প্রয়োজন ট্রমা কাটিয়ে ওঠার দীর্ঘমেয়াদি আয়োজন
‘জানেন আংকেল, মাকিন মারা যাওয়ায় আমার খুব একা লাগে। স্কুলে আসতে মোটেও ইচ্ছে করে না। বাধ্য হয়ে আসি। খেলতে গেলে ওর কথা মনে পড়ে, ক্লাসে গেলেও ওকে খুঁজি। প্রথমদিকে অন্য বন্ধুদের মাকিন বলেও ডেকে ফেলতাম। কেমন যেন হারিয়ে গেছে ও।’ রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সূর্য সময় বিশ্বাস তার হারানো সহপাঠী মুসাব্বির মাকিনকে নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন জাগো নিউজের প্রতিবেদকের সঙ্গে। তার আক্ষেপ, ‘আমি ক্লাস এইটে, কিন্তু মাকিনের লাইফ ক্লাস সেভেনে থেমে গেছে। আমরা গল্প করতাম দুজনেই সায়েন্স নেবো। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বো, অনেক কিছু বানাবো। কিন্তু তা হয়নি।’ শুধু সূর্য নয়, স্বজন-সহপাঠী হারানোর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরাই। তাদের মানসিক ট্রমা দূর করতে স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি কিছুই করা হয়নি। রয়ে গেছে এখনো সেই ক্ষত। কেউ শরীরে, কেউ পরিবারে বা কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। আরও পড়ুন মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: ক্ষতিপূরণের পথ কতদূর? ২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরার মাইলস্টোন স্
‘জানেন আংকেল, মাকিন মারা যাওয়ায় আমার খুব একা লাগে। স্কুলে আসতে মোটেও ইচ্ছে করে না। বাধ্য হয়ে আসি। খেলতে গেলে ওর কথা মনে পড়ে, ক্লাসে গেলেও ওকে খুঁজি। প্রথমদিকে অন্য বন্ধুদের মাকিন বলেও ডেকে ফেলতাম। কেমন যেন হারিয়ে গেছে ও।’
রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সূর্য সময় বিশ্বাস তার হারানো সহপাঠী মুসাব্বির মাকিনকে নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন জাগো নিউজের প্রতিবেদকের সঙ্গে। তার আক্ষেপ, ‘আমি ক্লাস এইটে, কিন্তু মাকিনের লাইফ ক্লাস সেভেনে থেমে গেছে। আমরা গল্প করতাম দুজনেই সায়েন্স নেবো। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বো, অনেক কিছু বানাবো। কিন্তু তা হয়নি।’
শুধু সূর্য নয়, স্বজন-সহপাঠী হারানোর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরাই। তাদের মানসিক ট্রমা দূর করতে স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি কিছুই করা হয়নি। রয়ে গেছে এখনো সেই ক্ষত। কেউ শরীরে, কেউ পরিবারে বা কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী একাডেমিক ভবনে বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় ৩৫ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিন জন শিক্ষক, তিন জন অভিভাবক ও বিমানের একজন পাইলট। আহত ১৭৫ জনের মধ্যে শিক্ষার্থী ৬৩ জন। তারা দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ক্লাসে ফিরলেও অধিকাংশই এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
এক বছরেও কেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরেনি শিক্ষার্থীরা?
এক বছরেও তারা কেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি এবং কী কী করা প্রয়োজন—এ নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন বিশিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ইনোভেশন ফর ওয়েলবিং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মুনিরা রহমান। তিনি ছুটি রিসোর্ট ও রোটারি ক্লাব বনানীর আয়োজনে দুই পর্বে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ক্ষত সারানোর উদ্যোগে শামিল ছিলেন। গত বছরের অক্টোবরে পূর্বাচল ছুটি রিসোর্টে ৪০ জন ছাত্র এবং চলতি মাসের ১৬ তারিখে পুবাইল ছুটি রিসোর্টে ৬৩ জন ছাত্রীকে নিয়ে দিনব্যাপী নানা আয়োজন হয়। তাদের মানসিক উন্নতির নানা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীরা এই ট্রমা কতটুকু কাটিয়ে উঠলো এবং কেমন মনে হলো?—এমন প্রশ্নের জবাবে মুনিরা রহমান বলেন, গতবার এই কার্যক্রমে ছাত্ররা অংশ নিয়েছিল এবং এবার ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীরা অংশ নেয়। গতবারের তুলনায় এবারের গ্রুপটি কিছুটা কাটিয়ে উঠলেও কিছু শিক্ষার্থীর জন্য বিশেষ মনোচিকিৎসার সহায়তা জরুরি।
আক্রান্ত স্থানটিকে আমরা একটা চমৎকার উদ্যান করার উদ্যোগ নিয়েছি। পোড়া ভবনটি সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে- মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুল
তিনি বলেন, সেখানে আমরা আসলে তাদের মধ্যে যে শক্তি, সাহস, তাদের যে দক্ষতা আছে, তাদের যে স্বপ্ন, যে অর্জনগুলো—সেগুলোর ওপর ফোকাস করেছিলাম। সেখানে ‘ট্রি অব লাইফ’ বলে একটা অ্যাক্টিভিটি করানো হয়। এই কার্যক্রমে শেকড়গুলো যেমন আমাদের শক্তির উৎস, তেমনি তারা খুব সুন্দর করে পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং এমনকি স্কুলকেও তাদের শক্তির উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তিনি আরও জানান, দক্ষতার ক্ষেত্রে কেউ ছবি আঁকা, কেউ খেলাধুলায় ভালো—এমন বিষয়গুলো শিক্ষার্থীরা তুলে ধরেছে।
স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, একজন বলেছিল যে ঘটনার আগে সে পাইলট হতে চাইত, কিন্তু ঘটনার পর এতটাই ভয় পেয়েছিল যে সে আর এটা ভাবতই না। কিন্তু এই এক্সারসাইজের মধ্য দিয়ে সে আবার ভাবছে—‘কেন আমি পাইলট হতে পারব না? আমি অনেক সচেতন একজন পাইলট হব।’ আরেকজন চাঁদে যাওয়ার কথা বলেছে; অর্থাৎ তাদের স্বপ্নগুলো অনেক বড়। সেগুলো যখন তারা করলো, তাদের চোখে-মুখে যে আনন্দ এবং জীবনকে উপভোগ করার মতো খুশি আমরা দেখতে পেলাম, সেটি গতবারের চেয়ে আলাদা ছিল। কারণ প্রথম দিকে তারা সবসময় ঘুরেফিরে ওই ট্রমার ভেতরে চলে যেত।
ট্রমার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও চ্যালেঞ্জসমূহ
এখনো পুরোপুরি ট্রমা কাটেনি উল্লেখ করে এই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, এখনো অনেকে ভয় পায়। গাছ লাগানোর সময় তারা নিহতদের উদ্দেশ্যে ৩৫টি গাছ লাগিয়েছে এবং বন্ধুকে স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েছে। এটি আসলে একটি দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও ট্রমা, যা কাটিয়ে ওঠার জন্যও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন। প্রথম দিকে শিক্ষার্থীরা যে সাপোর্ট পেয়েছিল, পরবর্তীতে সেই ধারাবাহিকতা আর বজায় থাকেনি। প্রত্যেকের পৃথক মূল্যায়ন (ইন্ডিভিজুয়াল অ্যাসেসমেন্ট) করে যে সাপোর্ট দরকার ছিল, তা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ট্রমা-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারগুলোর ভূমিকার কথা তুলে ধরে মুনিরা রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশও খেয়াল করা দরকার। সেখানে যদি এমনভাবে পরিবর্তন আনা হতো যা তাদের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করত, তবে ভালো হতো। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে, অনেক পরিবার ও স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে—তারা চাচ্ছে শিক্ষার্থীরা যেন দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু ওরা সেই চাপ কাটিয়ে উঠতে পারছে না।
তিনি জানান, এই ট্রমা নানা আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে; যেমন অনেকে রাগ বা কান্না নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এগুলো কোনো আচরণগত সমস্যা নয়, বরং ট্রমা থেকে আসছে। যারা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তারা একভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। এই এক বছরে এসে একটি অ্যাসেসমেন্ট করা দরকার যে তাদের কারো ‘পিটিএসডি’ - পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার) ডেভেলপ করেছে কি না।
পিটিএসডির লক্ষণ ও করণীয়
পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার বোঝার জন্য কয়েকটি প্রধান লক্ষণ দেখার ওপর জোর দিয়ে মুনিরা রহমান বলেন, বারবার ঘটনার ফ্ল্যাশব্যাক হওয়া এবং সারাক্ষণ অতিরিক্ত সতর্ক (অ্যালার্ট) থাকা। প্লেনের শব্দ বা অন্য যে কোনো শব্দেও চমকে ওঠা। ঘুম ও খাওয়ার সমস্যা দেখা দেওয়া। অনেক সময় পরিস্থিতি থেকে নিজেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা এবং অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে যাওয়া। এগুলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করে কারো মধ্যে পিটিএসডি দেখা দিলে মনোচিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীদের মাধ্যমে যৌথভাবে এবং সামাজিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের নিয়ে যেতে হবে।
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পরিবেশের যৌথ নিরাময়
শুধু শিক্ষার্থীর সঙ্গে কাজ করলেই হবে না উল্লেখ করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, শিক্ষার্থীরা পরিবারে ফিরে গেলেও পরিবারের লোকেরা ট্রমা বুঝতে পারে না বা এ বিষয়ে অসচেতন থাকে। ফলে পরিবারের লোক না জানলে যে রোগীর সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে, তবে কাজ সফল হবে না। তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং পরিবার—উভয় দিকেই খেয়াল রাখতে হবে।
ট্রমা পুনর্বাসন কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ছুটি রিসোর্টে অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন বিনোদনমূলক কার্যক্রম
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, এমন একজন শিক্ষকও আছেন যার দুটি হাত পুড়ে গেছে এবং তিনিও কঠিন চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন ও বারবার ওই স্মৃতি মনে করে কষ্ট পাচ্ছেন। প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্তরা ছাড়াও যারা ঘটনাটি দেখেছে বা শুনেছে (এমনকি সেদিন স্কুলেও যায়নি, কিন্তু ধ্বংসস্তূপ দেখেছে বা বন্ধুদের আর্তনাদ শুনেছে), তারাও ট্রমার শিকার হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং পরিবার—সবাইকে এই মূল্যায়নের আওতায় এনে চিকিৎসা দিতে হবে। পাশাপাশি যে স্থাপনাগুলো দেখলে ওই দুর্ঘটনার স্মৃতি মনে পড়ে, সেগুলোতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সহমত পোষণ করেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুল। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আক্রান্ত স্থানটিকে আমরা একটা চমৎকার উদ্যান করার উদ্যোগ নিয়েছি। পোড়া ভবনটি সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
এসইউজে/এমআইএইচএস/
What's Your Reaction?



