মাইক্রোফিকশন: 'শুদ্ধ' আর 'ভুল'-এর গল্প

5 hours ago 5

শ্রেণিকক্ষে গণিত শিক্ষকের জন্য অপেক্ষা করছিল কো-এডুকেশনে পড়ুয়া দশম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীরা।

কখনো নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না। এই মহান শিক্ষক যথাসময়ে ক্লাসরুমে ঢোকেন, হাফহাতা সাদা শার্ট পরে টিপ টপ চলেন। আজ স্যার আসতে দেরি হচ্ছে। ছেলেমেয়েরা হইচই শুরু করেছে।

ক্লাস ক্যাপ্টেন, 'শুদ্ধ' উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'যারা বেশি চিৎকার-চেঁচামেচি করবে, বেশি দুষ্টুমি করবে, বেশি ঝামেলা করবে, ব্ল্যাকবোর্ডে তাদের নাম তুলে রাখব। স্যার এসে তখন শাস্তি দিবেন।'

পেছনের বেঞ্চি থেকে একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'তুমি ঠিক করছ না, শুদ্ধ। আমাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা তোমার উচিত হবে না। আমরা হইচই করছি, এটাই তোমার শুদ্ধতার শরীরে শুভ্র পোশাক জড়িয়ে দিয়েছে আর হইচইয়ের মাধ্যমে আমরা আনন্দ প্রকাশ করছি, করব। স্যার এলে চুপ হয়ে যাব। এটা আমাদের বয়সের বৈশিষ্ট্য । আমাদের এই বৈশিষ্ট্যে বাধা দেওয়া চলবে না।'

দীপ্ত কণ্ঠে প্রতিরোধের আওয়াজ ওঠায় শুদ্ধ নিজ আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পেছনের কোনার বেঞ্চের দিকে একবার তাকাল। সেখানে তখনো দাঁড়িয়ে আছে চশমা পরা একটি মেয়ে যে সব সময় ভুল করে। সবাই তার নাম দিয়েছে 'ভুল'।

শুদ্ধ অহংকারী কণ্ঠে বলল, 'ভুল, তুমি ভুলভাল কথা বোলো না। ইতোমধ্যেই তোমার আসন ভুলের খাতায় চলে গেছে। আমার কাজে বাধা দিয়ো না। আমি সঠিক কাজটিই করছি, ভুল করি না, করছিও না।'

নত হলো না ভুলের মাথা। উঁচুতে রেখেই বলল, 'সব সময় সঠিক কাজ করি, এমন ভাবা ঠিক নয়। কিছু করতে গেলে ভুল হতে পারে। ভুল না-করলে শুদ্ধপথে এগোব কীভাবে? ভুল যে হয়েছে সেটা কীভাবে বুঝব? তুমি বরং ক্ষমতা পেয়ে অহংকারের চূড়ায় উঠে গেছো। নেমে এসো । নিজেকে হনু ভেবো না।

স্তব্ধ হয়ে গেল শুদ্ধ। তার মধ্যে আলাদা একটা অহংকার ছিল। ভাবত সে সবসময় সঠিক কাজটিই করে। তার কাজে ভুল থাকতে পারে, কখনো স্বীকার করে না, নিজেকে অনুভব করে কেবলই শুদ্ধরূপে। আচমকা আপন ভাবনাতত্ত্ব আছড়ে পড়ল শ্রেণিকক্ষে। তখনই দেখল গণিত স্যারের পরিবর্তে এক অচেনা ম্যাম এসে ঢুকলেন ক্লাসরুমে। হইচই থামিয়ে সবাই দাঁড়িয়ে গেল।
'নিশ্চয়ই তোমরা অবাক হচ্ছ আমাকে দেখে।'

'জি ম্যাম, আমরা আপনাকে চিনি না। মনে হয় ভুল করে আমাদের ক্লাসে চলে এসেছেন।' বলল শুদ্ধ।

'আমি একজন গায়িকা, ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আমার জন্ম। আমার নাম টেইলর সুইফট।'

সঙ্গে সঙ্গে ভুল প্রশ্ন করল, 'কীভাবে এলেন আমাদের দেশে, এই মুহূর্তে?'

'তোমাদের সবার google চালু আছে মোবাইলে। চালু আছে ওয়েব পোর্টাল। এসব প্রযুক্তির ওপর ভর করে তোমাদের দ্বন্দ্বের কথা পৌঁছে গেছে আমার বোধের জগতে। আমিও তাই তরঙ্গ বেয়ে চলে এসেছি, ওয়েব থেকে মানবীয় রূপ লাভ করে তোমাদের ক্লাসে উপস্থিত হয়েছি।'
'কিন্তু ম্যাম আপনি যে এসেছেন তা তো সত্য।'

'সত্য। আমি এসেছি। এখন তোমাদের দুই সহপাঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। মনে হয়েছে সবার মধ্যে ছড়িয়ে যাবে এই দ্বন্দ্ব। আরও মনে হয়েছে সংঘাত বাঁধবে। ছোটখাটো দ্বন্দ্ব মীমাংসা না হলে উত্তপ্ত সংঘর্ষে লিপ্ত হতে পারো তোমরা। ঘরে ঘরে, দেশে দেশেও বিশ্বজুড়ে চলছে এমনতর ভয়াবহ বিধ্বংসী ঘটনা। ভয়ংকর হয়ে যেতে পারো তোমরা, আমরা বড়রাও। মনে হয়েছে এই মুহূর্তে তোমাদের মধ্যে আমার উপস্থিতি জরুরি।'

শুদ্ধ বলল, 'আমার কোনো ভুল নেই। ভুলই ভুল করেছে আমাকে বাধা দিচ্ছে, দিয়েছে।'

কাউন্টার দিয়ে ভুল বলল, 'এইমাত্র শুদ্ধ বলল, আপনি ভুল করে এসেছেন। অথচ প্রমাণিত হলো সত্য তুলে ধরার জন্য আপনি এসেছেন। ভুল করে আসেননি। শুদ্ধ যে ভুল করেছে, সে কি তা বুঝতে পেরেছে? ভুল না করলে কি সে যে ভুল করে, তার শিক্ষা পেত, ম্যাম?
'ভুল ঠিক বলেছে।' বললেন টেইলর সুইফট।

'এ কথার পেছনে আপনার যুক্তি কী, ম্যাম?' ঘাড় ত্যাড়া করে অহংকারের উঁচু চূড়া থেকে প্রশ্ন করল শুদ্ধ।

'যুক্তি খুব সহজ। জীবন-কুড়ানো অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমি বহুবার ভুল করেছি। ভুল করে পিছিয়ে যাইনি। ব্যর্থ হয়েছি। ভেঙে পড়িনি। বরং ভুল, ঘাটতি আর নিজের অদক্ষতা ধরার চেষ্টা করেছি। ভুলটা শুদ্ধ করেছি। আরও বেশি বেশি প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে দক্ষ করেছি, গড়েছি। ভুল করতে করতে শিখতে শিখতে সেই শিক্ষার আলো থেকে শুদ্ধটাকে মাথায় তুলে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি।'

শুদ্ধের মাথা নত হয়ে গেল আর উদ্ধত মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রইল ভুল। কিছুক্ষণ পর কৃতজ্ঞতাভরা চোখে বলল, 'ম্যাম, আপনার কথা শুনে আমরা আলোকিত হলাম আর শুদ্ধ যে ভুল করতে পারে সেটাও দেখতে পেলাম। আশা করব, নিজের ভুলটা ধরব সবাই। তা সংশোধন করব, নিজেকে শুদ্ধ করব। অন্যের সমালোচনায় ভেঙে পড়ব না।'

'তোমাকে ধন্যবাদ, ভুল। ভুল আর শুদ্ধ মিলেমিশে আমাদের জীবন। তোমাদের জীবন আনন্দময় হোক।'

কথা শেষ করে সুইফট দেখলেন মন খারাপ হয়ে গেছে শুদ্ধর। তার উদ্দেশেও বললেন, 'ভুল হলেই ভেঙে পড়তে হবে? ভুল করতে করতেও শেখা যায় না? ভুল তোমাকে যে শিক্ষা দিবে সেই শিক্ষাই কি স্থায়ী আর শুদ্ধ শিক্ষা নয়?'

ম্যামের প্রশ্ন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুদ্ধ দেখল জানালার পাশে একটা টিকটিকি লেজ নাড়াচ্ছে আর 'ঠিকঠিক' শব্দ ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেদিকে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল শুদ্ধর চোখে-মুখে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও মনোশিক্ষাবিদ।
সম্পাদক, শব্দঘর- সাহিত্য-সংস্কৃতির মাসিক পত্রিকা।

এইচআর/এএসএম

Read Entire Article