বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসা ইসলামী পুনর্জাগরণের আলোকবর্তিকা
ইসলামী সভ্যতার সোনালি অধ্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তার এবং সুন্নি মতাদর্শের সুরক্ষায় সেলজুক উজির খাজা নিজামুল মুলক প্রবর্তিত বাগদাদের ‘মাদ্রাসা নিজামিয়া’ এক যুগান্তকারী মাইলফলক। ৪৫ হিজরিতে প্রতিষ্ঠিত এই সুসংগঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি কেবল তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংকটই সমাধান করেনি, বরং শত শত বছর ধরে প্রাচ্য থেকে প্রতীচ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে বিশ্বসভ্যতাকে এক নতুন রূপ দিয়েছিল। ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায় একক প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসার সূচনা নিজামিয়া প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই হয়েছিল। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষভাগ কিংবা তৃতীয় শতাব্দীর শুরুর দিকে বুখারার প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম আবু হাফস আল বুখারির হাত ধরে প্রথম মাদ্রাসা ব্যবস্থার ভিত রচিত হয়। পরে নিশাপুর, দামেস্ক এবং বাগদাদের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল, যেগুলো মূলত ‘দারুল ইলম’ বা ‘খিজানাতুল হিকমাহ’ বলা হতো। তবে পঞ্চম হিজরির প্রথমার্ধে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে এক তীব্র সংকট দেখা দেয়। একদিকে মিশরের ফাতিমীয় খিলাফত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্
ইসলামী সভ্যতার সোনালি অধ্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তার এবং সুন্নি মতাদর্শের সুরক্ষায় সেলজুক উজির খাজা নিজামুল মুলক প্রবর্তিত বাগদাদের ‘মাদ্রাসা নিজামিয়া’ এক যুগান্তকারী মাইলফলক। ৪৫ হিজরিতে প্রতিষ্ঠিত এই সুসংগঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি কেবল তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংকটই সমাধান করেনি, বরং শত শত বছর ধরে প্রাচ্য থেকে প্রতীচ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে বিশ্বসভ্যতাকে এক নতুন রূপ দিয়েছিল।
ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায় একক প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসার সূচনা নিজামিয়া প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই হয়েছিল। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষভাগ কিংবা তৃতীয় শতাব্দীর শুরুর দিকে বুখারার প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম আবু হাফস আল বুখারির হাত ধরে প্রথম মাদ্রাসা ব্যবস্থার ভিত রচিত হয়। পরে নিশাপুর, দামেস্ক এবং বাগদাদের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল, যেগুলো মূলত ‘দারুল ইলম’ বা ‘খিজানাতুল হিকমাহ’ বলা হতো।
তবে পঞ্চম হিজরির প্রথমার্ধে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে এক তীব্র সংকট দেখা দেয়। একদিকে মিশরের ফাতিমীয় খিলাফত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র করে তাদের শিয়া ইসমাইলি ও বাতেনি মতবাদ প্রচারের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে; অন্যদিকে পারস্য ও ইরাক অঞ্চলে শিয়া বুয়াইহীদের প্রভাবও বেশ জোরাল ছিল। সেলজুক সুলতান আল্প আরসলান সিংহাসনে আরোহণের পর এ মতাদর্শিক আগ্রাসন রুখতে সুদৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এ বাস্তবতায় সেলজুক সাম্রাজ্যের দূরদর্শী উজির হাসান ইবনে আলি ইবনে ইসহাক আল তুসী, যিনি ইতিহাসে ‘নিজামুল মুলক’ নামে খ্যাত, তিনি অনুধাবন করেন যে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অসম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও সুসংহত সুন্নি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ আন্দোলন। এ ঐতিহাসিক তাড়না থেকেই তিনি পুরো মুসলিমজুড়ে একটি আধুনিক ও শৃঙ্খলিত মাদ্রাসা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন।
মাদ্রাসা নিজামিয়া কেবল সাধারণ পঠন-পাঠনের স্থান ছিল না; এটি ছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আবাসিক ও একাডেমিক কেন্দ্র। এখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক বরাদ্দ, উন্নত আবাসন ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পঠনসামগ্রীর সুব্যবস্থা করা হয়েছিল। এ প্রতিষ্ঠানগুলোয় মূলত শাফেয়ী সুন্নি মাযহাবের ফিকহ, হাদিস, তাফসির এবং শরিয়তের বিভিন্ন মৌলিক শাখা গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে পড়ানো হতো।
নিজামিয়া বাগদাদের প্রথম শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন প্রখ্যাত আলেম আবু ইসহাক আল শিরাজী। ঐতিহাসিক সুবকীর বর্ণনা অনুযায়ী, সে সময় খোরাসান বা এর আশপাশের এমন কোনো শহর কিংবা গ্রাম পাওয়া যেত না, যেখানে নিজামিয়া থেকে শিক্ষালাভ করা কোনো শিক্ষার্থী কাজি, মুফতি বা খতিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন না। বিচার, হিসাব ও ফতোয়া বোর্ডের মতো রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সংবেদনশীল পদগুলোয় এ মাদ্রাসার দক্ষ স্নাতকরাই নেতৃত্ব দিতেন।
নিজামিয়া মাদ্রাসাগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল রত্ন ছিলেন হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রহ.)। তিনি শিয়া ইসমাইলি ও বাতেনি মতবাদের চরম বিভ্রান্তিগুলোকে বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির মাধ্যমে খণ্ডন করে বেশ কিছু বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। বিশেষ করে খলিফা আল মুস্তাজহিরের অনুরোধে তার রচিত ‘ফাদাইহ আল বাতেনিয়া’ গ্রন্থটি ভ্রান্ত মতবাদগুলোর মূলে কুঠারঘাত করে। এই প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ফলেই ধীরে ধীরে মুসলিম বিশ্বে শিয়া মতাদর্শের রাজনৈতিক ও আদর্শিক আগ্রাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সুন্নাহর সঠিক চর্চা পুনরুজ্জীবিত হয়।
মাদ্রাসা নিজামিয়া মুসলিম জাহানের ইতিহাসে যে গভীর রেখাপাত করেছিল, তার প্রভাব ছিল বহুমুখী। সুদীর্ঘ চার শতাব্দী ধরে চালু থাকা এ প্রতিষ্ঠানগুলো মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোকে অত্যন্ত শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিল। নিজামিয়ার অনুকরণে পরবর্তী সময়ে গোটা মুসলিম বিশ্বে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার এক সুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যা বর্তমানের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থারও পূর্বসূরি হিসেবে কাজ করেছে। নিজামিয়া মাদ্রাসার মাধ্যমেই মূলত পরবর্তী যুগের মহান ইসলামী বীর যেমন—নুরুদ্দিন জেনকি এবং সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর জন্য একনিষ্ঠ ও আদর্শবান এক প্রজন্ম তৈরি হয়েছিল, যারা পরবর্তী সময়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হন। মোটকথা, খাজা নিজামুল মুলকের হাতে গড়া ‘মাদ্রাসা নিজামিয়া’ নিছক কয়েকটি ইমারত বা সাধারণ শিক্ষাকেন্দ্র ছিল না; এটি ছিল ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান, আদর্শিক সুরক্ষা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের এক দীপ্তিময় আলোকবর্তিকা, যা অন্ধকার যুগ পেরিয়ে গোটা মুসলিম বিশ্বকে নতুন এক সভ্যতার আলোয় আলোকিত করেছিল।
লেখক: মাদ্রাসা শিক্ষক
What's Your Reaction?