বেড়ায় স্কুল ফিডিংয়ে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ

পাবনার বেড়া উপজেলার একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে 'ভূতুড়ে' শিক্ষার্থী দেখিয়ে অতিরিক্ত শিশুখাদ্য বরাদ্দ নেওয়া, উপস্থিতির তুলনায় বেশি খাবার উত্তোলন এবং উদ্বৃত্ত ডিম, বনরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকও উদ্বৃত্ত খাবার গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং পুষ্টির ঘাটতি দূর করার লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া এ কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বেড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত ও বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্যে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু হয়। এর আওতায় সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে ডিম, বনরুটি, দুধ, বিস্কুট ও কলা বিতরণ করা হয়। পাবনা জেলার মধ্যে শুধু বেড়া উপজেলাই এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। উপজেলার ১১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ২৪ হাজার ৬৫৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এদের মধ্যে গড়ে ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে সরেজমিনে উপজেলার বি

বেড়ায় স্কুল ফিডিংয়ে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ

পাবনার বেড়া উপজেলার একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে 'ভূতুড়ে' শিক্ষার্থী দেখিয়ে অতিরিক্ত শিশুখাদ্য বরাদ্দ নেওয়া, উপস্থিতির তুলনায় বেশি খাবার উত্তোলন এবং উদ্বৃত্ত ডিম, বনরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকও উদ্বৃত্ত খাবার গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং পুষ্টির ঘাটতি দূর করার লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া এ কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বেড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত ও বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্যে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু হয়। এর আওতায় সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে ডিম, বনরুটি, দুধ, বিস্কুট ও কলা বিতরণ করা হয়। পাবনা জেলার মধ্যে শুধু বেড়া উপজেলাই এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। উপজেলার ১১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ২৪ হাজার ৬৫৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এদের মধ্যে গড়ে ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়।

তবে সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, প্রকৃত উপস্থিতি, হাজিরা খাতা ও খাদ্য বরাদ্দের মধ্যে বিস্তর অসঙ্গতি রয়েছে।

গত রোববার (১৯ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে গোপিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শিফটে গিয়ে সব শ্রেণি মিলিয়ে মাত্র ১৮ জন শিক্ষার্থী দেখা যায়। তবে শিক্ষকদের দাবি ছিল, উপস্থিত ছিলেন ২৮ জন। প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেনের দাবি, প্রথম শিফটে ২৬ জন এবং দ্বিতীয় শিফটে ২৮ জন উপস্থিত ছিলেন। বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থী ৫৬ জন। ওই সময় প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয়ে পাওয়া যায়নি। সহকারী শিক্ষকরা জানান, তিনি মোবাইল ফোন মেরামত করতে বাজারে গেছেন।

সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ৩৬ নম্বর ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাজিরা খাতায় ১১১ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা যায়। বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থী ১৯০ জন। স্থানীয়দের দাবি, ১৭১ জনের নামে প্রতিদিন শিশুখাদ্য বরাদ্দ আসে। ওই সময় সহকারী শিক্ষক অসিত কুমার শাহকে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত সিদ্ধ ডিম খেতে দেখা যায়। সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি ডিমের খোসা হাতে নিয়ে সেখান থেকে চলে যান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জনের খাবার উদ্বৃত্ত থাকে, যা শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসরাইল হোসেন বলেন, "ডিম, পাউরুটি ও কলার মতো পচনশীল খাবার অনেক সময় শিক্ষার্থীদের দিয়ে দেওয়া হয়, আবার কখনো শিক্ষকরা খান। তবে দুধ ও বিস্কুট স্টকে রাখা হয়।"

দুপুর ১২টার দিকে রূপগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত দেখা যায়। শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থী ১০৪ জন এবং ৯১ জনের জন্য খাবার বরাদ্দ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দুই শিফট মিলিয়েও নিয়মিত ৫০ থেকে ৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আসে না।

মির্জাপুর-শীতলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাজিরা খাতায় ৩৬ জন উপস্থিত দেখানো হলেও দুপুর ২টার দিকে দ্বিতীয় শিফটে পাওয়া যায় মাত্র সাতজন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে তৃতীয় শ্রেণিতে তিনজন এবং চতুর্থ শ্রেণিতে চারজন উপস্থিত ছিল। বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থী ৫৬ জন।

কোমরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি রেজিস্টারে ৩১৫ জন শিক্ষার্থীর নাম রয়েছে। হাজিরা খাতায় ২৫০ জনের বেশি উপস্থিত দেখানো হলেও স্থানীয়দের দাবি, নিয়মিত উপস্থিতি ২০০ থেকে ২২০ জনের বেশি নয়। অথচ ২৭৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিশুখাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

তালিমনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুর ২টার দিকে মাত্র ১০ জন শিক্ষার্থী পাওয়া যায়। শিক্ষকরা দাবি করেন, প্রথম শিফটে উপস্থিতি বেশি ছিল। তবে দ্বিতীয় শিফটে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থী ৫৭ জন। প্রধান শিক্ষক ফিরোজ উদ্দিন খান বলেন, বৃষ্টির কারণে বর্তমানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম।

আকনাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাজিরা খাতা অনুযায়ী প্রায় ২৯৩ জন শিক্ষার্থীর তথ্য থাকলেও সরেজমিনে প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত দেখা যায়।

এ ছাড়া দক্ষিণচর পেঁচাকোলা, পেঁচাকোলা, চরপাইখন্দ, বাগজান, ঢালারচর, বুলন্দর, দয়ালনগর, গণপতদিয়া, গঙ্গাদিয়া, চরকান্দি, মমতাজ উদ্দিন খান বালিকা, আব্দুস সামাদ মেমোরিয়াল, ধর্মগঞ্জ, বাগমির্জাপুর, চররূপপুর, উদ্দিন মোল্লা ও চরভবানীপুরসহ আরও কয়েকটি বিদ্যালয়েও অনলাইনে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর ৯০ শতাংশের জন্য খাদ্য বরাদ্দ থাকলেও প্রকৃত উপস্থিতি তার চেয়ে অনেক কম বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাদের দাবি, অতিরিক্ত বরাদ্দ পেতে ভুয়া শিক্ষার্থী দেখানো হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক বলেন, উদ্বৃত্ত খাবার শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় না। বরং অতিরিক্ত খাবার শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। তাদের অভিযোগ, অর্ধশতাধিক ভুয়া শিক্ষার্থী দেখিয়ে খাদ্য বরাদ্দ নেওয়া হচ্ছে। কিছু শিক্ষক প্রতিদিন ব্যাগে করে ডিম, কলা ও বনরুটি বাড়িতে নিয়ে যান। এ অনিয়মে সংশ্লিষ্ট সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদেরও প্রশ্রয় রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

অভিযোগের বিষয়ে বেড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, আমার জানা মতে, প্রত্যন্ত এলাকার কিছু বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কম হলে উদ্বৃত্ত খাবার উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। তারপরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুনাল্ট চাকমা বলেন, স্কুল ফিডিং প্রকল্প শুরুর আগে থেকেই চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে সচেতন মহলের দাবি, বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি শিক্ষার্থী উপস্থিতি, ভর্তি তথ্য ও শিশুখাদ্য বরাদ্দের পুরো বিষয়টি স্বাধীনভাবে তদন্ত করা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্কুল ফিডিং কর্মসূচিকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow