বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ (১ সেপ্টেম্বর)। দীর্ঘ দেড় যুগ পর অনুকূল পরিবেশে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে দলটি। বিগত ফ্যাসিবাদ আমলের মতো নেই হামলা-মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয়। দলটির দীর্ঘ পথচলা যেমন ইতিহাসের গর্ব ও বড় অর্জন, তেমনি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে টিকে থাকাটাও চ্যালেঞ্জ।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির সামনে এখন ক্ষমতায় ফেরার হাতছানি। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া স্থায়ী মুক্তি পেয়েছেন। লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন। তার বক্তব্য প্রচারেও নেই বিধিনিষেধ। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মিথ্যা মামলা থেকে রেহাই পাচ্ছেন, নির্বিঘ্নে কর্মসূচি পালন করছেন। সবমিলিয়ে সারা দেশে নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙ্গাভাব বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপি কখনো ক্ষমতায় থেকেছে, কখনো আন্দোলনে। তবে গত দেড় যুগ রাজপথেই কেটেছে দলটির নেতাকর্মীদের। তারা ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের দাবিতে আন্দোলনে অবিচল ছিলেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ রাজনীতির বাইরে চলে যাওয়ায় বিএনপির সামনে সুযোগ এসেছে নিজেদের নতুন করে জনগণের সামনে উপস্থাপনের। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানোত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির সামনে বেশকিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য ধরে রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একটি নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচন আদায় করাটাই মুখ্য চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দলটিকে দ্বিধায় ফেলেছে। তরুণ ভোটারদের আস্থায় আনা এবং ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণা ও কার্যকর করা অন্যতম চ্যালেঞ্জ। চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া বিএনপি এমন পরিস্থিতিতে জনগণের সামনে নতুন কী তুলে ধরতে পারে, সেটিই মূল পরীক্ষা। বিষয়টি অনুধাবন করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন সময়ে বক্তব্যে নেতাকর্মীদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচন যতটা সহজ হবে ভাবছেন, ততটা সহজ নয়।’ এমন পরিস্থিতিতে আজ ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে দলটি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট-পরবর্তী নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। পরে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁয় এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনাবাহিনীর বিপথগামী একদল সদস্যের হাতে শহীদ হওয়ার পর বলা হয়েছিল, জিয়াউর রহমানের অবর্তমানে বিএনপি টিকবে না। সেই ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণ করে বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ়চেতা, আপসহীন নেতৃত্বে এক দশকের মাথায় ১৯৯১ সালে বিপুল সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যায় বিএনপি। বলা হচ্ছে, এখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি আগের চেয়েও সুসংগঠিত।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল রোববার কালবেলাকে বলেন, বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা খুবই শক্তিশালী, যা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যোগ্য নেতৃত্বে আরও দৃঢ় হয়েছে। আগামী নির্বাচনে জনগণের বিপুল সমর্থনে বিএনপি ক্ষমতায় যাবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন তিনি।
বিএনপির গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান বলেন, বিএনপি হচ্ছে জনগণের দল। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন সুসংগঠিত এবং অনেক শক্তিশালী। ১৯৭৫ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আন্দোলন-সংগ্রামের বিবেচনায় বাংলাদেশে তারেক রহমান ও বিএনপি অনিবার্য। বিএনপি আবারও জনগণের ভোটে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবে ইনশাআল্লাহ।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সমাজকল্যাণ বিষয়ক সহসম্পাদক কাজী আবুল বাশার বলেন, তারেক রহমান দলের ইস্পাত কঠিন ঐক্য ধরে রেখে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার মতোই আগামী দিনে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌমত্ব আরও সুদৃঢ় হবে এবং একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন বলেন, বিএনপি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত জনগণের দল। বিএনপিকে ভাঙতে নানামুখী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু বিএনপি টিকে আছে নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে বিএনপির সামনে অবারিত সুযোগ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে চ্যালেঞ্জও। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো—ভোটারদের আস্থা ফেরানো, বিশেষত নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে আনা; রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করা এবং সহিংসতা ও অস্থিরতা এড়িয়ে সুষ্ঠু ভোট আদায় করা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামসুল আলম সেলিম কালবেলাকে বলেন, দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে থাকা, আন্দোলনে ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং সাংগঠনিক কিছু দুর্বলতা আজ বিএনপিকে ভিন্ন এক বাস্তবতায় দাঁড় করিয়েছে। তবে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ ছিল, যা বর্তমানে আরও সুদৃঢ়। জনগণের একাংশ বিএনপিকে বিকল্প শক্তি মনে করলেও নতুন প্রজন্মের অনেকেই অন্য পথে হাঁটছে। এমন অবস্থায় বিএনপি যদি তরুণদের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসংস্থান পরিকল্পনা, দুর্নীতি দমন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইশতেহার দিতে পারে, তাহলে তাদের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হতে পারে। না হলে ভোটাররা বিকল্প খুঁজে নেবে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ১৬ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় উদযাপন কমিটি গঠন করেছে বিএনপি। কমিটির আহ্বায়ক হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এবং সদস্য সচিব হয়েছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনে ছয় দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। এর মধ্যে রোববার আলোচনা সভা করেছে।
আজ সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) ভোরে ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, বেলা ১১টায় শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি সারা দেশে সব মহানগর ও জেলায় আলোচনা সভা ও র্যালি হবে।
মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টায় ঢাকায় নয়াপল্টনের কার্যালয়ের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য র্যালি হবে।
বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) দেশের সব উপজেলা ও পৌর এলাকায় আলোচনা সভা ও র্যালি হবে।
বৃহস্পতিবার (৪ সেপ্টেম্বর) সব মহানগর, জেলা-উপজেলায় বৃক্ষরোপণ, মৎস্য অবমুক্তকরণ, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও ক্রীড়া অনুষ্ঠান হবে।
শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় একটি গোলটেবিল আলোচনা হবে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং বিএনপির পক্ষ থেকে পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছে।