হাত ধোয়া কাজটি এতটাই সাধারণ যে, অনেক সময় এর গুরুত্বই আমরা ভুলে যাই। অথচ মাত্র ২০ সেকেন্ডের এই ছোট্ট অভ্যাসই অসংখ্য সংক্রমণ থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারে। বিশেষ কোনো যন্ত্র লাগে না, খরচও খুব কম। তারপরও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই যুগে চিকিৎসকেরা এখনও বারবার হাত ধোয়ার কথাই বলেন।
ভ্যাকসিন বা অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের বহু আগেই হাতের পরিচ্ছন্নতা মানুষের বেঁচে থাকার হার বদলে দিয়েছিল। করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও একই বার্তা নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছিল; পরিষ্কার হাত শুধু ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, এটি পুরো সমাজের জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত।
সংক্রমণের অদৃশ্য শৃঙ্খল শুরু হয় স্পর্শ থেকেই
প্রতিদিনের জীবনে মানুষ অসংখ্য জিনিস স্পর্শ করে। দরজার হাতল, মোবাইল ফোন, টাকার নোট, বাস-ট্রেনের রেলিং, এমনকি কারও সঙ্গে করমর্দন; সবকিছুতেই নানা ধরনের জীবাণু থাকতে পারে। সব জীবাণু ক্ষতিকর না হলেও কিছু জীবাণু গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে।
মুম্বাইয়ের জিনোভা শালবি হাসপাতালের কনসালটিং ফিজিশিয়ান ডা. প্রতীক গোপানি বলেন, অনেক মানুষ এখনও নিয়মিত হাত ধোয়াকে গুরুত্ব দেন না। অথচ হাত ধোয়ার অভ্যাস গুরুতর সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং সামগ্রিক সুস্থতা বাড়াতে সাহায্য করে। এটি অত্যন্ত কার্যকর ও কম খরচের একটি স্বাস্থ্যচর্চা।
দূষিত হাত যখন মুখ, নাক বা চোখে লাগে, তখন জীবাণু খুব সহজেই শরীরে প্রবেশ করে। এভাবেই কলেরা, টাইফয়েড, ডায়রিয়া কিংবা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো শ্বাসতন্ত্রের রোগ ছড়িয়ে পড়ে। শুধু নোংরা পরিবেশেই নয়, বাইরে থেকে পরিষ্কার দেখানো জায়গাতেও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে।
গবেষণা কী বলছে?
হাত ধোয়ার উপকারিতা শুধু মুখে মুখে প্রচলিত কোনো পরামর্শ নয়, এর পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সিডিসি (CDC) বলছে, নিয়মিত হাত ধোয়ার মাধ্যমে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
যেসব দেশে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সুযোগ বেড়েছে, সেখানে সংক্রমণের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাত ধোয়া এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর ও কম ব্যয়বহুল স্বাস্থ্যসুরক্ষা অভ্যাসগুলোর একটি।
যেসব মুহূর্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি অবহেলা করে
বেশরভাগ সংক্রমণ বড় কোনো ঘটনায় নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অসতর্ক মুহূর্ত থেকেই ছড়ায়। অপরিষ্কার হাতের কারণে পেটব্যথা, বমি, জ্বর, কাশি বা ত্বকে জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এসব জটিল হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজনও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা যেসব সময়ে অবশ্যই হাত ধোয়ার পরামর্শ দেন—
টয়লেট ব্যবহারের পর
খাবার খাওয়ার আগে
রান্না শুরু করার আগে ও কাঁচা খাবার ধরার পর
কাশি বা হাঁচি দেওয়ার পর
টিস্যু ব্যবহার করার পর
পোষা প্রাণী বা ময়লা স্পর্শ করার পর
বাইরে থেকে বাসায় ফেরার পর
শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি দুর্বল হতে থাকে।
শুধু সময় নয়, সঠিক পদ্ধতিটাও জরুরি
অনেকেই খুব তাড়াহুড়ো করে হাত ধুয়ে ফেলেন। কিন্তু সঠিকভাবে হাত না ধুলে জীবাণু থেকেই যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালোভাবে হাত ধুতে প্রায় ২০ সেকেন্ড সময় নেওয়া উচিত।
সঠিক পদ্ধতি হলো—
পরিষ্কার পানিতে হাত ভিজিয়ে নিন
সাবান ব্যবহার করে ভালোভাবে ফেনা তৈরি করুন
দুই হাতের তালু, হাতের পেছনের অংশ, আঙুলের ফাঁক ও নখের নিচে ভালোভাবে ঘষুন
পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন
পরিষ্কার তোয়ালে বা বাতাসে শুকিয়ে নিন
সাবান ত্বকের ময়লা ও চর্বি ভেঙে জীবাণু দূর করতে সাহায্য করে। শুধু পানি ব্যবহার করলে অনেক জীবাণুই হাতে থেকে যেতে পারে। সাবান না থাকলে অ্যালকোহলভিত্তিক স্যানিটাইজার কিছুটা সহায়তা করতে পারে। তবে হাত দৃশ্যমানভাবে নোংরা হলে সেটি পুরোপুরি বিকল্প নয়।
আধুনিক জীবনেও কেন এই অভ্যাস এত গুরুত্বপূর্ণ
চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে, কিন্তু সংক্রমণ এখনও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; বিশেষ করে ভিড়পূর্ণ শহর, অফিস, স্কুল বা গণপরিবহনে। একজন মানুষের ছোট্ট অসতর্কতা অনেকের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। হাত ধোয়ার অভ্যাস তাই শুধু নিজের সুরক্ষার জন্য নয়, আশপাশের মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।
এ কারণেই চিকিৎসকেরা এখনও হাত ধোয়ার কথা এত গুরুত্ব দিয়ে বলেন। কারণ এই ছোট্ট অভ্যাসটি সহজ, বারবার করা যায়, আর কার্যকারিতাও অত্যন্ত শক্তিশালী।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া