বয়সে তাদের ব্যবধান অনেক। দুজনই আইন পেশার। বাড়িও কাছাকাছি, কিশোরগঞ্জ আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তবে, একই সময়ে সাবজেক্ট হয়ে গেলেন বিনা সিডিউলে। দেশজুড়ে যখন আলোচনায় নির্বাচন, সংস্কার, বিচার। তখন অনেকটা কোনো লক্ষ্য ছাড়াই উপলক্ষ্য হয়ে গেলেন বিএনপির দুই কিসিমের দুই তারকা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ও ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ভিন্ন ভিন্ন কারণে দুজনেই আক্রমণের শিকার। একজন রুমিন কিছুটা শারীরিকভাবে, আরেকজন ফজলু সাংগঠনিকভাবে। তবে, জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তারা দুজনই একবার করে সংসদ সদস্য ছিলেন। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানকে ২৪ ঘন্টা সময় বেঁধে দিয়ে বিএনপি শোকজ করেছে, আর রুমিন ফারহানা নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে গিয়ে শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
বিএনপির চেয়ারপারর্সনের রাজনৈতিক উপদেষ্টা, ফজলুর রহমানের ছবিতে জুতা পেটা করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ছাত্রদলের ভিপি ক্যান্ডিডেট প্রতিরোধ না করলেও চুপ থাকতে পারতেন, কিন্তু উনি দলীয় শোকজ নিয়ে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার 'স্পর্ধা সহ্য করা হবে না' বলে পোস্ট দিচ্ছেন। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান একজন স্পষ্টবাদী এবং সৎ মানুষ। যা বোঝেন তাই বলেন। এ দোষে বা স্বভাবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, কাদের সিদ্দিকীর কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ বা ফেরদৌস আহমেদ কোরেশির পিডিপি কোনো দলেই টেকেন না বেশি দিন। তিনি অনেক বলেন তাই মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে এমন কিছু বলেন যেটা আরো কৌশলে বললে কোনো সমস্যাই হয় না । কিন্তু তিনি আসলে সেইভাবে বলতে পারেন না ।
ফজলুর রহমান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা । মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার আবেগ পর্বত সমান । এই আদর্শের ব্যত্যয় ঘটলে তিনি রাখ ঢাক না করেই সমালোচনায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। কী বলেন, ঠিকঠিকানা থাকে না। কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রণে তার কথায় মানুষ বাড়তি তৃপ্তি পায়। তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি আর বাহালুল মজনুন চুন্নু সেক্রেটারি ছিলেন। ফজলুর রহমানকে বিএনপি শোকজ করেছে। তাতে অনেকেই কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু এই বীর মুক্তিযোদ্ধা কেন আওয়ামী লীগ ছাড়তে বাধ্য হলেন? ভালো মানুষটাকে বিএনপি ওউন করছে না- এটা বলে এখন যারা তার জন্য কান্নাকাটি করছেন তখন তারা এতোটা রাজনীতি সচেতন হলে হয়তো তার মতো একজন সাহসী মানুষকে আওয়ামী লীগের হারাতে হতো না। অথবা তিনিই আওয়ামী লীগকে হারাতেন না। ফজলুর রহমানকে শোকজ করার চিঠি তার হাতে যাবার আগে সামাজিক মাধ্যমে কেন এলো এই প্রশ্ন অনেকের মনে উঠেছে।
ফজলুর রহমানকে বিএনপি শোকজ করেছে। তাতে অনেকেই কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু এই বীর মুক্তিযোদ্ধা কেন আওয়ামী লীগ ছাড়তে বাধ্য হলেন? ভালো মানুষটাকে বিএনপি ওউন করছে না- এটা বলে এখন যারা তার জন্য কান্নাকাটি করছেন তখন তারা এতোটা রাজনীতি সচেতন হলে হয়তো তার মতো একজন সাহসী মানুষকে আওয়ামী লীগের হারাতে হতো না। অথবা তিনিই আওয়ামী লীগকে হারাতেন না।
বিএনপির সাবেক এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা তার প্রাপ্য সুবিধার গ্রাউন্ড থেকে প্লটের জন্য আবেদন করেছিলেন কিন্তু তখন সেটার নিষ্পত্তি হওয়ার আগে কীভাবে মিডিয়ায় চলে এসেছিল, সেটাও প্রশ্ন। দুটো ঘটনার পেছনে কুরাজনীতি আছে। পদে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ফজলুর রহমান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে ক্রমাগত ‘কুরুচিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য’ দেওয়ার অভিযোগে বিএনপি থেকে ফজলুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ‘উদ্ভট ও শৃঙ্খলা পরিপন্থি’ বক্তব্যের অভিযোগে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ফজলুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে কেন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানাতে তাঁকে ২৪ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে।
ফজলুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে টেলিভিশন টক শো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন। কারণ দর্শানোর নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আপনি জুলাই-আগস্ট ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে ক্রমাগত কুরুচিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে আসছেন এবং আত্মদানকারী শহিদদের নিয়ে যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা সম্পূর্ণরূপে দলীয় আদর্শ ও গণ–অভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থি। মহিমান্বিত এই গণ–অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন নিয়ে আপনার বক্তব্য জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আপনার বক্তব্য দলের সুনাম ক্ষুণ্ন করার সুপরিকল্পিত চক্রান্তের প্রয়াস বলে অনেকেই মনে করে। এমনকি আপনি জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতেও আঘাত দিয়ে কথা বলছেন।’ এতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘জুলাই-আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানে বিএনপির সাড়ে চার শর বেশি নেতা–কর্মীসহ ছাত্র-জনতার প্রায় দেড় হাজারের অধিক মানুষ শহিদ হয়েছেন এবং ৩০ হাজারের অধিক মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য গণ–অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার এ ধরনের বীরোচিত ভূমিকাকে আপনি প্রতিনিয়ত অপমান ও অমর্যাদা করছেন।’
একদিকে তার বিরুদ্ধে দলীয় শোকজ। আরেকদিকে তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় তাঁর বাসার সামনে অবস্থান নিয়ে কিছু মানুষের বিক্ষোভ। রবিবার মধ্যরাত থেকে ‘বিপ্লবী ছাত্র জনতা’ ব্যানারে কনকর্ড টাওয়ারের সামনে অবস্থান নিয়ে তাঁরা বিক্ষোভে নামে। ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’, ‘জুলাই রাজবন্দী’সহ কয়েকটি সংগঠনের নেতা-কর্মীরা এ অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। পাশে অবস্থান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার ঘটনার ফের আরেকদিকে। এখনো শোকজ খাননি। পদে সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হলেও দলে অবস্থা আগের মতো নেই। কিন্তু, টকশোতে নিজের স্টাইলে কথা বলে নিজের একটা ভিন্ন অবস্থান তিনি তৈরি করেছেন। নির্বাচন কমিশনে নির্বাচনী এলাকার সীমানা বিষয়ক শুনানিতে গিয়ে ঘটনাচক্রে নতুন করে আলোচনায় তিনি। গত ১৫ বছর বিএনপির যে নেতাকর্মীদের জন্য লড়াই করলাম, তারাই এখন আমাকে ধাক্কা দেয়’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। এরপরই তার মুখ ফসকে বের হয়, ‘ঠিক আছে, ধাক্কার বদলে তো ধাক্কা আসবেই’।
রবিবার ২৪ আগস্ট আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে রুমিন এ কথা বলেন। সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণে ইসিতে এদিন দাবি-আপত্তির শুনানিতে অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে যিনি আছেন তিনি পিটিয়ে পিটিয়ে মানুষের স্বীকারোক্তি নিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনে আমরা প্রেজেন্ট (উপস্থাপন) করেছি। জনসংখ্যার বিবেচনায় নির্বাচন কমিশন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা সঠিক সিদ্ধান্ত। আমার বিষয়গুলো আমি নিজে প্রেজেন্ট করব, তাই করেছি।
রুমিনের ভাষায়, ‘আশা করেছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে যিনি আছেন, তিনি গুন্ডা-পান্ডা নিয়ে ইসিতে ঢুকবেন না। কিন্তু তারা গুন্ডা নিয়ে ইসিতে এসেছেন। এই আসনের প্রার্থী তার গুন্ডা-পান্ডা সদলবল নিয়ে ইসিতে এসে মারামারি করেছেন। এনসিপির কর্মীদের সঙ্গে হাতাহাতি প্রসঙ্গে রুমিন ফারহানা বলেন, উনি যেহেতু পরিচিত মুখ নয়, সুতরাং উনি জামায়াত না এনসিপি আমার জানা নেই। তবে উনার লোকজন প্রথম আমাকে ধাক্কা দিয়েছে। আর আমাকে ধাক্কা দিলে আমার লোকজন তো বসে থাকবে না। এদিকে, রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেছেন এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মোহাম্মদ আতাউল্লাহ। ইসিতে রুমিন ফারহানার নেতৃত্বে এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয় বলে অভিযোগ আতাউল্লাহর।
পুরো ঘটনাই কীসের মধ্যে কী-এর মতো। উল্লেখ্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার ক্যারিয়ারও বর্ণাঢ্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব স্বাধীনতা পুরস্কার বিজয়ী ভাষা সৈনিক অলি আহাদ তার বাবা। দাদা আবদুল ওহাব ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার ছিলেন। রুমিন হলিক্রস উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় এর অধীনে আইনে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং যুক্তরাজ্যের লিংকনস্ ইন থেকে ব্যারিস্টার অ্যাট ল' ডিগ্রি অর্জন করেন। রুমিন পরিবার থেকেই রাজনৈতিক দীক্ষা পান। তার পিতা অলি আহাদ ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের নায়ক। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। গত বছর কয়েকের রাজনীতিতে তারকা খ্যাতি ব্যারিস্টার রুমিনের। ভিন্ন আঙ্গিকে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানও তারকা। এই তারকাদের এমনভাবে চরকায় পড়ে যাওয়া এ সময়ের ভিন্নমাত্রার ঘটনা।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন।
এইচআর/জিকেএস