মাকে কি না মরে পড়ে থাকতে হয়েছে ৭ দিন
আমিনুল ইসলাম বুকটা কেঁপে উঠেছে। এক ছেলে সচিব, আরেক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক, মেয়ের জামাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সেই মাকে কি না মরে পড়ে থাকতে হয়েছে ৭ দিন। কেউ খোঁজ নেয় নাই। শরীরে পোকা ধরেছে। সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক আমি; তাই কিছু বিষয় বিশ্লেষণ করার দরকার মনে করছি। তখন ঢাকার নামকরা আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি। এটি একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বেশিরভাগ শিক্ষকই বুয়েট থেকে পাস করা। আর আমি পড়াই সমাজ বিজ্ঞান। গিয়েছি পরীক্ষার হলে ডিউটি দিতে। সেখানে এক শিক্ষকের সাথে পরিচয় হলো। তিনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষক এবং বুয়েট থেকে পড়ে এসেছেন। আমি তখন মাত্রই সুইডেন থেকে মাস্টার্স শেষ করে দেশে ফিরেছি। আমাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি সমাজ বিজ্ঞান পড়েছেন কেন? এই সাবজেক্ট পড়ে কী হয়?’ আমার আর রুচি হয়নি তাকে উত্তর দেবার। তিনি যদি সত্যিই জানার জন্য প্রশ্ন করতেন; তাহলে উত্তর দিতাম। কিন্তু তিনি রীতিমতো আমাকে ছোট করার জন্য এই প্রশ্ন করেছিলেন। কারণ তিনি মনে করেন, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে জগতের সবচাইতে বড় মানুষ হয়ে গেছেন! আর সচিবদের কথা কী বলবো। সিস্টেম এদের যে পরিমাণ ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে; এরা তো চাকরি পাবা
আমিনুল ইসলাম
বুকটা কেঁপে উঠেছে। এক ছেলে সচিব, আরেক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক, মেয়ের জামাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সেই মাকে কি না মরে পড়ে থাকতে হয়েছে ৭ দিন। কেউ খোঁজ নেয় নাই। শরীরে পোকা ধরেছে। সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক আমি; তাই কিছু বিষয় বিশ্লেষণ করার দরকার মনে করছি।
তখন ঢাকার নামকরা আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি। এটি একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বেশিরভাগ শিক্ষকই বুয়েট থেকে পাস করা। আর আমি পড়াই সমাজ বিজ্ঞান। গিয়েছি পরীক্ষার হলে ডিউটি দিতে। সেখানে এক শিক্ষকের সাথে পরিচয় হলো। তিনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষক এবং বুয়েট থেকে পড়ে এসেছেন। আমি তখন মাত্রই সুইডেন থেকে মাস্টার্স শেষ করে দেশে ফিরেছি। আমাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি সমাজ বিজ্ঞান পড়েছেন কেন? এই সাবজেক্ট পড়ে কী হয়?’ আমার আর রুচি হয়নি তাকে উত্তর দেবার। তিনি যদি সত্যিই জানার জন্য প্রশ্ন করতেন; তাহলে উত্তর দিতাম। কিন্তু তিনি রীতিমতো আমাকে ছোট করার জন্য এই প্রশ্ন করেছিলেন। কারণ তিনি মনে করেন, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে জগতের সবচাইতে বড় মানুষ হয়ে গেছেন!
আর সচিবদের কথা কী বলবো। সিস্টেম এদের যে পরিমাণ ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে; এরা তো চাকরি পাবার পর আর নিজেদের মানুষই মনে করেন না। একেকজন রীতিমতো রাজা-মহারাজা। দেখুন, আমাদের সমাজ শেখায়- যে করেই হোক সফল হতে হবে। আর সফলতার সংজ্ঞা কী?
এই মায়ের ছেলে-মেয়েরা। কেউ সচিব, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ কানাডায় থাকছে। কিন্তু এদের কারও নিজের মায়ের কথা মনে হয় নাই ৭ দিন! হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন, ৭ দিন! আমার মা একজন অশিক্ষিত মানুষ ছিল। ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে গেলে আর পড়বে কীভাবে? সেই মা আমাদের শিখিয়েছেন, ‘আগে মানুষ হও। এরপর অন্য কিছু।’
বাসার গৃহকর্মীকে একবার ছোটবেলায় বকে দিয়েছিলাম, দেরি করে পানি নিয়ে আসার জন্য। এজন্য আমার বাবা প্রায় দুই সপ্তাহ আমার সাথে কথা বলেন নাই। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি ওই ছেলের কাছে ক্ষমা না চেয়েছি, ততক্ষণ তিনি আমার সাথে কথা বলেন নাই। আমাকে পরিষ্কার করে বলেছিলেন, ‘ছেলেটা ভাগ্য দোষে বাসায় কাজ করছে। এই ভাগ্য তোমারও হতে পারতো।’ সেই যে কারো সাথে উঁচু গলায় কথা বলা ছেড়েছি। এই ৪৬ বছর বয়সে এসেও কোনো দিন কারো সাথে উঁচু গলায় কথা বলি নাই। আর আমাদের পরিবারগুলো কী শেখায়?
আপনি যেভাবেই হোক সফল হন। আর সফল হয়ে গেলে অন্য মানুষদের কেউ মানুষই মনে করছে না। এসব পরিবার থেকেই শিখে আসে। আমার মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। বিদেশে থাকি। তবুও মায়ের সাথে দুই দিন কথা না বললেই হাঁসফাঁস লাগতো। আর এই সচিব কিংবা বুয়েটের শিক্ষক ছেলের ৭ দিনেও মায়ের কথা মনে হয় নাই। কেন হয় নাই?
কারণ সমাজ তাদের এত বড় মনে করে যে, আশপাশের সবাই তাদের স্যার স্যার করছে। হুজুর হুজুর করছে। তো মায়ের কথা মনে হবে কেন? আমার লেখা যারা পড়েন, আমি ধরে নেই- এরা কোনো সাধারণ পাঠক না। কারণ বিশাল বিশাল লেখা লিখি এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জটিল বিষয় বিশ্লেষণ করি। যদি সাধারণ লেখা লিখতাম, হয়ত এতদিনে আমার মিলিয়নের ওপর পাঠক থাকতো। কিন্তু আমি সেই পথে যাই নাই। তো, এই পাঠকদের মাঝেও কেউ কেউ এসে মাঝে মাঝে বলে, ‘এই যে বাংলাদেশ নিয়ে এতো লেখেন। সমালোচনা করেন। দেশের জন্য কিছু করেছেন?’
অর্থাৎ এরা মনে করে, দেশের জন্য কিছু করতে হলে সচিব হতে হবে। মন্ত্রী-মিনিস্টার হতে হবে কিংবা দেশেই শিক্ষকতা করতে হবে। আমি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বই লিখছি, দেশ-সমাজ, রাজনীতি নিয়ে দেশের সেরা পত্রিকাগুলোতে কলাম লিখছি। এই যে লিখে বার্তা দিচ্ছি। মানুষের মগজে ঢোকার চেষ্টা করছি কিংবা মানসিকতা পরিবর্তন করার চেষ্টা করছি। যুগের পর যুগ বিদেশে থেকেও দেশের জন্য লিখছি। এরা এটাকে দেশের জন্য কোনো কাজ মনে করে না! কেন করে না?
কারণ এদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র এদের শিক্ষা দিয়েছে বড় পদ-পদবির মানুষরাই সফল। এরাই দেশের জন্য কাজ করছে। মানে একজন লেখক, সমালোচককে এরা মানুষের পর্যায়েই ধরছে না। আমাকে কিছুদিন আগে খুব কাছের এক বন্ধু বলেছে, ‘কিরে তুই মন্ত্রী হবি না?’ আমি আকাশ থেকে পড়েছি! আমি কোন দুঃখে মন্ত্রী হতে যাবো? তাহলে সে এই প্রশ্ন কেন করেছে? কারণ মন্ত্রী হতে পারাটাকেই সে সফল মনে করছে।
আমি যে দিন-রাত সিস্টেমের বিরুদ্ধে লিখছি। দাসত্বের সিস্টেমের বিরুদ্ধে বলছি। এটাকে সে কোনো কাজ বা সফলতা মনে করছে না। আপনি যখন এমন একটা সমাজ গড়ে তুলবেন। তখন তো এসব বিষয় স্বাভাবিকই হবে।
কোনো পত্রিকা এই সন্তানদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করেছে? কেন করে নাই? কারণ এরা সমাজের উঁচু স্তরে বাস করে। পত্রিকারও সাহস নাই এদের নাম প্রকাশ করার। কিন্তু যদি কোনো সাধারণ পরিবার হতো। দেখতেন সবার ছবিসহ প্রকাশ করে দিতো। অথচ বাংলাদেশের আইনে বাবা-মায়ের দেখভাল করা, তাদের সাথে থাকার কথা পরিষ্কার করে লেখা আছে। নইলে এটি অপরাধ। ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইনের ধারাগুলো পড়ে দেখবেন। অর্থাৎ সবাই ওই সফলদেরই পূজা করা! ওদের সাত খুন মাফ!
আমরা যখন ১৫-২০ বছর আগে পত্রিকায় ক্রমাগত লিখে গেছি- এভাবে চললে এ সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কেউ শুনেছেন আপনারা? এ দেশকে তো শিক্ষিত মানুষরাই ভাগাড় বানিয়ে রেখেছে। কোনো অশিক্ষিত মানুষ কি এ রাষ্ট্র চালায়? উচ্চশিক্ষিত মানুষগুলো, বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে এসে সচিব হয়, শিক্ষক হয়; এরপর বড় বড় পদ-পদবি পায়। এরাই এই দেশটাকে শেষ করে দিয়েছে। বাংলাদেশে এখন কোনো মানুষ বাস করে না। এখানে বাস করে কিছু সচিব, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মন্ত্রী-এমপি, জজ-ব্যারিস্টার, সাংবাদিক ইত্যাদি।
চারদিকে তাকিয়ে দেখেন, সবাই কেমন অস্থির। অনেক দিন ধরে বলছি, বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা চিকিৎসার ঊর্ধ্বে উঠে গেছে। যারা চিকিৎসা করবে (যেমন- এই সন্তানরা, কেউ সচিব, কেউ শিক্ষক); এরা নিজেরাও অসুস্থ। ফুল স্টপ।
লেখক: বিশ্লেষক এবং জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, এস্তোনিয়ান এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ইউনিভার্সিটি।
এসইউ
What's Your Reaction?