মানবসেবায় সুবাস ছড়াচ্ছেন ‘সিস্টার রোজের’

১৯৬৪ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে জন্মভূমি ইংল্যান্ড ছেড়ে বাংলাদেশে পা রাখেন জিলিয়ান মার্গারেট রোজ। নার্স হিসেবে দেশজুড়ে মানুষের সেবা দিতে ছুটে বেড়ান। মাঝে কিছু সময় নিজের দেশে গেলেও ফেরেন বাংলাদেশের মাটিতে। অবশেষে মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার বল্লভপুর গ্রামে থিতু হন। ১৯৯৬ সাল থেকে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানেই মানুষের জন্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের কাছে তিনি ‘সিস্টার রোজ’ হিসেবে পরিচিত। কেউ কেউ ‘মানবতার মা’ বলেও তাকে ডাকেন। জীবনযাপন আর সেবা তার কাছে একাকার। বর্তমান বয়স ৮৭ হলেও প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে হাসপাতালের ওয়ার্ড পরিদর্শন এবং বহির্বিভাগে রোগী দেখা। রোজকে ঘিরে রোগীদের ভিড় নিয়মিত থাকে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের থেকে নবজাতক- সব শ্রেণির মানুষ তার সেবা পেয়ে থাকেন। ১৯৮১ সালে বল্লভপুর হাসপাতালে যোগদানের পর রোজ হাসপাতালটিকে এক প্রাণবন্ত স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে পরিণত করেছেন। ৩০ শয্যার এই হাসপাতালে দুজন এমবিবিএস চিকিৎসক ও ২৫ জন স্টাফ নার্স রয়েছেন। মূলত প্রসূতি মা ও শিশুদের জন্য জরুরি ক্ষেত্রে সেবা দেওয়া হয়। বহির্বিভাগে রোগী দেখে বিনামূল্যে ওষুধ প্রদান করা হয়। হ

মানবসেবায় সুবাস ছড়াচ্ছেন ‘সিস্টার রোজের’

১৯৬৪ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে জন্মভূমি ইংল্যান্ড ছেড়ে বাংলাদেশে পা রাখেন জিলিয়ান মার্গারেট রোজ। নার্স হিসেবে দেশজুড়ে মানুষের সেবা দিতে ছুটে বেড়ান। মাঝে কিছু সময় নিজের দেশে গেলেও ফেরেন বাংলাদেশের মাটিতে। অবশেষে মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার বল্লভপুর গ্রামে থিতু হন। ১৯৯৬ সাল থেকে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানেই মানুষের জন্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের কাছে তিনি ‘সিস্টার রোজ’ হিসেবে পরিচিত। কেউ কেউ ‘মানবতার মা’ বলেও তাকে ডাকেন। জীবনযাপন আর সেবা তার কাছে একাকার। বর্তমান বয়স ৮৭ হলেও প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে হাসপাতালের ওয়ার্ড পরিদর্শন এবং বহির্বিভাগে রোগী দেখা। রোজকে ঘিরে রোগীদের ভিড় নিয়মিত থাকে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের থেকে নবজাতক- সব শ্রেণির মানুষ তার সেবা পেয়ে থাকেন।

১৯৮১ সালে বল্লভপুর হাসপাতালে যোগদানের পর রোজ হাসপাতালটিকে এক প্রাণবন্ত স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে পরিণত করেছেন। ৩০ শয্যার এই হাসপাতালে দুজন এমবিবিএস চিকিৎসক ও ২৫ জন স্টাফ নার্স রয়েছেন। মূলত প্রসূতি মা ও শিশুদের জন্য জরুরি ক্ষেত্রে সেবা দেওয়া হয়। বহির্বিভাগে রোগী দেখে বিনামূল্যে ওষুধ প্রদান করা হয়। হাসপাতালের বেবিকেয়ার ইউনিটে কম ওজনের নবজাতক রাখা হয় ইনকিউবিটরে।

রোজ বৃদ্ধাশ্রমও চালু করেছেন। সেখানে বর্তমানে ১৭ জন নারী ও ৮ জন পুরুষ বৃদ্ধ রয়েছেন। নার্সিং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে স্থানীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের উন্নয়নের পথ সুগম করেছেন। সপ্তাহের এক দিন করে পাশের গ্রাম—রতনপুর ও আনন্দবাসেও ছুটে যান। 

হাসপাতালের প্রতিটি কক্ষে রোগীদের সঙ্গে কথা বলার সময় দেখা যায় বয়সের ভারে নুয়ে পড়া রোজের শরীর। তবু আঙুলের ফাঁকে কলম, ইংরেজি ও বাংলায় রোগীর ব্যবস্থাপত্র লিখছেন। রোগীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, নির্ভরতার হাসি, সন্তুষ্টি দেখে আত্মসন্তুষ্টি পান। রোগীরা বলছেন, ‘সিস্টারের কাছে সেবা পেলে খুব ভালো লাগে, সন্তানের জন্মপ্রক্রিয়ায় সহায়তা পাওয়ায় নিরাপদ বোধ করি।’

রোজ নিজের সেবার জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেন না। হাসপাতালের পাশে থাকা তার ছোট একতলা ঘরে একাই থাকেন, সঙ্গী দু’টি কুকুর ও একটি বিড়াল এবং দু’টি গরু। প্রতিদিন ভোরে ওঠেন, সকাল ৯টার মধ্যে হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। রোজ বলেন, ‘সেবা করাই আমার মূল্য লক্ষ্য। আমার ভালোবাসা। এটি নিয়েই থাকতে চাই।’ 

মানবসেবার জন্য ২০০০ সালে ‘অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ (ওবিই) পদকে ভূষিত হন রোজ। তবে এই পুরস্কার গ্রহণ করতে তিনি ইংল্যান্ড যাননি। বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার ডেভিড কার্টার নিজ হাতে বল্লভপুর হাসপাতালে পৌঁছে তার হাতে পুরস্কার পৌঁছিয়ে দেন।

জীবনের শেষ সময়ও তিনি বাংলাদেশে থাকতে চাচ্ছেন। এই কারণে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন। ২০২২ সালের ১০ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আবেদন জমা দেওয়া হয়। বল্লভপুর হাসপাতালের কর্মকর্তা আলফ্রেড বিনিময় বিশ্বাস বলেন, ‘ইংল্যান্ডের নাগরিকত্ব বজায় রেখেও যদি তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়, তবে এটি খুবই ভালো হবে। একজন নারী জীবনের সবকিছু ছেড়ে নিঃস্বার্থভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তার জন্য বাংলাদেশ সরকার অবশ্যই সম্মান দেখাতে পারে।’ 

রোজের জীবন কেবল একটি হাসপাতাল নয়। বরং এক মানবিক শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার কেন্দ্র। প্রতিদিনের একনিষ্ঠ সেবা, বিনামূল্যে চিকিৎসা, শিশু ও বৃদ্ধদের যত্ন—এগুলো শুধু চিকিৎসা নয়, এটি মানবতার প্রতি তার অনন্য ভালোবাসার পরিচয়। বল্লভপুর গ্রাম, পাশের গ্রাম এবং হাসপাতালের প্রতিটি কোণে রোজের সেবা ছড়িয়ে আছে, যা এখনো অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে সকলের জন্য।

জীবনের শেষ পর্যায়ে এসেও রোজের প্রত্যেক দিনের সূচনা ও সমাপ্তি মানুষের কল্যাণে ব্যয় হয়। সেই জীবনের পুরোটা এখন বাংলাদেশের মাটিতে ভালোবাসা ও মানবতার সুবাস ছড়ানো। তার জীবনের এই নিঃস্বার্থ দৃষ্টান্ত যে কোনো নাগরিকের জন্য গর্বের বিষয়। 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow