটে দিলো।
রুদ্র অনেক সুন্দর করে কথা বলতে পারে। প্রথম কথাতেই তাকে দুর্বল করে দিয়েছে। আজ সে বসে বসে সেসব স্মৃতিচারণ করছে।

একবার দীপিকার জ্বর হয়েছিল। সারারাত ঘুমাতে পারেনি। রুদ্রও সারারাত নির্ঘুম কথা বলে কাটিয়ে দিয়েছে। অনেক কেয়ারিং সে। মাঝেমাঝে খুব পাগলামি করে। দীপিকার মনে হয়, নশ্বর দুনিয়ায় তার মতো হয়তো আর কেউ ভালোবাসতে পারে না।

একদিন রুদ্রের পাগলামি দীপিকাকে বিস্মিত করে। হঠাৎ ডাকপিয়ন বাড়িতে এলেন, ‘আপা, আপনার নামে একটা চিঠি আসছে। এই ধরেন...’ বলে তিনি চলে গেলেন। দীপিকা অবাক, জীবনে এই প্রথম ডাকে কোনো কাগজ পেলো। সে শুনতো, আগে নাকি এমন চিঠি আদান-প্রদান হতো। আজ বাস্তবে দেখলেন। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় আজকাল কেউ চিঠি লেখে না।

দেরি সহ্য হচ্ছে না, খামের ওপরে ‘প্রিয় দীপিকা’ লেখা। প্রেরকের নাম নেই। খুব আগ্রহে চিঠিটা খুললো। খুলে যা দেখলো, তা কোনো দিন কল্পনা করেনি!
‘প্রিয় দীপিকা,
জানি অবাক হচ্ছো! এ যুগে আমার মতো কেউ কাউকে চিঠি লেখে কি না—এই ভেবে। আসলে আমি চিঠি লিখতে ভালোবাসি। গত একবছরে তোমার প্রতি আমার পবিত্র ভালোবাসার প্রকাশ, মু্খে বলে শেষ করতে পারিনি। তাই মনের অজানা কথাগুলো চিরকুটে লিখে নিজেকে হালকা করার চেষ্টা করছি।
জানো দীপিকা, আমার প্রচণ্ড ভয় হয়। কোনোদিন যদি আমি তোমার পাশে না থাকি, কী নিয়ে থাকবে তুমি? আমাদের মাঝে এমন কোনো স্মৃতিও নেই। তাই চিরকুটটি তোমার কাছে স্মৃতিস্বরূপ রেখে দিও। তুমি জানো না, তোমাকে কতটা ভালোবাসি। কতখানি চাই। যেমন করে মৃত পথযাত্রী এক ফোঁটা পানির তৃষ্ণায় বেঁচে থাকে। পৃথিবীর বুকে তোমাকে কাছে পাওয়ার আমার যে ইচ্ছাশক্তি, তা কারো মধ্যে আছে কি না আমার জানা নেই। আমি দূর থেকে তোমাকে অন্ধের মতো ভালোবাসি। আমি সেদিন ধন্য হব; যেদিন আমার ভালোবাসা তোমার তরে বিলিয়ে দিতে পারব।
জানি না, দুনিয়াতে মায়া কাকে বলে! আমি মায়া বলতে তোমার ভাষাকে বুঝি। তোমার নিঃশ্বাসের প্রতিটা শ্বাস-প্রশ্বাসকে বুঝি। জানি না, বিধাতা তোমার সাথে আমার মিলন লিখেছেন কি না? তবে এ জনমের পর যদি ওই জনমেও তোমাকে পাওয়ার সুযোগ থাকে, আমার তাঁর নিকট প্রার্থনা একটাই—সে জনমেও আমি যেন তোমাকেই পাই। তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলব—‘তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি/ শত রূপে শত বার/ জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।/ চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয়/ গাঁথিয়াছে গীতহার,/ কত রূপ ধরে পরেছ গলায়,/ নিয়েছ সে উপহার/ জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।’
ইতি, তোমার পাগল এই আমি—রুদ্র।’

দীপিকা আজও চিঠিটা সঙ্গে এনেছে। তাই যাত্রী ছাউনিতে বসে বসে চিঠিটা আবারও পড়তে লাগল। রুদ্রের অপেক্ষায় তার কথা ভেবে ভেবেই সময় যাচ্ছে।

হঠাৎ রাস্তার পাশে কিছু মানুষের ভিড় লক্ষ্য করলো দীপিকা। দূর থেকে দেখতেই তার চোখ কেঁপে উঠলো—ট্রাফিক পুলিশ এক ব্যক্তিকে রক্তমাখা অবস্থায় রাস্তার পাশে এনে রাখছে। হৃদয় অচেতন হয়ে ওঠার উপক্রম। মানুষের চিৎকার, ট্রাফিকের আওয়াজ—সব মিলিয়ে যেন সময় থমকে গেছে।

দীপিকা হঠাৎ বুঝলো। সে আতঙ্কিত হয়ে একপাশে দাঁড়ালো, চোখে পানি ঝরছে। ফোনটা তখনই বেজে উঠলো—রুদ্রের নম্বর। সে কল ধরলো কিন্তু রিংয়ের মাঝেই ফোনটি পকেটে থাকা মৃতদেহের কাছে চলে গেল।

চিৎকার করে সে হোঁচট খেলো—চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গেল। বসন্তের বিকেল, যাত্রী ছাউনির বেঞ্চ, রুদ্রের সেই পাগলামি চিঠি—সবই এখন বাতাসে উড়ে যাচ্ছে।

দীপিকার হৃদয় বেদনার তীব্র ছোঁয়ায় স্তব্ধ। বসন্তের রং, লাল শাড়ি, ফুলের স্বপ্নীল দৃশ্য—সব মিলিয়ে আজ রক্তের লাল রঙে মিশে গেল। কিছুক্ষণ আগে যাকে জীবনের সমস্ত আনন্দ মনে করেছিল, সে চোখের সামনে অচেনা বাস্তবতায় রূপান্তরিত হলো। বসন্তের হাওয়া এখনো বইছে কিন্তু দীপিকার মন হারিয়ে গেছে। বুঝতে পারলো—কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে মধুর মুহূর্তই সবচেয়ে ভয়ানক বাস্তবতার সাথে মিলিত হয়।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow