মাটির জিনিসের শৌখিন হলে ঢাকার যেখানে যাবেন

11 hours ago 5

বিকেলের ম্লান আলোয় দোয়েল চত্বর। চারপাশে ব্যস্ত মানুষের ভিড়, তবু আলাদা করে চোখে পড়ে রঙিন একঘর পসরা। সারি সারি সাজানো কলসি, হাঁড়ি, ফুলদানি, শো-পিস, কাপে-গ্লাসে ঢাকা দেওয়া লালচে আভা। মাটির গন্ধ মিশে আছে বাতাসে।

শহরের কোলাহল যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় এখানে। মাটির এই সামগ্রীর দোকানগুলো শুধু বাজার নয়, এ যেন আমাদের শেকড়ের টানকে অনুভব করার এক ছোট্ট আয়োজন।

ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে দোয়েল চত্বরে টানা ২৮ বছর ধরে ব্যবসা করছেন ইব্রাহিম বাবুল। তিনি বলেন, এটা মূলত পাল সম্প্রদায়ের ব্যবসা। ১৯৮৫–৮৬ সালের দিকে পালরা এখানে আসেন। তাদের দেখে অন্যরাও এই ব্যবসায় নামেন। অনেকে মারা গেছেন, কেউ আবার পেশা বদলে অন্যত্র চলে গেছেন। তবে তাদের কিছু বংশধর এখনো আছে। মানুষ চলে যাবে, কিন্তু যুগ যুগ ধরে এই ব্যবসা টিকে থাকবে।

মাটির জিনিসের শৌখিন হলে ঢাকার যেখানে যাবেন

২৮ বছর ধরে মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ইব্রাহিম বাবুল। ছবি/ মামুনূর রহমান হৃদয়

একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে থাকত মাটির হাঁড়ি-কলসি। রান্না থেকে শুরু করে পানি রাখা, অতিথি আপ্যায়ন, সবকিছুতেই মাটির তৈরি জিনিস ছিল অপরিহার্য। এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। সিরামিক, প্লাস্টিক বা কাচের তৈরি সামগ্রী বাজার দখল করে নিয়েছে। তবু রুচিশীল সমাজে মাটির পণ্যের কদর এখনো আছে। কেউ ক্যাকটাস সাজানোর জন্য টব কিনছেন, কেউ ফুলদানি, কেউ আবার শো-পিস। কেউবা সৌখিনতার বাসায় খাবার প্লেট কিংবা মাটির ফিল্টার।

বাবুল জানালেন, চাহিদা আগের মতো নেই, তবে আমরা তো এই পেশায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। যারা শিক্ষিত আর একটু রুচিশীল, তারাই বেশি কিনে। তাদের কাছে মাটির জিনিসের আলাদা কদর আছে।

মাটির জিনিসের শৌখিন হলে ঢাকার যেখানে যাবেন

সকালের আলোয় দোয়েল চত্বরে সাজানো হচ্ছিল মাটির পসরা। ছবি/ মামুনূর রহমান হৃদয়

মাটির জিনিস তৈরি সহজ নয়। বাবুলের ভাষায়, মাটি দিয়ে বানানোর পর এগুলোকে আগুনে পোড়াতে হয়। ধরা যাক পাঁচ হাজার পণ্য আগুনে দেওয়া হলো, সেখান থেকে দুই-আড়াই হাজার ভালোভাবে টিকে যায়, বাকিগুলো ফেটে যায় কিংবা নষ্ট হয়। তখন পণ্যের দাম বেড়ে যায়। যদি সব টিকে যেত, দাম অনেক কম হতো। যেমন পানির ফিল্টার আমার এখানে ১৩০০ টাকা। সকল পণ্য যদি টিকে যেত, এটা অর্ধেক দামে পাওয়া যেত।

মৃৎশিল্পের জন্য মাটি সংগ্রহ করাও কঠিন কাজ। শরীয়তপুর, কুষ্টিয়া, কুমিল্লার বিজয়পুর বা বরিশালের বগাদিয়া-কনদিয়া অঞ্চল থেকে বিশেষ ধরনের এটেল মাটি আনা হয়। বাবুল জানান, ঢাকার মাটি দিয়ে কোনোদিন মৃৎশিল্প হয় না। লাগে এটেল মাটি, সঙ্গে বালি, দোয়াশ মাটি, কখনো রাসায়নিকও মেশাতে হয়।

মাটির জিনিসের শৌখিন হলে ঢাকার যেখানে যাবেন

রঙের প্রলেপ দিয়ে সাজানো মাটির শিল্পকর্ম। ছবি/ মামুনূর রহমান হৃদয়

দোয়েল চত্বরের দোকানগুলোয় গেলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। মাটির কাপ, মগ, জগ, ফুলদানি, শোপিস, পানির ফিল্টার থেকে শুরু করে ক্রোকারিজ, ডিনার সেট ইত্যাদি। শুধু গৃহস্থালির সামগ্রী নয়, আছে পোড়ামাটির টেরাকোটা, দেয়াল সাজানোর শিল্পকর্ম, এমনকি নারীদের গহনা কানের দুল, বালা কিংবা গলার মালাও। দাম শুরু ২৫০ টাকা থেকে শুরু করে কয়েক হাজার পর্যন্ত।

মাটির জিনিসের শৌখিন হলে ঢাকার যেখানে যাবেন

আছে মাটির কাপ, মগ, জগ, ফুলদানি, শোপিস, পানির ফিল্টার থেকে শুরু করে ক্রোকারিজ, ডিনার সেট ইত্যাদি। ছবি/ মামুনূর রহমান হৃদয়

দোয়েল চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন আবু তাহের। তিনি বলেন, গ্রামে এখন আর মাটির জিনিসপত্র আগের মতো চলে না। কিন্তু ঢাকায় যারা শখ করে ঘর সাজায়, তারা কিনে। মাটির টব, ফুলদানি ও ফিল্টার ভালো বিক্রি হয়। অনেকে আবার প্রিয়জনকে উপহার দিতেও কেনে। আমরা যারা এত বছর ধরে এই কাজ করছি, তাদের কাছে এটা শুধু ব্যবসা নয়, এটা আমাদের জীবনের অংশ।

মৃৎশিল্প এখন বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে দামী কাঁচামাল, অন্যদিকে উৎপাদনের সময় বিপুল পরিমাণ ক্ষতি -- সব মিলিয়ে টিকে থাকা কঠিন। তবু এই শিল্পের প্রতি মমতা আর ঐতিহ্যের টানই তাদের ধরে রেখেছে।

মাটির জিনিসের শৌখিন হলে ঢাকার যেখানে যাবেন

শুধু গৃহস্থালির সামগ্রী নয়, আছে পোড়ামাটির টেরাকোটা ও দেয়াল সাজানোর শিল্পকর্ম। ছবি/ মামুনূর রহমান হৃদয়

দোকানিদের কথায়, আমরা জানি এই ব্যবসা আগের মতো লাভজনক নয়। তবু ছাড়তে পারিনি। মাটির গন্ধে আমাদের শেকড় আছে। যতদিন পারব ধরে রাখব।

মাটির জিনিস হয়তো আর প্রতিটি গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজন নয়। তবে এখনো শৌখিন মানুষের ঘরে আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে টিকে আছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পাল বংশের হাত ধরে আসা এই শিল্প একদিন হয়তো আবারো ফিরে পাবে তার পুরোনো সম্মান। দোয়েল চত্বরে সাজানো রঙিন হাঁড়ি-কলসগুলো যেন তাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। নিপুন হাতের তৈরি মৃৎশিল্পগুলো যেন বলতে চায়, 'আমরা এখনো শেকড়ে বাঁধা আছি, মাটির টান আমাদের এখনো ছাড়েনি।'

এএমপি/এমএস

Read Entire Article