বিদেশি ব্যাংকের ঋণ কমলেও শক্তিশালী মূলধন ও তারল্য

বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ ও ব্যাংকিং খাতে বাজার অংশীদারত্ব কমলেও আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে তারা এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। শক্তিশালী মূলধন, উচ্চ তারল্য, কম খেলাপি ঋণ এবং স্থিতিশীল মুনাফার কারণে এসব ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থা ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানও অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগ ও বিশেষ সমীক্ষা অ্যান্ড প্রকল্প বিভাগের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম: প্রবণতা এবং পরিচালনাগত পর্যবেক্ষণ (জুলাই-ডিসেম্বর, ২০২৫)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে দেশে ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৭০টি শাখা ও ৫টি উপ-শাখার মাধ্যমে কার্যক্রম চালাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, আর্থিক উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের সঙ্গে দেশের সংযোগ স্থাপনে এসব ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। যদিও শাখা, আমানত ও ঋণের দিক থেকে দেশীয় ব্যাংকের তুলনায় তাদের উপস্থিতি সীমিত, তবে গুণগত অবদান উল্লেখযোগ

বিদেশি ব্যাংকের ঋণ কমলেও শক্তিশালী মূলধন ও তারল্য

বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ ও ব্যাংকিং খাতে বাজার অংশীদারত্ব কমলেও আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে তারা এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। শক্তিশালী মূলধন, উচ্চ তারল্য, কম খেলাপি ঋণ এবং স্থিতিশীল মুনাফার কারণে এসব ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থা ধরে রেখেছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানও অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগ ও বিশেষ সমীক্ষা অ্যান্ড প্রকল্প বিভাগের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম: প্রবণতা এবং পরিচালনাগত পর্যবেক্ষণ (জুলাই-ডিসেম্বর, ২০২৫)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে দেশে ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৭০টি শাখা ও ৫টি উপ-শাখার মাধ্যমে কার্যক্রম চালাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, আর্থিক উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের সঙ্গে দেশের সংযোগ স্থাপনে এসব ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। যদিও শাখা, আমানত ও ঋণের দিক থেকে দেশীয় ব্যাংকের তুলনায় তাদের উপস্থিতি সীমিত, তবে গুণগত অবদান উল্লেখযোগ্য।

আমানত বেড়েছে, কমেছে বাজার অংশীদারত্ব

২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ৮৭ হাজার ৪৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তবে একই সময়ে দেশের মোট ব্যাংকিং খাতের আমানতে তাদের অংশীদারত্ব ৪.৬ শতাংশ থেকে কমে ৪.২ শতাংশে নেমে এসেছে।

মোট আমানতের মধ্যে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের অংশ সবচেয়ে বেশি, যা ৩৯ শতাংশ। এছাড়া আবাসিক বৈদেশিক মুদ্রা আমানত ১৭ শতাংশ, স্থায়ী আমানত ১৬ শতাংশ, স্পেশাল নোটিশ ডিপোজিট ৫ শতাংশ এবং অন্যান্য আমানত ২৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতের বড় অংশই করপোরেট গ্রাহকভিত্তিক। চলতি ও সঞ্চয়ী আমানতের উচ্চ অংশ তাদের কম খরচে তহবিল সংগ্রহে সহায়তা করছে। ফলে আগ্রাসী ঋণ বিতরণের পরিবর্তে তারা উচ্চ তারল্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এক বছরে ঋণ বিতরণ কমেছে ১১ শতাংশের বেশি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিম নেমে এসেছে ৪৬ হাজার ১২২ কোটি ৫০ লাখ টাকায়। এক বছর আগে যা ছিল ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বিতরণ কমেছে ১১.৩ শতাংশ।

একই সময়ে দেশের মোট ব্যাংকিং খাতের ঋণে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশ ৩.১ শতাংশ থেকে কমে ২.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

খাতভিত্তিক ঋণ বিতরণে শিল্প খাতই সবচেয়ে বড় গ্রাহক। মোট ঋণের ৫২ শতাংশ শিল্প খাতে, ২০ শতাংশ ব্যবসা ও বাণিজ্যে, ১৬ শতাংশ ভোক্তা ঋণে, ৮ শতাংশ অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক খাতে এবং বাকি ৪ শতাংশ অন্যান্য খাতে গেছে।

শিল্প খাতে ঋণ বেড়ে ২৪ হাজার ২৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকায় পৌঁছালেও ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে ঋণ ১৫ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা থেকে কমে ৯ হাজার ১১০ কোটি ৫০ লাখ টাকায় নেমে এসেছে।

অন্যদিকে কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে ঋণ প্রায় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ৭২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা থেকে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি ৫০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এটি উৎপাদনশীল খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আগ্রহ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

খেলাপি ঋণ কিছুটা বেড়েছে

বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ৪.৯ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালের জুনে ৬.১ শতাংশে ওঠে। পরে ডিসেম্বর শেষে তা কিছুটা কমে ৫.৯ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে এই হার এখনো অধিকাংশ দেশীয় ব্যাংকের তুলনায় কম।

বাণিজ্যে অর্থায়নে শক্ত অবস্থান

২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৪.১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় দেশে এসেছে, যা জাতীয় রপ্তানি আয়ের ১৮.৮ শতাংশ। তৈরি পোশাক, চামড়া ও ইপিজেডভিত্তিক শিল্পে এসব ব্যাংকের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি।

একই সময়ে তাদের মাধ্যমে ৪.২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি বিল পরিশোধ হয়েছে, যা দেশের মোট আমদানির ১৩.১ শতাংশ। টেক্সটাইল, কাঁচামাল, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি ও শিল্প উৎপাদনের উপকরণ আমদানিতে এসব ব্যাংকের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

তবে রেমিট্যান্স আহরণে তাদের অংশগ্রহণ এখনো খুবই সীমিত। আলোচ্য সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে মাত্র ৪৭.৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ।

মুনাফা ও মূলধনে শক্ত অবস্থান

২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কর-পূর্ব মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৯০ কোটি ১০ লাখ টাকা। কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

একই সময়ে পুনবিনিয়োগকৃত আয় কমলেও বিদেশে পাঠানো মুনাফা বেড়ে ১ হাজার ৩১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। এছাড়া ৫৬২ কোটি ৭০ লাখ টাকা লভ্যাংশও বিদেশে পাঠানো হয়েছে।

ডিসেম্বর শেষে এসব ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২১৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। মূলধন ও সঞ্চিতি রয়েছে ১৫ হাজার ৬১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সম্পদের ৫৬ শতাংশের বেশি এবং দায়ের ৬২ শতাংশের বেশি ‘অন্যান্য’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ, যা মূলত অফ-ব্যালেন্স শিট লেনদেনের বিপরীত এন্ট্রি। এটি বিদেশি ব্যাংকগুলোর উচ্চ তারল্য ধরে রাখার প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।

নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক এগিয়ে

আর্থিক সক্ষমতার সূচকেও বিদেশি ব্যাংকগুলো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ডিসেম্বর শেষে তাদের ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি রেশিও ছিল ৪১.৫ শতাংশ, কমন ইকুইটি টিয়ার-১ ৩৯.২৮ শতাংশ এবং টিয়ার-১ ক্যাপিটাল রেশিও ৩৯.৩৪ শতাংশ।

বিদেশি ব্যাংকগুলোর মূলধন, তারল্য, কম খেলাপি ঋণ এবং মুনাফা তাদের কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। বাণিজ্য অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে তাদের অবদান দেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।–হেলাল আহমেদ জনি

এছাড়া রিটার্ন অন অ্যাসেটস ৪.১৮ শতাংশ, রিটার্ন অন ইকুইটি ১৭.১২ শতাংশ, লিভারেজ রেশিও ১৭.৫৩ শতাংশ, তারল্য কাভারেজ অনুপাত ৪৫৮.৫৬ শতাংশ এবং নেট স্টেবল ফান্ডিং রেশিও ১৩২.২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ন্যূনতম মানের তুলনায় অনেক বেশি।

তবে প্রভিশন কাভারেজ রেশিও ৭২.৩৯ শতাংশ থেকে কমে ৬৫.৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

বিশ্লেষকরা যা বলছেন

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এবং ব্যাংক খাত বিশ্লেষক হেলাল আহমেদ জনি জাগো নিউজকে বলেন, বিদেশি ব্যাংকগুলোর মূলধন, তারল্য, কম খেলাপি ঋণ এবং মুনাফা তাদের কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। বাণিজ্য অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে তাদের অবদান দেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তিনি বলেন, তবে ঋণ বিতরণে ধারাবাহিক সংকোচন এবং ব্যাংকিং খাতে বাজার অংশীদারত্ব কমে যাওয়া নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা। করপোরেট খাতের পাশাপাশি উৎপাদনশীল ও নতুন সম্ভাবনাময় খাতে অর্থায়ন বাড়াতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবদান আরও বাড়বে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন কাভারেজের পরিবর্তনের ওপর নিবিড় নজরদারি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন, যাতে তাদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন বজায় থাকে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুল বায়েস বলেন, দেশে সার্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না থাকায় বিনিয়োগে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। নীতিগত সুদের হার বেশি থাকা এবং সামগ্রিক অনিশ্চয়তার কারণে গ্রাহক ও ব্যাংক দুই পক্ষই এখন নতুন করে বড় বিনিয়োগ বা ঋণ দেওয়া-নেওয়া থেকে বিরত থাকছে।

দেশের ব্যাংকিং খাতের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং বকেয়া আদায় না হওয়ার কারণে তারল্য সংকট কাটছে না, আবার বিদেশি ব্যাংকগুলোর শক্তিশালী মূলধন ও তারল্য রয়েছে। সম্ভাবনাময় খাতে অর্থায়ন বাড়াতে পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবদান বাড়বে। তবে কার্যকর অর্থনৈতিক সংস্কার ছাড়া এ পরিস্থিতির টেকসই পরিবর্তন অসম্ভব।

ইএআর/এমআইএইচএস/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow