ফেলে দেওয়া চুইংগামেই ধরা পড়ল সিরিয়াল কিলার-ধর্ষক

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত ছিল দুই নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার রহস্য। তদন্ত থমকে ছিল বছরের পর বছর। অবশেষে একটি ফেলে দেওয়া চুইংগামই খুলে দিল ভয়ংকর সেই হত্যাকাণ্ডের জট।  যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের এভারেট শহরের একটি হলুদ রঙের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন গোয়েন্দা কর্মকর্তা সুস্যান লগোথেটি এবং তার দুই সহকর্মী। সবার গায়ে একই ধরনের টি-শার্ট, হাতে চুইংগাম কোম্পানির প্রচারপত্র। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো তারা কোনো বিপণন প্রতিষ্ঠানের কর্মী। ২০২৪ সালের জানুয়ারির সেই দিনে বাড়ির দরজা খুলেছিলেন ৬৮ বছর বয়সী মিচেল গ্যাফ। পায়জামা পরে থাকা গ্যাফ হাসিমুখে অতিথিদের ঘরে ঢুকতে দেন এবং নতুন নতুন স্বাদের চুইংগাম চেখে দেখতে রাজি হন। গোয়েন্দা কর্মকর্তা লোগোথেত্তি পরে বলেন, গ্যাফ যখন নতুন একটি স্বাদ নেওয়ার আগে আগের চুইংগামটি একটি ছোট পাত্রে ফেললেন, তখন তিনি তার ভেতরের উত্তেজনা লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করছিলেন। কারণ সেই চুইংগামের লালাই ছিল বহু বছরের অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য ভাঙার চাবিকাঠি। গ্যাফ বুঝতেই পারেননি, যাদের তিনি বিপণনকর্মী ভেবেছিলেন, তারা আসলে ছদ্মবেশী গোয়েন্দা। আর সেই চুইংগাম থেকেই পাওয়া ডিএনএ নমুনা তাক

ফেলে দেওয়া চুইংগামেই ধরা পড়ল সিরিয়াল কিলার-ধর্ষক
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত ছিল দুই নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার রহস্য। তদন্ত থমকে ছিল বছরের পর বছর। অবশেষে একটি ফেলে দেওয়া চুইংগামই খুলে দিল ভয়ংকর সেই হত্যাকাণ্ডের জট।  যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের এভারেট শহরের একটি হলুদ রঙের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন গোয়েন্দা কর্মকর্তা সুস্যান লগোথেটি এবং তার দুই সহকর্মী। সবার গায়ে একই ধরনের টি-শার্ট, হাতে চুইংগাম কোম্পানির প্রচারপত্র। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো তারা কোনো বিপণন প্রতিষ্ঠানের কর্মী। ২০২৪ সালের জানুয়ারির সেই দিনে বাড়ির দরজা খুলেছিলেন ৬৮ বছর বয়সী মিচেল গ্যাফ। পায়জামা পরে থাকা গ্যাফ হাসিমুখে অতিথিদের ঘরে ঢুকতে দেন এবং নতুন নতুন স্বাদের চুইংগাম চেখে দেখতে রাজি হন। গোয়েন্দা কর্মকর্তা লোগোথেত্তি পরে বলেন, গ্যাফ যখন নতুন একটি স্বাদ নেওয়ার আগে আগের চুইংগামটি একটি ছোট পাত্রে ফেললেন, তখন তিনি তার ভেতরের উত্তেজনা লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করছিলেন। কারণ সেই চুইংগামের লালাই ছিল বহু বছরের অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য ভাঙার চাবিকাঠি। গ্যাফ বুঝতেই পারেননি, যাদের তিনি বিপণনকর্মী ভেবেছিলেন, তারা আসলে ছদ্মবেশী গোয়েন্দা। আর সেই চুইংগাম থেকেই পাওয়া ডিএনএ নমুনা তাকে ১৯৮৪ সালের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে দেয়। এ বছরের মার্চ মাসে আদালতে জমা দেওয়া সম্ভাব্য কারণ সংক্রান্ত হলফনামায় এই চুইংগাম কৌশলের বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়। পরে গ্যাফ আদালতে স্বীকার করেন, তিনি জুডি উইভারকে হত্যা করেছিলেন। একই সঙ্গে চার বছর আগে সুসান ভেসি-কে হত্যার কথাও স্বীকার করেন। বুধবার (১৩ মে) তার সাজা ঘোষণার কথা রয়েছে এবং তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মুখোমুখি। ১৯৮০ ও ১৯৮৪ সালে ওয়াশিংটনের এই দুই নারীর হত্যাকাণ্ড দীর্ঘদিন একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কহীন ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। দুই মামলাতেই সন্দেহভাজন ছিল, কিন্তু কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়নি। উইভারের হত্যার চার দশক পর ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা চুইংগাম থেকে পাওয়া ডিএনএ তার শরীর থেকে সংগ্রহ করা আলামতের সঙ্গে মিলে যায় বলে নিশ্চিত হন। এরপরই দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সংযোগ স্পষ্ট হয়। তদন্তকারীরা বলছেন, আধুনিক ডিএনএ প্রযুক্তিই এই রহস্য ভাঙার মূল হাতিয়ার। এই সাফল্য শুধু খুনিকে শনাক্ত করেনি, বরং বহু বছর ধরে সন্দেহ ও মানসিক যন্ত্রণায় থাকা পরিবারগুলোকেও স্বস্তি দিয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাফের হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া এক নারীও কিছুটা মানসিক শান্তি পেয়েছেন। লোগোথেত্তির ভাষায়, এই মামলাগুলোর সমাধানের জন্য শুধু বিজ্ঞানের এগিয়ে আসাটাই বাকি ছিল। ১৯৮০ সালের জুলাইয়ে নিহত হন ২১ বছর বয়সী সুসান ভেসি। তিনি ছিলেন দুই সন্তানের মা। তার দুই শিশুর বয়স তখন দুই বছরেরও কম। গ্যাফ আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, তিনি এলোমেলোভাবে বাড়ির দরজা পরীক্ষা করছিলেন। ভেসির বাড়ির দরজা খোলা পেয়ে ভেতরে ঢোকেন। এরপর তাকে বেঁধে মারধর, ধর্ষণ এবং শ্বাসরোধে হত্যা করেন। চার বছর পর তিনি হামলা চালান ৪২ বছর বয়সী আরেক মা জুডি উইভারের ওপর। নিজের অপরাধের প্রমাণ নষ্ট করতে তিনি শোবার ঘরে আগুনও লাগিয়ে দেন। আদালতের নথিতে গ্যাফ বলেন, ঘর থেকে বের হওয়ার আগে আমি তার গলায় ক্যাবল পেঁচিয়ে দিই এবং বিছানার চাদরে আগুন লাগাই, যাতে প্রমাণ চাপা পড়ে যায়। আমার এই অপকর্মের কারণেই তিনি মারা যান। তিনি আরও জানান, দুই নারীর কাউকেই আগে থেকে চিনতেন না। যদিও গ্যাফের আইনজীবী এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের সময় ডিএনএ বিশ্লেষণ তখনও কার্যকর ফরেনসিক প্রযুক্তি হয়ে ওঠেনি। তবে উইভারের মামলায় পুলিশ দূরদর্শিতা দেখিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংরক্ষণ করেছিল। লোগোথেত্তি বলেন, তার হাতে আসা মামলার পুরোনো নথিতে উইভারের মৃত্যুকে ঘিরে অর্থপাচার ও মাদক সংশ্লিষ্ট নানা উদ্ভট তত্ত্ব ছিল। এমনকি তার প্রেমিককেও দীর্ঘদিন প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে সেই ব্যক্তি মারা যান। ২০২০ সালে ডিএনএ প্রযুক্তির উন্নতির কারণে আবারও মামলাটি নতুনভাবে খতিয়ে দেখা শুরু হয়। ফরেনসিক বিজ্ঞানী লিসা কলিন্স জানান, নতুন সফটওয়্যার ও জেনেটিক বংশতাত্ত্বিক প্রযুক্তির উন্নয়নই পুরোনো মামলাগুলোর সমাধানে বড় ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে অল্প পরিমাণ ডিএনএ থেকেও অপরাধীর পরিচয় বের করা সম্ভব হচ্ছে। উইভারের শরীরে বাঁধা দড়িতে তার নিজের ডিএনএ ও প্রেমিকের ডিএনএ ছাড়াও অজানা আরেক ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়া যায়। ফরেনসিক বিজ্ঞানী ম্যারি নোলটন বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে বাকি দুইজনের ডিএনএ আলাদা করে রহস্যময় তৃতীয় ব্যক্তির ডিএনএ শনাক্ত করেন। পরে সেই নমুনা জাতীয় ডিএনএ ডাটাবেইসে পাঠানো হলে গ্যাফের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। ১৯৮৪ সালে দুই কিশোরী বোনকে ধর্ষণের দায়ে দণ্ডিত হওয়ায় গ্যাফের ডিএনএ আগে থেকেই ডাটাবেইসে সংরক্ষিত ছিল। নোলটন বলেন, আমি ভাবিনি কোনো ফল পাওয়া যাবে। কারণ আশির দশকে ডিএনএ সংরক্ষণে এত সতর্কতা ছিল না। মনে হয়েছিল হয়তো কোনো চিকিৎসাকর্মীর নমুনা হবে। কিন্তু মিল পাওয়ার পর সেটা ছিল ভীষণ রোমাঞ্চকর। ডিএনএ মিল পাওয়ার পর তদন্তকারীদের আরেকটি নমুনা দরকার ছিল নিশ্চিত হওয়ার জন্য। লোগোথেত্তি বলেন, সাধারণত সন্দেহভাজনের ফেলে দেওয়া সিগারেট বা পানীয় সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু গ্যাফ খুব কম বাইরে বের হতেন। শুধু কাছের মুদি দোকানে যেতেন। তখনই এক কর্মকর্তা চুইংগামের অভিনব পরিকল্পনার কথা ভাবেন। লোগোথেত্তি বলেন, প্রথমে পরিকল্পনাটা পাগলামি মনে হয়েছিল। এত জটিল ছদ্মবেশী অভিযানের অংশ আগে কখনও হইনি। পরে চুইংগাম থেকে পাওয়া ডিএনএ উইভারের শরীর, গলায় বাঁধা দড়ি, হাতের বন্ধন এবং পোশাকের আলামতের সঙ্গে মিলে যায়। ভেসির হত্যার সঙ্গে গ্যাফকে যুক্ত করতে আরও সময় লাগে। কয়েক মাস পর ভেসির স্বামী কেন পুলিশকে জানান, তার ভাই মারা গেছেন; যিনি একসময় এই মামলার সন্দেহভাজন ছিলেন। লোগোথেত্তি তখন প্রথমবারের মতো ভেসির মামলার কথা শোনেন। তিনি কেনের সঙ্গে কথা বলার সময় দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে বিস্ময়কর মিল খুঁজে পান। তার ভাষায়, আমার মাথায় শুধু জুডি উইভারের কথাই ঘুরছিল। পরে ভেসির মরদেহ থেকে উদ্ধার করা সাদা দড়ির টুকরো পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেখানকার ডিএনএও গ্যাফের। মামলার প্রসিকিউটর ক্রেইগ বলেন, ফরেনসিক বিজ্ঞানীরা এখন যা করতে পারছেন, ২০ বছর আগে তা কল্পনাও করা যেত না। এর আগে ১৯৭৯ সালে গ্যাফ ২৯ বছর বয়সী নারী জ্যাকালিন ও’ব্রায়েন-এর ওপর হামলা চালান এবং ধর্ষণের চেষ্টা করেন। সেই ঘটনায় তিনি মাত্র এক বছরের কর্মমুক্তি ও পাঁচ বছরের পর্যবেক্ষণমূলক সাজা পান। ও’ব্রায়েন বলেন, গ্যাফ তাকে আক্রমণ করার দিন থেকে আজও তিনি আতঙ্কে থাকেন। তখন তিনি ওয়াশিংটন স্টেট পেট্রোল বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। বাড়ির গ্যারেজে ঘাস কাটার যন্ত্র রাখার সময় গ্যাফ অস্ত্র তাক করে তাকে হাঁটু গেড়ে বসতে বলেন। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন এটি সহকর্মীদের কোনো মজা। কিন্তু গ্যাফ তাকে বন্দুক দিয়ে আঘাত করলে ভয়াবহ বাস্তবতা বুঝতে পারেন। গ্যাফ যখন তার হাত বাঁধার চেষ্টা করছিলেন, তখন বাবার শেখানো প্রতিরোধের কথা মনে পড়ে ও’ব্রায়েনের। তিনি ঝাঁপিয়ে পড়ে লড়াই শুরু করেন। একপর্যায়ে গ্যাফ বুটের ভেতর থেকে ছুরি বের করেন এবং তাকে হত্যার হুমকি দেন। ও’ব্রায়েন বলেন, আমি ভেবেছিলাম সেদিনই মারা যাব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাণ বাঁচিয়ে পালাতে পেরেছিলাম। পরে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে গ্যাফ স্বীকার করেন, তিনি তাকে ধর্ষণ করতে চেয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞরা তাকে যৌন নির্যাতনে বিকৃত আনন্দ পাওয়া ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। আজও ও’ব্রায়েন ঘরে টেলিভিশন বা রেডিও চালাতে পারেন না। কারণ তিনি সবসময় আশপাশের শব্দ শুনে সতর্ক থাকতে চান। তার ভাষায়, আজও আফসোস হয়, যেদিন সে আমাকে আক্রমণ করেছিল সেদিন যদি তাকে থামাতে পারতাম। লোগোথেত্তি বলেন, ভেসির স্বামী কেনের সঙ্গে তিনি প্রতি সপ্তাহে কথা বলতেন। কখনো মামলার বিষয়ে, কখনো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে। তার মতে, গ্যাফের অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় পরিবারগুলো অন্তত সত্যটা জানতে পেরেছে। তিনি বলেন, এটা পরিবারের ভেতরে ছড়িয়ে পড়া ক্যানসারের মতো ছিল। মিচেল গ্যাফ শুধু এই নারীদের নয়, তাদের পুরো পরিবারকে ভুক্তভোগী বানিয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow