ভারত সীমান্তে সর্বাধুনিক ১১ যুদ্ধবিমান মোতায়েন, শক্তি দেখাচ্ছে চীন?

ভারতের উত্তর সীমান্তের দিকে মুখ করে পঞ্চম প্রজন্মের ভয়াবহ ‘জে-২০ মাইটি ড্রাগন’ (J-20 Mighty Dragon) যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে চীন। স্যাটেলাইট ইমেজিং সংস্থা ‘ভ্যান্টর’ থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, চলতি বছরের জুনের শেষ ও জুলাইয়ের শুরুতে দুটি প্রধান চীনা বিমানঘাঁটিতে কমপক্ষে ১১টি জে-২০ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে। তবে আকাশে চীনের এই শক্তিশালী চ্যালেঞ্জের বিপরীতে নিজস্ব প্রতিরক্ষামূলক জবাব বা নিজস্ব স্টিলথ ফাইটার পেতে ভারতকে এখনো বহু বছর অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, চলতি বছরের ৯ জুলাই শিনজিয়াং প্রদেশের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল উইঘুরে অবস্থিত ‘হোতান’ (Hotan) বিমানঘাঁটির রানওয়েতে এক সারিতে সাতটি জে-২০ যুদ্ধবিমান পার্ক করা রয়েছে। এই ঘাঁটির অবস্থান লাদাখের লেহ শহর থেকে মাত্র ৩৮৯ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ও উত্তর লাদাখে অবস্থিত ভারতীয় বিমানবাহিনীর অন্যতম কৌশলগত ঘাঁটি ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’ (Daulat Beg Oldie) থেকে মাত্র ২৪৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যে এখন পর্যন্ত কোনো চীনা বিমানঘাঁটিতে একসঙ্গ

ভারত সীমান্তে সর্বাধুনিক ১১ যুদ্ধবিমান মোতায়েন, শক্তি দেখাচ্ছে চীন?

ভারতের উত্তর সীমান্তের দিকে মুখ করে পঞ্চম প্রজন্মের ভয়াবহ ‘জে-২০ মাইটি ড্রাগন’ (J-20 Mighty Dragon) যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে চীন। স্যাটেলাইট ইমেজিং সংস্থা ‘ভ্যান্টর’ থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, চলতি বছরের জুনের শেষ ও জুলাইয়ের শুরুতে দুটি প্রধান চীনা বিমানঘাঁটিতে কমপক্ষে ১১টি জে-২০ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে। তবে আকাশে চীনের এই শক্তিশালী চ্যালেঞ্জের বিপরীতে নিজস্ব প্রতিরক্ষামূলক জবাব বা নিজস্ব স্টিলথ ফাইটার পেতে ভারতকে এখনো বহু বছর অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, চলতি বছরের ৯ জুলাই শিনজিয়াং প্রদেশের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল উইঘুরে অবস্থিত ‘হোতান’ (Hotan) বিমানঘাঁটির রানওয়েতে এক সারিতে সাতটি জে-২০ যুদ্ধবিমান পার্ক করা রয়েছে। এই ঘাঁটির অবস্থান লাদাখের লেহ শহর থেকে মাত্র ৩৮৯ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ও উত্তর লাদাখে অবস্থিত ভারতীয় বিমানবাহিনীর অন্যতম কৌশলগত ঘাঁটি ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’ (Daulat Beg Oldie) থেকে মাত্র ২৪৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যে এখন পর্যন্ত কোনো চীনা বিমানঘাঁটিতে একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক জে-২০ যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি দেখতে পাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।

এই স্যাটেলাইট তথ্য ও প্রতিরক্ষামূলক উদ্বেগের বিষয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে প্রকাশিত দ্বিতীয় উপগ্রহ চিত্রটিতে তিব্বতের লহাসা প্রিফেকচারের অধীনস্থ ‘দামশুং’ (Damxung) বিমানঘাঁটির ফ্লাইটলাইনে আরও চারটি জে-২০ স্টিলথ ফাইটার পার্ক করা অবস্থায় দেখা গেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাটিটি অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং অঞ্চল থেকে উত্তর-পশ্চিমে মাত্র ৩৪৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

সাবেক ফাইটার পাইলট এবং ভারতের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ‘নিউস্পেস’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা সমীর জোশী বলেন, হোতানে সাতটি ও দামশুংয়ে চারটি জে-২০-এর উপস্থিতি এটিই নিশ্চিত করে যে, ভারতের মুখোমুখি উচ্চতর বিমানঘাঁটিগুলো থেকে পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ বিমানগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা এখন চীনা বিমানবাহিনীর (পিএলএএএফ) জন্য রুটিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কোনো সাময়িক সিগন্যালিং বা প্রদর্শন নয়।"

তিনি আরও যোগ করেন, ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্য উত্তর সীমান্তে এই ধরণের অদৃশ্য বা কম-শনাক্তযোগ্য হুমকি এখন সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা আমাদের কাউন্টার-স্টিলথ সেন্সর, সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ও স্ট্যান্ডঅফ স্ট্রাইক ক্ষমতার জরুরি আধুনিকীকরণের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে তুলেছে।

জে-২০ এর প্রযুক্তিগত সুবিধা ও ভারতের আমকা (AMCA) সংকট

জে-২০ যুদ্ধবিমানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর আধুনিক স্টিলথ বৈশিষ্ট্য, যা শত্রুর চোখ এড়িয়ে নিখুঁত আক্রমণ চালাতে ও আকাশে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম। উন্নত স্টিলথ কাঠামোর কারণে সাধারণ রাডারে এই বিমানের উপস্থিতি ধরা অত্যন্ত কঠিন। ফলে ফ্রান্স থেকে কেনা ‘রাফায়েল’-এর মতো ভারতের চতুর্থ প্রজন্মের উন্নত কিন্তু নন-স্টিলথ যুদ্ধবিমানগুলোর ওপর চীনের এই বিমানটি বিশাল প্রযুক্তিগত সুবিধা ধরে রাখে।

বর্তমানে ভারতের হাতে কোনো নিজস্ব স্টিলথ যুদ্ধবিমান নেই। ভারতের সম্পূর্ণ স্বদেশী প্রথম স্টিলথ বিমান ‘অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট’ (AMCA) নির্মাণাধীন রয়েছে। তবে ব্যাপক ফ্লাইট-টেস্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে মূল প্রযুক্তিগুলোর সফল যাচাইকরণ সত্ত্বেও, এটি বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রনে যুক্ত হতে অন্তত আরও এক দশক বা ১০ বছরের বেশি সময় লাগবে।

চীনের অবিশ্বাস্য উৎপাদন ক্ষমতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

‘দ্য ওয়ার জোন’ (The War Zone)- এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে চীনা জে-২০ বহরের দ্রুত বৃদ্ধির বিস্তারিত চিত্র সামনে এসেছে। ২০১৯ সালে যেখানে চীনের হাতে আনুমানিক ৫০টি জে-২০ ছিল, ২০২২ সালের শেষ নাগাদ সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২০০টিতে।

পরবর্তী বছরগুলোতে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে যায়। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বার্ষিক উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২০টিতে, যার ফলে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এক ডজনেরও বেশি পিএলএএএফ ইউনিটে এই বিমানের সংখ্যা আনুমানিক ৩০০ থেকে ৫০০-তে পৌঁছেছে। যুক্তরাজ্যের ‘রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট’ ধারণা করছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে চীন প্রায় ১ হাজারটি জে-২০ আকাশে উড়াতে সক্ষম হবে।

গত বছর মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত ৮৮ ঘণ্টার ‘অপারেশন সিঁদুর’ (Operation Sindoor)-এর সময় ভারতীয় বিমানবাহিনীর উপ-প্রধান পদে কর্মরত অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল নর্মদেশ্বর তিওয়ারি বলেন, প্রতি বছর ১২৫টি যুদ্ধবিমান উৎপাদনের সক্ষমতা প্রদর্শন প্রমাণ করে যে তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা কতটা উন্নত। তারা প্রায় বাণিজ্যিক বিমানের মতো যুদ্ধবিমান তৈরি করছে, যা কেবল তখনই সম্ভব যখন সরবরাহ শৃঙ্খল সম্পূর্ণ নিখুঁত হয় ও উচ্চমানের মানবসম্পদ সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকে।

তিনি আরও বলেন, সোজা কথায়, চীন একটি জাতীয় রূপরেখা বা রোডম্যাপ তৈরি করেছিল ও এটির বাস্তবায়নে তারা একটি শক্তিশালী টিম গঠন করেছিল। সেই টিমকে অবিরাম সমর্থন জুগিয়ে নিজেদের রূপরেখাকে সত্যে পরিণত করেছে। তারা বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিল যে তারা সেরা হতে পারে। প্রথম গালফ ওয়ারের পর তারা বিমান শক্তির গুরুত্ব অনুধাবন করে ও মিশন মোডে কাজ শুরু করে।

উল্লেখ্য, গত এক দশক ধরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় চীনের জে-২০ বিমান মোতায়েনের তথ্য কভার করে আসছে। ২০১৬ সালে তিব্বতের চরম উচ্চতায় অবস্থিত দাওচেং ইয়াডিং বিমানবন্দরে প্রথমবার জে-২০ দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের মে-তে সিকিম সীমান্ত থেকে ১৫০ কিলোমিটার উত্তরে শিগাতসে (Shigatse) বিমানঘাঁটিতেও চীনা জে-২০ অবতরণ করতে দেখা গিয়েছিল।

ভারতের বর্তমান স্কোয়াড্রন সক্ষমতা

ভারতের কাছে বর্তমানে মাত্র ৩৬টি রাফায়েল যুদ্ধবিমান রয়েছে, যা হরিয়ানার আম্বালা ও পশ্চিমবঙ্গের হাশিমারা বিমানঘাঁটিতে দুটি স্কোয়াড্রনে বিভক্ত। এছাড়া ভারত ৭.৫ বিলিয়ন বা ৭৫০ কোটি ডলারের চুক্তিতে ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য আরও ২৬টি রাফায়েল অর্ডার করেছে ও বিমানবাহিনীর জন্য ৩৬ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে অতিরিক্ত ১১৪টি রাফায়েল কেনার বিষয়ে দ্যাসোঁ কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে।

একই সঙ্গে ভারতীয় বিমানবাহিনী ২৬০টিরও বেশি রাশিয়ান ডিজাইনের সুখোই-৩০ এমকেআই (Sukhoi-30MKI) ফাইটার পরিচালনা করছে, যা বড় ধরনের আধুনিকীকরণের অপেক্ষায় রয়েছে। এর পাশাপাশি মিরাজ ২০০০ ও মিগ-২৯ এর মতো কিছু পুরনো মডেলের যুদ্ধবিমানও বহরে রাখা হয়েছে।

সূত্র: এনডিটিভি

এসএএইচ

 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow