মানুষকে যেভাবে আমরা দ্বীন থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি
ইসলাম প্রচার ও প্রসারে দাঈদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, মানুষের মন জয় করা, মানুষের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক ও আকর্ষণীয় ধারণা দেওয়া। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের অবস্থা বুঝে পর্যায়ক্রমে দ্বীন শিক্ষা দেওয়া এবং সহজ পন্থা অবলম্বন করা। যিনি সদ্য ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তার কাছে আমরা হুট করেই এমন কিছু আশা করতে পারি না, যা জন্মসূত্রে মুসলিম পরিবারে ও মুসলিম সমাজে বেড়ে ওঠা একজন পরহেজগার মানুষের কাছে আশা করা যায়। নতুন কোনো মুসলমানকে শুরুতেই নফল ও সুন্নতের কঠিন শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলা, কিংবা সব ধরনের সন্দেহজনক ও মাকরূহ বিষয় থেকে বেঁচে থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া মস্ত বড় একটি ভুল। এতে ইসলামের সৌন্দর্য বোঝার আগেই মানুষ হাঁপিয়ে ওঠে। আমার জাপানের দ্বীনি ভাইদের একটি অভিজ্ঞতা এখানে উল্লেখ করা যায়। সেখানকার নব্য মুসলিমদের তারা শুরুতেই ইসলামের খুঁটিনাটি জটিল মাসায়েল, ওয়াজিব ও নফল ইবাদতের কঠোর সব নিয়ম শিখিয়ে তাদের ওপর বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছিলেন। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। জাপানিরা বলতে শুরু করল, আপনাদের ধর্মে তো নিয়মের কোনো শেষ নেই, বড্ড কঠিন। আমি আমার ভাইদের বললাম, দোষটা আসলে আপনাদেরই। আপনাদের শিক্ষা দেওয়ার কঠোর পদ্ধতি ম
ইসলাম প্রচার ও প্রসারে দাঈদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, মানুষের মন জয় করা, মানুষের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক ও আকর্ষণীয় ধারণা দেওয়া। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের অবস্থা বুঝে পর্যায়ক্রমে দ্বীন শিক্ষা দেওয়া এবং সহজ পন্থা অবলম্বন করা। যিনি সদ্য ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তার কাছে আমরা হুট করেই এমন কিছু আশা করতে পারি না, যা জন্মসূত্রে মুসলিম পরিবারে ও মুসলিম সমাজে বেড়ে ওঠা একজন পরহেজগার মানুষের কাছে আশা করা যায়।
নতুন কোনো মুসলমানকে শুরুতেই নফল ও সুন্নতের কঠিন শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলা, কিংবা সব ধরনের সন্দেহজনক ও মাকরূহ বিষয় থেকে বেঁচে থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া মস্ত বড় একটি ভুল। এতে ইসলামের সৌন্দর্য বোঝার আগেই মানুষ হাঁপিয়ে ওঠে।
আমার জাপানের দ্বীনি ভাইদের একটি অভিজ্ঞতা এখানে উল্লেখ করা যায়। সেখানকার নব্য মুসলিমদের তারা শুরুতেই ইসলামের খুঁটিনাটি জটিল মাসায়েল, ওয়াজিব ও নফল ইবাদতের কঠোর সব নিয়ম শিখিয়ে তাদের ওপর বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছিলেন। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। জাপানিরা বলতে শুরু করল, আপনাদের ধর্মে তো নিয়মের কোনো শেষ নেই, বড্ড কঠিন। আমি আমার ভাইদের বললাম, দোষটা আসলে আপনাদেরই। আপনাদের শিক্ষা দেওয়ার কঠোর পদ্ধতি মানুষকে ইসলামের দিকে আকর্ষণ করার বদলে উল্টো দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
যারা নতুন ইসলাম গ্রহণ করছেন, তাদের শেখানোর মূল নীতি হবে ফরজ বিষয়গুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া এবং নিশ্চিতভাবে হারাম করা বিষয়গুলো থেকে দূরে রাখা। শুরুতেই সন্দেহজনক বা মাকরূহ বিষয় নিয়ে তাদের ব্যতিব্যস্ত করার কোনো প্রয়োজন নেই। শুরুতে বড় গুনাহ বা কবিরা গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকার প্রতি মনোযোগ দেওয়াই যথেষ্ট। কারণ ছোটখাটো ভুলত্রুটি তো নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা এবং রমজানের রোজা রাখার মাধ্যমেই মাফ হয়ে যায়। সহিহ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে অপর জুমা এবং এক রমজান থেকে অপর রমজান—এর মধ্যবর্তী সময়ের সমস্ত গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়, যদি কবিরা গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকা যায়। (সহিহ মুসলিম)
কোরআনেও আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, যদি তোমরা বড় বড় নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাক, তাহলে আমি তোমাদের ছোট ছোট পাপগুলো ক্ষমা করে দেব এবং তোমাদেরকে এক মহামর্যাদার স্থানে প্রবেশ করাব। (সুরা নিসা: ৩১)
এই একই কোমলতা ও সহজতার নীতি প্রযোজ্য হবে সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও, যিনি আজীবন পঙ্কিলতার মধ্যে ডুবে থাকার পর অনুতপ্ত হয়ে আলোর পথে ফিরে এসেছেন। সদ্য তওবা করা ব্যক্তিকে নতুন মুসলমানের মতোই বিবেচনা করতে হবে। তাকে শুরুতেই ইসলামের সবচেয়ে সহজ আমল ও বিধানগুলো দিয়ে অভ্যস্ত করাতে হবে, যাতে দ্বীনের জমিনে তার পায়ের তলার মাটি শক্ত হয়। ভেতর থেকে যখন ইমানের আলো ডালপালা মেলবে, তখন সে নিজেই ভালো কাজের পরিধি বাড়াতে সচেষ্ট হবে।
অথচ আমাদের কিছু দ্বীনি ভাইকে দেখে আমার বড্ড আফসোস হয়। তারা যখন এমন সব দেশে দাওয়াতি কাজে যান, যেখানে মানুষ প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে সমাজতান্ত্রিক নাস্তিক্যবাদের কবলে পড়ে ইসলামকে পুরোপুরি ভুলে গেছে, সেখানে গিয়েও তারা অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। যেসব ছেলেমেয়েদের ইসলামের সাথে একমাত্র বাঁধন কেবল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র মৌখিক স্বীকৃতিটুকু, তাদের সামনে গিয়ে তারা নিজেদের নির্দিষ্ট মাজহাব চাপিয়ে দেওয়া শুরু করেন। পুরুষদের জন্য দাড়ি এবং নারীদের জন্য নেকাব পরাকে তারা ইসলামের প্রথম শর্ত বানিয়ে বসেন!
উগ্রতা ও রূঢ় আচরণ
মানুষ দ্বীন থেকে দূরে সরে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ হলো আমাদের রূঢ়তা, কর্কশ ভাষা এবং কঠোর আচরণ। অথচ মানুষের সাথে সুন্দর ব্যবহার, কোমলতা ও হাসিমুখে কথা বলা একজন দাঈর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কোরআন এই বিষয়ে খোদ রাসুলুল্লাহকে (সা.) সম্বোধন করে বলেছে: আল্লাহর দয়াতেই আপনি তাদের প্রতি কোমলহৃদয় হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত। (সুরা আলে ইমরান: ১৫৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী। তিনি অত্যন্ত নরম স্বভাবের মানুষ ছিলেন। মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিতেন।
রুচিহীন পোশাক ও মলিন অবয়ব
আমাদের অনেক দাঈর জীর্ণশীর্ণ ও মলিন পোশাক-আশাক এবং রুক্ষ বাহ্যিক অবয়ব আধুনিক সমাজকে এই বার্তাই দেয় যে, ইসলাম বোধহয় আধুনিকতা বা পরিচ্ছন্নতার বিরোধী। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের বাহ্যিক পোশাক ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নশীল হতে বলতেন। একবার তিনি বলেছিলেন, যার অন্তরে তিল পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি তো ভালো পোশাক এবং সুন্দর জুতো পছন্দ করি, এটাও কি অহংকার? রাসুল (সা.) বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন।
যে ইসলাম শুধু জবরদস্তির ভাষা বোঝে
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, কেউ কেউ মানুষের সামনে ইসলামকে এমন এক কঠিন ও রুক্ষ অবয়বে উপস্থাপন করছেন, যা দেখলে সাধারণ মানুষের মনে ভয়ের উদ্রেক হয়।
তারা এমন এক ইসলামের প্রচার করছেন যা শুধু বাহ্যিক আচার-সর্বস্বতা, চিন্তাহীন অন্ধত্ব, নারীদের গৃহবন্দী করে রাখা এবং জীবনকে কেবল ‘হারাম’ শব্দের বেড়াজালে আটকে রাখার নামান্তর। এই ইসলাম কেবল হিংস্রতা, রূঢ়তা আর জবরদস্তির ভাষা বোঝে। এই ইসলামে মতপার্থক্যের কোনো জায়গা নেই, এখানে অন্যের মতকে সম্মান জানানোর কোনো উদারতা নেই।
আমরা যে ইসলামের স্বপ্ন দেখি, তা হলো প্রথম যুগের সেই খাঁটি ইসলাম। তা হলো কোরআন ও সুন্নাহর উদার ইসলাম, যা মানুষের জন্য বিষয়গুলোকে সহজ করতে এসেছে, কঠিন করতে নয়; যা মানুষকে সুসংবাদ দেয়, ভীতি ছড়ায় না; যা উগ্রতার বদলে কোমলতার কথা বলে; যা অন্ধ অনুকরণের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চাকে অগ্রাধিকার দেয়।
আসুন, আমরা এমন এক ইসলামের আলো ছড়াই—যার আকিদা হলো তাওহীদ, যার ইবাদতের প্রাণ হলো ইখলাস, যার মূল ভিত্তি হলো নীতি ও নৈতিকতা এবং যার শেষ ফল হলো একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুন্দর মানবিক সমাজ। এই উদার ও ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামই পারবে পুরো বিশ্বকে আমাদের কাছে টানতে এবং আমাদেরও বিশ্বের দরবারে সম্মানিত করতে।
সূত্র: আলকারযাভী ডট নেট
ওএফএফ
What's Your Reaction?

