ভোটের পরিবেশ শান্ত রেখেছিল যে ‘নিরাপত্তা বলয়’
দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। নিকট অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় এটি ছিল সবথেকে শান্তিপূর্ণ। এই নির্বাচন ঘিরে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি এবং ভোটারদের কেন্দ্রে গিয়ে বাধা পাওয়ার অভিযোগও ছিল না বললেই চলে। মূলত নির্বাচনের দীর্ঘ সময় আগে থেকে নেওয়া সুপরিকল্পিত ‘নিরাপত্তা বলয়’ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিই এই অভাবনীয় সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুন মাস থেকেই এই নির্বাচনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি শুরু হয়। ইসির নির্দেশক্রমে আইন-শৃঙ্খলা সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন ইসি সচিবালয়ের অধীনে আইডিয়া প্রজেক্টের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। তার নেতৃত্বে প্রায় ২০ জন কর্মকর্তা ২৪/৭ এই সেলের জন্য অনবরত কাজ করে গেছেন। তাছাড়া কমিশনের বাইরে ২১টি প্রতিষ্ঠানের ৩৮ জন ফোকাল পয়েন্টের সঙ্গে কাজ করে এই সেলের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়। এই সমন্বয় সেল মূলত ভৌত এবং ডিজিটাল- দুই ধরের ডোমেইন নিয়েই কাজ করে। এই সেলের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, দেশের বিদ্যমান সম্পদের (জনবল, প্রযুক্তি, যান
দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। নিকট অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় এটি ছিল সবথেকে শান্তিপূর্ণ। এই নির্বাচন ঘিরে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি এবং ভোটারদের কেন্দ্রে গিয়ে বাধা পাওয়ার অভিযোগও ছিল না বললেই চলে। মূলত নির্বাচনের দীর্ঘ সময় আগে থেকে নেওয়া সুপরিকল্পিত ‘নিরাপত্তা বলয়’ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিই এই অভাবনীয় সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুন মাস থেকেই এই নির্বাচনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি শুরু হয়। ইসির নির্দেশক্রমে আইন-শৃঙ্খলা সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন ইসি সচিবালয়ের অধীনে আইডিয়া প্রজেক্টের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। তার নেতৃত্বে প্রায় ২০ জন কর্মকর্তা ২৪/৭ এই সেলের জন্য অনবরত কাজ করে গেছেন। তাছাড়া কমিশনের বাইরে ২১টি প্রতিষ্ঠানের ৩৮ জন ফোকাল পয়েন্টের সঙ্গে কাজ করে এই সেলের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়। এই সমন্বয় সেল মূলত ভৌত এবং ডিজিটাল- দুই ধরের ডোমেইন নিয়েই কাজ করে। এই সেলের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, দেশের বিদ্যমান সম্পদের (জনবল, প্রযুক্তি, যানবাহন, ইত্যাদি) সঠিক ব্যবহার, মাঠ পর্যায়ের কাজের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ এবং অপতথ্যের বিপরীতে সঠিক তথ্যের উপস্থাপনা।
প্রথমবারের মতো এই সেলে এমন অনেক বিষয়ের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে অন্তত তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে (ইউএনডিপি, ইইউ ও আইএফইএস) অফিসিয়ালি চিঠি দিয়ে এই সেলের কার্যক্রমের প্রশংসা করা হয়েছে। তাছাড়া এই সেলে প্রথমবারের মতো সংখ্যালঘু, নারী, বিশেষায়িত ব্যক্তিদের নির্বাচনকালীন এবং পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে একটি বিশেষ ব্যবস্থা নেয়। যার ফলে নির্বাচনে এই ধরনের ব্যক্তিদের উপর নির্যাতন বা নিপীড়ন হয়নি বললেই চলে। সড়ক, জলপথ, আকাশ পথসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও কড়া নজরদারিতে ছিল। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও বিশেষ অভিযানের সমন্বয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ ভোট আয়োজন সফল হয়েছে।
এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিস্তৃত ও বহুস্তরীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে নামানো হয়েছিল সোয়া ৯ লাখ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। পাশাপাশি ছিল প্রায় ৮ লাখ নির্বাচনী কর্মকর্তা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের লক্ষ্য ছিল একটাই। আর সেটি হলো ভোটের পরিবেশকে সহিংসতামুক্ত রাখা।
‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ : নির্বাচনের আগেই সহিংসতার শিকড় কাটার চেষ্টা
নির্বাচনী নিরাপত্তা ব্যবস্থার সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’। পুলিশ সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানের দুই ধাপে মোট ৩ হাজার ৮৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় ১ হাজার ২টি আগেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এরমধ্যে রয়েছে রাইফেল, রিভলভার, বিদেশি পিস্তল, পিস্তল, এলজি, শুটার গান, বন্দুক, পাইপগান, শটগান ও মিয়ানমারের অস্ত্র ইত্যাদি। এছাড়া ১৪৯টি গোলাবারুদ, ২৯ হাজার ৪৭৮টি গুলি, ২ হাজার ১৪টি কার্তুজ, ২ হাজার ৪৭৫টি দেশীয় অস্ত্র, ৩৭৪টি ম্যাগাজিন, ১১৩টি বোমা, ৭৪০টি ককটেল, ৩৮ দশমিক ৫৯২ কেজি গান পাউডার, ১৬ দশমিক ৩ কেজি আতশবাজি, গ্যাস শেল ৬টি, ২০৭টি অস্ত্রের অংশ, মর্টার শেল একটি, গ্রেনেড ২২টি, ডিটোনেটর ১২০টি, রাসায়নিক পাউডার ২৮ দশমিক ৮ কেজি, ৫১৯ দশমিক ৫ লিটার রাসায়নিক দ্রব্য উদ্ধার করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভোটের আগে সম্ভাব্য সহিংসতার সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল সংঘাত ঘটার আগেই তা প্রতিরোধের চেষ্টা।
প্রযুক্তির ব্যবহার : নজরদারিতে নতুন মাত্রা
ত্রয়োদশ নির্বাচনে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ছিল একটি নতুন সংযোজন। ৪৭৯টি ড্রোন দিয়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, র্যাব ও আনসার ভিডিপি ১৮৬টি নির্বাচনী এলাকা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে। এছাড়া পুলিশ সদস্যদের জন্য ছিল ২৫ হাজার বডি-ওর্ন ক্যামেরা। ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে রিয়েল-টাইম নজরদারি সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, বডি ক্যামেরা ব্যবহারের ফলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বাড়ানো হয়েছে।
নিরাপত্তার ‘মেগা মোতায়েন’ : সংখ্যায় শক্তির প্রদর্শন
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর যে মোতায়েন পরিকল্পনা করা হয়, তা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা কাঠামো। সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে আনসার- সব বাহিনীকে যুক্ত করে তৈরি করা হয় সমন্বিত বলয়। ১ লাখ ৩ জন সেনাবাহিনী, পুলিশ ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, আনসার ও ভিডিপি ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩ জন, বিজিবি ৩৭ হাজার ৫৪৫ জন, র্যাব ৯ হাজার ৩৪৯ জন ও অন্যান্য বাহিনীসহ মোট ৯ লাখ ২৫ হাজার ৪৫৮ জন নির্বাচনী দায়িত্বে ছিলেন। এই বিপুল সংখ্যক সদস্যের মোতায়েন মূলত দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে- ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং নির্বাচনী সহিংসতা প্রতিরোধ।
প্রশাসনিক কাঠামো : মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি
শুধু নিরাপত্তা বাহিনী নয়, নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সংখ্যাও ছিল বিশাল। ২ হাজার ২২৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ৬৫৫ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেছেন। ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিতি নির্বাচনী আচরণবিধি প্রয়োগ এবং তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ডিজিটাল নজরদারি আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে এবং ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
আচরণবিধি প্রয়োগ : জরিমানায় কড়াকড়ি
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় কমিশন। নির্বাচনে ৪৬৩টি মামলায় ৩ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এই জরিমানার পরিমাণ ইঙ্গিত দেয় যে, নির্বাচনী অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ না হলেও তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন মাঠে সক্রিয় ছিল।
সহিংসতার তুলনামূলক চিত্র
সব প্রস্তুতির পরও ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ভোটের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৮০৫টি অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে। তবে তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, আগের নির্বাচনের তুলনায় সহিংসতার ধরণ ও মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ছিল। এতে হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলক কম হয়েছে- যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার আংশিক সফলতার ইঙ্গিত দেয়। বিনাভোট খ্যাত দশম সংসদ নির্বাচনে আহত হন ৭৮০ জন। নিহত হন ১১৫ জন। রাতের ভোটখ্যাত একাদশ সংসদ নির্বাচনে আহত হন ৭৮০ জন। নিহত হন ২২ জন। আমি-ডামিখ্যাত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আহত হয়েছেন ৪৬০ জন। নিহত হয়েছেন ৬ জন। আর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনী সহিংসতায় আহত হয়েছেন ৫৩৪ জন। একজন দায়িত্ব পালনকালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, জেলাভিত্তিক ঝুঁকি বা হটস্পট দেখেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নীলফামারীতে ৫০ লাখ টাকাসহ একজন রাজনৈতিক নেতাকে আটক, চন্দনাইশে নগদ টাকাসহ তিনজন আটক, এসব ঘটনা নির্বাচনে অর্থের প্রভাব এবং স্থানীয় উত্তেজনা কমাতে সহায়ক ছিল।
এ বিষয়ে সাফল্যের মূল কী ছিল জানতে চাইলে আইডিয়া প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, সাফল্যের পেছনে যে বিষয়গুলো কাজ করেছে তা হলো সব দেশি-বিদেশি সংস্থাসমূহের আন্তরিক সহযোগিতা, পরিস্থিতি বিবেচনায় সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সবার সদিচ্ছা, পরিমিত সম্পদের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার, অপতথ্যের বিপরীতে সঠিক তথ্যের সময়োচিত প্রচার, নিত্য নতুন প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, অপকর্মের বিপরীতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং অপারেশনাল ফ্লেক্সিবিলিটি। তাছাড়াও পূর্বের নির্বাচনগুলো হতে প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণ, প্রতিনিয়ত মাঠ পর্যায় থেকে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সঠিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সমন্বয় করার নিমিত্ত মিটিং করে সবাইকে অবস্থা সম্পর্কে আপডেট রাখাও ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দেশি-বিদেশি সংস্থার প্রতিনিধি, সংবাদমাধ্যমকর্মী, পর্যবেক্ষক ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে বিভিন্ন সময়ে ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের প্রচেষ্টাগুলোকে আমরা মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পেরেছিলাম, যা সুষ্ঠু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার্থে কাজ করেছে বলে মনে করি।
What's Your Reaction?