মামুন রশীদের কাব্যভুবন: আত্মিক বিস্তৃতির ক্যানভাস- শেষ পর্ব
চন্দন চৌধুরী ৩.তার কবিতার মূলে যে দার্শনিক প্রজ্ঞা, শরীর ও আত্মার অবিনশ্বর দ্বন্দ্ব, কবিতা সম্পর্কিত অনন্য নান্দনিক চিন্তা এবং গভীর অস্তিত্ববোধ ক্রিয়াশীল... তা বাংলা কবিতায় এক নতুন মাত্রা এনে দেয়। তার ‘কবিতা কিছুই বলে না’, ‘সময়’, ‘মানুষ বা আত্মা বা শেষাবধি এরকম কিছু’, ‘তোমার কীর্তনে কৃতার্থ দোহার’ এবং ‘যদি চলে যাওয়া যেতো’—এই কবিতাগুলো পাঠ করলে অনুধাবন করা যায়, কবির দৃষ্টিভঙ্গি অসীম আত্মিক সত্যের দিকে প্রসারিত। বিশ্বসাহিত্যের সুদীর্ঘ ইতিহাসে বহু কবি কবিতাকে নির্দিষ্ট রূপক ও মতাদর্শের ছাঁচে ফেলার চেষ্টা করেছেন। কেউ একে প্রথাগত আন্দোলনের অস্ত্র বানিয়েছেন, কেউবা নিছক রূপসী প্রকৃতির বর্ণনায় আবদ্ধ রেখেছেন। তবে মামুন রশীদের কাছে কবিতা শুধু কোনো বার্তা পৌঁছানোর শুষ্ক বাহন বা কোনো নৈতিকতার বক্তৃতা নয়। তিনি কবিতাকে একটি সজীব সত্তা হিসেবে দেখেন, যা নিজস্ব নিয়মে বিকশিত হয়। ‘কবিতা কিছুই বলে না, শুধু হয়ে ওঠে।’ এই একটিমাত্র পঙ্ক্তি তার সমগ্র সাহিত্যদর্শন ও কাব্যতত্ত্বের পরম নির্যাস। কবির দৃষ্টিভঙ্গিতে, কবিতা কোনো প্রস্তুত করা সিদ্ধান্ত বা বক্তব্যকে জোর করে পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেয় না। তা এক অলৌকিক ও আ
চন্দন চৌধুরী
৩.
তার কবিতার মূলে যে দার্শনিক প্রজ্ঞা, শরীর ও আত্মার অবিনশ্বর দ্বন্দ্ব, কবিতা সম্পর্কিত অনন্য নান্দনিক চিন্তা এবং গভীর অস্তিত্ববোধ ক্রিয়াশীল... তা বাংলা কবিতায় এক নতুন মাত্রা এনে দেয়। তার ‘কবিতা কিছুই বলে না’, ‘সময়’, ‘মানুষ বা আত্মা বা শেষাবধি এরকম কিছু’, ‘তোমার কীর্তনে কৃতার্থ দোহার’ এবং ‘যদি চলে যাওয়া যেতো’—এই কবিতাগুলো পাঠ করলে অনুধাবন করা যায়, কবির দৃষ্টিভঙ্গি অসীম আত্মিক সত্যের দিকে প্রসারিত।
বিশ্বসাহিত্যের সুদীর্ঘ ইতিহাসে বহু কবি কবিতাকে নির্দিষ্ট রূপক ও মতাদর্শের ছাঁচে ফেলার চেষ্টা করেছেন। কেউ একে প্রথাগত আন্দোলনের অস্ত্র বানিয়েছেন, কেউবা নিছক রূপসী প্রকৃতির বর্ণনায় আবদ্ধ রেখেছেন। তবে মামুন রশীদের কাছে কবিতা শুধু কোনো বার্তা পৌঁছানোর শুষ্ক বাহন বা কোনো নৈতিকতার বক্তৃতা নয়। তিনি কবিতাকে একটি সজীব সত্তা হিসেবে দেখেন, যা নিজস্ব নিয়মে বিকশিত হয়। ‘কবিতা কিছুই বলে না, শুধু হয়ে ওঠে।’ এই একটিমাত্র পঙ্ক্তি তার সমগ্র সাহিত্যদর্শন ও কাব্যতত্ত্বের পরম নির্যাস। কবির দৃষ্টিভঙ্গিতে, কবিতা কোনো প্রস্তুত করা সিদ্ধান্ত বা বক্তব্যকে জোর করে পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেয় না। তা এক অলৌকিক ও আত্মিক অভিজ্ঞতা, যা প্রতিটি পাঠকের অবচেতন অনুভূতির গভীরতায় নতুন করে জন্ম নেয়। আধুনিক সাহিত্যতত্ত্বের পরিভাষায় যাকে আমরা পাঠক-নির্ভর অর্থসৃষ্টি বলি, মামুন রশীদ তার কাব্যিক প্রজ্ঞায় অত্যন্ত নিপুণভাবে তাকেই রূপ দিয়েছেন। কবিতা তার নিজের অর্থের ঘোষণা নিজে দেয় না; পরম ব্যাকুলতায় পাঠক যখন সেই শব্দের কাছে পৌঁছায়, তখন উভয়ের নিঃশব্দ মেলবন্ধনে জন্ম নেয় এক স্বতন্ত্র অর্থ।
কবিতার অলৌকিক উপস্থিতি ও অস্তিত্বের গভীরতা প্রকাশ করতে গিয়ে কবি যে অনবদ্য উপমা চয়ন করেছেন, তা চিরকালীন পাঠককে থমকে দেয়:
‘স্তন থেকে গড়িয়ে দুধের ফোঁটা নামে শিশুর গালে
তেমনি মৃত মানুষের কফিনের পাশে
ইচ্ছার বলি হয়ে কবিতা শুয়ে থাকে।’
উপমাটি কাব্যাঙ্গনে অত্যন্ত অভিনব এবং গভীর অর্থবহ। এখানে একদিকে মাতৃদুগ্ধের পবিত্রতা ও নবজীবনের অপার সম্ভাবনা, অন্যদিকে কফিনের শীতল নিস্তব্ধতা ও নির্দয় মৃত্যুর বাস্তবতা। এই দুটি বিপরীত ও পরম অনুভূতিকে কবি মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। জন্ম ও মৃত্যুর এই দুই মহাশূন্যতার মাঝখানে বহমান যে জটিল ও রহস্যময় মানবজীবন, মূলত সেটাই হলো কবিতার পরম পরিসর। কবিতা এখানে মানুষের জন্ম-মৃত্যুর অমোঘ বাস্তবতার মাঝে বেঁচে থাকার এক চরম ও স্বাভাবিক আত্মিক প্রকাশ।
মহাকালের প্রথাগত সংজ্ঞায় সময়কে সর্বদা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের একটি সরলরৈখিক ধারায় মাপা হয়। ঘড়ির কাঁটার হিসাব কিংবা পঞ্জিকার পাতায় সময় বন্দি থাকে। কিন্তু মামুন রশীদ তার ‘সময়’ কবিতায় চিরন্তন এই ধারণাকে এক নতুন দার্শনিক বাস্তবতায় দাঁড় করিয়েছেন।
‘সময় বলে কিছু নেই। বন্ধ খামের ভেতরে শূন্যতা শুধু।’
কবির প্রারম্ভিক উক্তিটি মানবমনের চিরাচরিত বিশ্বাসকে যেন এক তীব্র ঝাঁকুনি দেয়। কবির চোখে সময় বাহ্যিক কোনো বাস্তব বস্তু বা সেকেন্ড-মিনিটের সরল হিসাব এক শূন্যতা, যা মানুষ তার অনুভূতির উত্তাপ দিয়ে পূর্ণ করে। কবিতার গভীরে কবি আরও উন্মোচিত করেন সময়ের অন্তর্নিহিত সত্য:
‘এ এক শরীরী ভ্রমণ। দেহ থেকে দেহান্তরে, চক্রাকারে।’
এখানে সময় রৈখিক রেখা থেকে হয়ে ওঠে এক অন্তহীন চক্র। জন্ম, মৃত্যু, পুনর্জন্ম, ক্ষয় এবং স্মৃতির মধ্য দিয়ে মানুষের আত্মা যেন এক দেহ থেকে অন্য দেহে, এক স্মৃতি থেকে অন্য স্মৃতিতে নিরন্তর ঘুরে বেড়ায়। প্রাচীন ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শন কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্জন্মতত্ত্বের সুবাস এই পঙ্ক্তিতে থাকলেও, কবি একে কোনো ধর্মীয় আচারের ফ্রেমে বা অলৌকিকতায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি মানুষের আবেগিক অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তিকে এক মনস্তাত্ত্বিক সত্য হিসেবে দেখিয়েছেন। কবির ভাষায়, ‘অভিমান, অনুরাগ, ভালোবাসায় দীর্ঘ দিবস’; অর্থাৎ, মানুষের ভেতরের আনন্দ, ভালোবাসা কিংবা তীব্র অভিমানই সময়ের দৈর্ঘকে নির্ধারণ করে। কোনো মুহূর্ত কবির কাছে দীর্ঘ বা ক্ষণস্থায়ী হয়ে ওঠে মানুষের মনের অনুভূতির ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে, কোনো যান্ত্রিক ঘড়ির কাঁটায় নয়।
সময়চিন্তার এই অন্তর্মুখী যাত্রার পথ ধরেই কবি উপস্থিত হন মানুষের ভেতরের নিজস্ব দ্বৈততার দরজায়। তার দার্শনিক কবিতা ‘মানুষ বা আত্মা বা শেষাবধি এরকম কিছু’-তে এই দ্বৈত সত্তার জটিল সামাজিক ও আত্মিক টানাপোড়েন অসাধারণ কাব্যাবেশে ফুটে উঠেছে।
‘মানুষ মূলত দ্বিখণ্ডিত। আমি। আরশিতে প্রতিবিম্ব পড়ে যে আমার, সেই আমি এবং আমি।’
আধুনিক অস্তিত্ববাদী দর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দু—মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকট এবং তার ভেতরের আত্মিক বিভাজনকে কবি রূপক ও প্রতীকে নিপুণভাবে স্পর্শ করেছেন। আয়নায় যে রূপটি দেখা যায়, তা শুধু বাহ্যিক রূপ বা খোলস; কিন্তু সেই খোলসের অন্তরালে এক অদৃশ্য, অনুচ্চারিত ও পরম খাঁটি ‘আমি’ বাস করে। কবি এই দুটি সত্তাকে রূপক দিয়ে বলেন, ‘প্রবাহিত একটি নদীর দুটি শাখা’। শাখা দুটি আপাতদৃষ্টিতে আলাদা খাতে প্রবাহিত মনে হলেও, তাদের মূল উৎস এক ও অভিন্ন। আমাদের প্রাত্যহিক বাহ্যিক জীবন এবং ভেতরের গভীর মনস্তাত্ত্বিক আত্মিক জগত—উভয়ই একই মানব অস্তিত্বের দুটি রূপ।
একই কবিতায় কবি যখন মানুষের শরীর বা দেহের জাগতিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করেন, তখন তার শব্দচয়ন আরও তীক্ষ্ন ও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে:
‘শরীর হলো অভিশাপ। শরীর মূলত ক্লীব।’
প্রথম পাঠে পঙ্ক্তিটিকে তীব্র বা কঠোর মনে হতে পারে, কিন্তু এর গভীরে রয়েছে গভীর সুফি ভাবধারা, বৈষ্ণব তত্ত্ব এবং পাশ্চাত্য অস্তিত্ববাদের এক অপরূপ মিলনবিন্দু। কবি এখানে স্থূল দেহকে ঘৃণা না করে তিনি মানবদেহের জাগতিক ও নশ্বর সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করছেন। মানুষের আত্মা বা মন সর্বদা অসীমের পানে ডানা মেলতে চায়, নক্ষত্রের অধরা আলো ছুঁতে চায়; কিন্তু নশ্বর শরীর তাকে এক নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় ও নশ্বরতার শিকলে বেঁধে রাখে।
শরীর ও আত্মার এই অবিনশ্বর দ্বন্দ্ব এবং জড়জগতের বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়ার চরম আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে তার বেদনাসিক্ত কবিতা ‘যদি চলে যাওয়া যেতো’তে।
‘যদি চলে যাওয়া যেতো এই দেহ ছেড়ে...’
এটি স্থূল জগতের জড়তা ও জীবনের বিবিধ মানসিক ভার থেকে মুক্তির এক পরম আকুতি। কবি জীবনের সুবিন্যস্ত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত স্মৃতিগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে ক্যানভাস তৈরি করেন—গাছের ডালে কাঠবেড়ালি, ঝিরিঝিরি ধারায় ঝরে পড়া বৃষ্টি, বহু দূরের ট্রেনের দীর্ঘ হুইসেল, মাছরাঙার তীক্ষ্ন চোখ, শৈশবের পুতুল খেলা কিংবা পাহাড়ি ঝরনায় অবগাহন। জীবনের এই সমস্ত বৈচিত্র্যময় ও সুন্দর স্মৃতিগুলো সত্য হওয়া সত্ত্বেও কবি যখন অন্তরের গহীনে উপলব্ধি করেন, ‘দেহ তো আমার ছাই আজন্ম বোঝা’, তখন পাঠক স্তব্ধ হয়ে যান। নশ্বর দেহ যে আত্মার একমাত্র বাহক কিন্তু একই সাথে এক চিরন্তন মানসিক বোঝা—এই উপলব্ধি মামুন রশীদকে বিশ্বসাহিত্যের প্রথম সারির গভীর অস্তিত্ববাদী কবিদের পাশে বসায়।
মামুন রশীদের কবিতায় প্রেম শুধু দুটো শরীরের মিলনে বা লৌকিক উপহারে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা রূপান্তরিত হয় আত্মআবিষ্কার এবং মানব অস্তিত্বকে পাঠ করার এক অলৌকিক প্রক্রিয়ায়। ‘তোমার কীর্তনে কৃতার্থ দোহার’ কবিতায় কবি নিজেকেই একটি জীবন্ত ও সুপ্রাচীন বইয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
‘আমারও দেহে ছিলো অজস্র বর্ণমালা।’
প্রতিটি মানুষ আসলে এক একটি অখণ্ড ও পাঠযোগ্য গ্রন্থ, যার অনুভূতির প্রতি স্তরে লেপ্টে থাকে অজস্র অপ্রকাশিত ইতিহাস, দীর্ঘশ্বাস ও আলো-ছায়ার গল্প। ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ প্রকাশ করতে গিয়ে কবি এক অপূর্ব রূপক তৈরি করে বলেন:
‘মাটি খুঁড়ে নিখুঁত প্রত্নবিদের মতো...’
একজন দক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক যেমন পরম মমতায় ও সূক্ষ্ন নৈপুণ্যে মাটির নিচ থেকে প্রাচীন সভ্যতার অমূল্য নিদর্শন আবিষ্কার করেন, সত্যিকারের প্রেমও ঠিক তেমনি প্রিয়জনের আত্মার গহীনে সুপ্ত থাকা আলো ও বেদনাকে আবিষ্কার করে। ভালোবাসাকে আত্মার এই প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের সাথে তুলনা করা এক অত্যন্ত মৌলিক ও দুর্লভ কাব্যিক ভাবনার সাক্ষ্য দেয়।
‘তোমার কীর্তনে কৃতার্থ দোহার-দুই’ কবিতায় প্রেমের এই আত্মিক রূপ আরও পরিপক্ক ও সংহত রূপ লাভ করে। প্রারম্ভে কবির উচ্চারণ, ‘চুমুতেই পরিতৃপ্তি’, যা লৌকিক ও শারীরিক ভালোবাসার এক মুহূর্তকে নির্দেশ করে। কিন্তু পরক্ষণেই কবি সেই জাগতিক স্পর্শের গণ্ডি পেরিয়ে পরম আত্মিক আকুতিতে পৌঁছান:
‘শুধু তোমাতেই ভাষাময় হয়ে প্রকাশিত হতে চাই।’
এখানে কবি রূপকের অন্তরালে দেখিয়েছেন যে, প্রেমের সর্বোচ্চ সার্থকতা প্রিয়জনের চেতনায় নিজের ভাষাকে খুঁজে পাওয়ায়। যখন একজন মানুষ অন্য মানুষের মাঝে নিজের মনের অব্যক্ত ও অন্তহীন ভাবনা প্রকাশের একমাত্র ভাষা খুঁজে পায়, তখনই ভালোবাসার পরম জয় ঘটে। প্রেম তখন মানুষের প্রকাশিত হওয়ার প্রধান বাহন হয়ে ওঠে।
মামুন রশীদের কবিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো তার অনন্য ও বৈচিত্র্যময় চিত্রকল্প নির্মাণ। তিনি অত্যন্ত সাধারণ ও প্রাত্যহিক দৃশ্যপটকেও তার কাব্যিক ছোঁয়ায় এক অলৌকিক ও গভীর দার্শনিক তাৎপর্য প্রদান করেন। তার কবিতায় ব্যবহৃত প্রতীক ও চিত্রকল্পগুলোর বিস্তার বিস্ময়কর। দূরবর্তী নীরব রেলস্টেশন, অলৌকিক শঙ্খ, ফ্রেমবন্দি স্মৃতির ফটোগ্রাফ, অসীম সমুদ্র, রঙিন ঘুড়ি, খাঁচা ও শৃঙ্খল, চঞ্চল পাখি, টিকটিকির ভঙ্গুর ডিম, নীরব ক্লাসরুমের কালোবোর্ড, ধীরগতির শামুক... এদের কোনোটিই তার কাব্যে শুধু দৃশ্যসজ্জা বা কৃত্রিম অলংকার হিসেবে আসে না। এরা অনুভূতির সজীব ভাষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কবি বাহ্যিক দৃশ্যের আল্পনা এঁকে বিমূর্ত ও জটিল মানসিক অনুভূতির জগতকে পাঠকের চোখের সামনে স্পষ্ট ও দৃশ্যমান করে তোলেন।
তার ভাষার স্বাতন্ত্র্যের দিকে তাকালে প্রধানত তিনটি মৌলিক শক্তি দৃষ্টি আকর্ষণ করে:
প্রথমত, দীর্ঘ বাক্যের অদ্ভুত সঙ্গীতময়তা। তার বহু কবিতায় একটিমাত্র বাক্য বা প্রবাহ পুরো স্তবকজুড়ে নদীর পলিমাটির মতো বিস্তৃত হয়ে চলে। পাঠক যখন সেই পঙ্ক্তিগুলো পাঠ করেন, তখন তার মনে হয় এক প্রবহমান কাব্যিক সুরের ওপর দিয়ে ধীরগতিতে হেঁটে চলছেন।
দ্বিতীয়ত, কথ্য ও কাব্যিক ভাষার এক আশ্চর্য ও নিপুণ মেলবন্ধন। প্রথাগত কঠিন সাধু বা সংস্কৃতঘেঁষা শব্দ এবং অতি সাধারণ প্রাত্যহিক কথ্য ভাষার শব্দকে তিনি একই কাব্যিক ক্যানভাসে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে পাশাপাশি বসিয়েছেন। একদিকে যেমন সাধারণ কথ্যভাষার স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়োগ দেখা যায়, ঠিক তেমনি অন্যদিকে পাশে স্থান পায় ‘হিরণ্য স্মৃতি’র মতো ভারী ও গাঢ় কাব্যিক প্রতিশব্দ। এই দুই বৈপরীত্যের নিপুণ সমন্বয় তার কাব্যভাষাকে একই সাথে অত্যন্ত স্বাভাবিক, প্রাঞ্জল এবং শিল্পিত মর্যাদা দান করেছে।
তৃতীয়ত, দার্শনিক উক্তি বা কালজয়ী পঙ্ক্তি নির্মাণের অদ্ভুত ক্ষমতা। এই সংকলনের অজস্র চরণ বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের হৃদয়ে খোদাই হয়ে থাকার মতো। উদাহরণস্বরূপ:
‘সমুদ্র রাখে না কিছুই।’
‘কবিতা কিছুই বলে না।’
‘একটু একটু করে মানুষ আমাকে মনে রাখুক।’
‘সময় বলে কিছু নেই।’
এগুলো একেকটি স্বাধীন ও গভীর দার্শনিক প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত। যে কোনো মননশীল পাঠককে এই চরণগুলো বারবার থমকে দাঁড়াতে এবং নিজের জীবনের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাতে বাধ্য করে।
তিনি প্রেমকে অস্তিত্বের প্রধানতম মৌলিক ভাষা হিসেবে মহাজাগতিক স্তরে উন্নীত করেছেন। স্মৃতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়কে তিনি ব্যক্তিগত স্মৃতিকাতরতা ছাড়িয়ে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মানুষের আত্মপরিচয়ের প্রধান উৎসে রূপ দিয়েছেন। বাস্তব জীবনের কঠিন সত্যের সাথে পরাবাস্তব ও অলৌকিক দৃশ্যকল্পের অনন্য বুনন তৈরি করে তিনি বাংলা কবিতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।
একই সাথে ভাষাকেই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু এবং এক রক্তমাংসের জীবন্ত সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কবিতাকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক মতাদর্শের প্রচারপত্র না বানিয়ে, তাকে মানুষের অনুভূতি ও আত্মিক জাগরণের শিল্প হিসেবে গড়ে তুলেছেন। সর্বোপরি, ইতিহাস, ভূগোল, পৌরাণিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় অনুষঙ্গ এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির ধূলিকণাকে এক সুতোয় গেঁথে তিনি সমকালীন বাংলা সাহিত্যজগতে এক সম্পূর্ণ নিজস্ব কাব্যভাষা নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
মামুন রশীদের কাব্যজগৎ মানুষের আত্মিক সত্তার এক গভীর ও অন্তহীন অনুসন্ধান। তার কাছে কবিতা মানুষের নিজের ভেতরের পরম অস্তিত্বকে উন্মোচনের এক পবিত্র প্রক্রিয়া। শরীর ও আত্মার চিরন্তন দ্বন্দ্ব, সময়ের আপেক্ষিকতা, ভাষার অবিনশ্বর ক্ষমতা এবং স্মৃতির অবিনশ্বর উপস্থিতি... এই সবকিছুর সুনিপুণ বুননে গড়ে ওঠা তার কাব্যবিশ্ব সমকালীন বাংলা কবিতার মানচিত্রে এক অনন্য, স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত ও চিন্তা উদ্রেককারী আলোকস্তম্ভ হিসেবে স্বমহিমায় থাকবে।

মুহূর্তিক ভাবনার হ্যাজাক হাতে মামুন রশীদ
৪.
বাংলা সাহিত্যের সুদীর্ঘ প্রবহমান কাব্যধারায় কবি মামুন রশীদ এমন এক শব্দশিল্পী, যিনি শব্দের চেনা অবয়ব ভেঙে আত্মিক ও সমকালীন অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে তোলেন এক রহস্যময় অন্তর্জাগতিক ভুবন। কবির নান্দনিক কাব্যবোধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত ‘বুদ্ধপূর্ণিমার রাতে’। এখানে প্রেম, পরম ধর্ম, স্নিগ্ধ প্রকৃতি এবং আধুনিক সভ্যতার হিংস্র ক্রূরতা এক অদ্ভুত মেলবন্ধনে উপস্থিত হয়েছে। প্রারম্ভেই কবি যে গভীর আত্মিক সংশয় উচ্চারণ করেন:
‘দেখা হলে কি করবো? জড়িয়ে ধরবো?’
এটি দুজন প্রেমিক-প্রেমিকার কায়িক বা ব্যক্তিগত ব্যাকুলতা ছাড়িয়ে যান্ত্রিক সভ্যতার গোলকধাঁধায় দিশেহারা মানুষের সাথে মানুষের শাশ্বত ও আন্তরিক মানবিক সম্পর্ক স্থাপনের এক চরম আকুতি। কবি এরপরই বর্তমান সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক বাস্তবতার ভয়াবহ অবক্ষয়কে উন্মোচিত করে লেখেন:
‘খবরের কাগজে শুধু অন্ধকার, বুদ্ধপূর্ণিমার দ্যুতি নেই।’
এখানে দৈনিক খবরের কাগজ আসলে আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার রক্তপাত, যুদ্ধ, ক্ষমতা এবং সহিংসতার প্রতীক। সেখানে মহাত্মা বুদ্ধের করুণা, সহমর্মিতা ও শান্তি রূপী ‘বুদ্ধপূর্ণিমার দ্যুতি’ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। কবিতার শেষাংশে ব্যবহৃত ‘সাপলুডু’ খেলার প্রতীকটি অসামান্য প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। মানুষের ইতিহাস ও সভ্যতা প্রযুক্তিগতভাবে যতই অগ্রগামী হোক না কেন; হিংসা ও বিভেদের সাপের মুখে পড়ে সে বারবার প্রতিনিয়ত মানবীয় করুণার সেই আদিম সূচনাবিন্দুতেই আছড়ে পড়ে। এই চক্রাকারে আবর্তিত মানব সভ্যতার ট্র্যাজেডিই কবিকে ব্যথিত করে তোলে। অন্যদিকে, ‘প্রবাস’ কবিতায় কবি ভূগোলভেদী বাস্তুচ্যুত মানুষের হাহাকারকে ব্যক্তিগত বেদনার গভীরতম তন্তুতে গেঁথেছেন। মানব অস্তিত্বের এক পরম মোহাচ্ছন্ন সত্য উন্মোচিত হয় যখন কবি লেখেন:
‘মুকুরে প্রতিফলিত মুখ কখনো সত্য বলে না।’
এখানে ‘মুকুর’ বা দর্পণ সমাজের আরোপিত পরিচিতি ও কৃত্রিমতার রূপক। মানুষ যে সামাজিক পরিচয় বা নাম ধারণ করে ঘুরে বেড়ায়, তা তার সত্যিকারের আত্মিক অস্তিত্বকে প্রকাশ করতে পারে না। পরিযায়ী পাখির ব্যাকুলতা, শরণার্থী শিবিরের ধূলিমলিন বাতাস, চৈতালিয়া রুক্ষ হাওয়ায় ঝরে পড়া শুষ্ক পাতা এবং নিষ্পাপ শিশুদের চোখ... এইসব জটিল চিত্রকল্পের সুনিপুণ বুননে তৈরি হয় প্রবাসের আসল মানসিক যন্ত্রণার মানচিত্র। কবির চেতনায় প্রবাস হলো নিজের শেকড় ও মূল আত্মপরিচয় হারানোর এক দীর্ঘ, নিঃশব্দ ও মরমী যন্ত্রণা।
স্থানিক ও মানসিক ভৌগোলিক সীমানাকে আরও বিস্তৃত করে তোলে ‘সীমান্তের ওপারে’ কবিতাটি। এখানে সীমান্ত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক রূপক। নগরায়নের অন্ধ উন্মাদনা ও বিশুদ্ধ প্রকৃতির বন্দিশালাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে কবি লেখেন:
‘তুমি তো সূর্যাস্ত দেখোনি, আকাশছোঁয়া ইমারত তোমার প্রিয়।’
আধুনিক মানুষ প্রগতির মোহে ইট-কাঠের সুউচ্চ প্রাচীরে নিজেকে বন্দি করে প্রকৃতির পরম সৌন্দর্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অথচ মানুষের প্রকৃত আত্মিক জীবন লুকিয়ে থাকে সুরভিত বকুল, লাল পলাশ, পরম পবিত্রময় তুলসীতলা, দীপাবলির আলোকিত সন্ধ্যা কিংবা জনারণ্যের নীরব একাকিত্বে। এই কবিতা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের প্রিয় স্বদেশ শুধু রাজনৈতিক মানচিত্রে খোদাই করা থাকে না; তা গড়ে ওঠে মানুষের রক্তে বহমান স্মৃতি, অনুভূতি, সংস্কৃতি ও আত্মিক উত্তরাধিকারের অমলিন পলিমাটিতে।
মামুন রশীদের কাব্যশৈলী ও শব্দচয়ন বাংলা আধুনিক কবিতার অঙ্গনে এক সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত অধ্যায় রচনা করেছে। তার কবিতার গদ্যছন্দের প্রবাহ এতই স্বতঃস্ফূর্ত যে, সেখানে কোনো যান্ত্রিক গদ্যের একঘেয়েমি স্পর্শ করতে পারে না। বাক্যের ভেতরে সুপ্ত ছন্দ, নিখুঁত বিরতি, বৈচিত্র্যময় পুনরাবৃত্তি এবং শব্দ উচ্চারণের অভ্যন্তরীণ সুরলহরী তার গদ্যকবিতাকে নদীর মতো সচল ও প্রবহমান করেছে।
তার প্রতীকের ব্যবহার এক অনন্য বহুমাত্রিকতায় ঋদ্ধ। একই প্রতীক স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তার বিভিন্ন কবিতায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নতুন ভাবের দ্যোতনা তৈরি করে। তার কবিতার বহুমাত্রিক গভীরতার পেছনে রয়েছে সুনিপুণ আন্তঃপাঠিকতার মেলবন্ধন। ঐতিহাসিক জুলেখা, শতবর্ষের বামিয়ান, নিপীড়িত ফিলিস্তিন, পরম পবিত্র বুদ্ধপূর্ণিমা, শেক্সপীয়রের ক্যালিবান, মুঘল সম্রাট আকবর বাদশাহ, বিলুপ্ত ডোডোপাখি, চঞ্চল রাজহাঁস কিংবা সুপ্রাচীন অলৌকিক শঙ্খের অনুষঙ্গ তার কাব্যকে বহুস্তরীয় দার্শনিক অর্থে সমৃদ্ধ করেছে।
বাংলা কবিতার সমৃদ্ধ মানচিত্রে মামুন রশীদ কোনো অন্ধ অনুকরণকারী নন। তিনি রবীন্দ্রনাথের সর্বপ্রাণবাদী মানবতাবাদ, জীবনানন্দের গভীর নির্জন স্মৃতিমগ্নতা, শামসুর রাহমানের শাণিত নাগরিক চেতনা কিংবা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উন্মার্গ অস্তিত্ববোধ থেকে আধুনিক আত্মস্থ রস গ্রহণ করলেও, তার লেখনীর স্বর স্বতন্ত্র। তার মৌলিকতার মূল ভিত্তিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
গদ্যকবিতার স্বাভাবিক ও প্রাঞ্জল প্রবাহ বজায় রাখা, গভীর দার্শনিক চিন্তাকে ব্যক্তিগত কোমল অনুভূতির সাথে একীভূত করা, বাস্তব ও পরাবাস্তবের মধ্যে কোনো দৃশ্যমান কৃত্রিম রেখা না রেখে স্বাভাবিক সংযোগ স্থাপন করা, দীর্ঘ বাক্যের অলৌকিক সুরময়তায় কাব্যভাষা নির্মাণ করা এবং অভিনব প্রতীকের সাহায্যে প্রেম, স্মৃতি ও ইতিহাসকে একই কাব্যিক বয়ানে ধারণ করা। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই তাকে সমকালীন বাংলা কবিতার ধারায় এক অনন্য, অপরিহার্য ও শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
বলা যায় যে, প্রথম পাঠে যেসব পঙ্ক্তি দুর্বোধ্য বা কুয়াশাচ্ছন্ন মনে হয়, পুনঃপাঠে সেই পঙ্ক্তিগুলোই ধারণ করে নতুন কোনো কাব্যিক আলো। তার কবিতায় প্রেম আছে, কিন্তু তা সস্তা রোমান্টিকতায় বন্দি নয়; স্মৃতি আছে, কিন্তু তা শুধু পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা নস্টালজিয়া নয়; ইতিহাস আছে, কিন্তু তা শুষ্ক তথ্যের তালিকা নয়; দর্শন আছে, কিন্তু তা কোনো নীরস বিমূর্ত তত্ত্ব নয়; এবং ভাষা আছে, যা যোগাযোগের প্রাত্যহিক সীমা পেরিয়ে অস্তিত্বের শেষ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। কবির সৃষ্টি পাঠককে নিত্যনতুনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে শেখায়। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, কবিতা অনুভূতির এক অন্তর্জাগতিক অনন্ত অভিযাত্রা। সে কারণেই তার কবিতা পাঠকের কাছ থেকে গভীর মনোযোগ, অপরিসীম ধৈর্য এবং বারবার পুনঃপাঠ দাবি করে।
মামুন রশীদের সমগ্র কাব্যজগৎ একদিকে যেমন ব্যক্তিগত জীবনানুভূতির পরম নির্জন স্বাক্ষর, অন্যদিকে তা আধুনিক মানুষের জটিল অস্তিত্বসংকটের এক মহাবিস্ময়িক ভাষ্য। প্রেম, স্মৃতি, ভাষা, সময়, শরীর, আত্মা, ইতিহাস, প্রকৃতি ও নগর সভ্যতার বর্ণিল অভিজ্ঞতার আলো-ছায়া তার লেখনীতে এমনভাবে একাকার হয়েছে যে, প্রতিটি কবিতাই এক একটি স্বাধীন নন্দনতাত্ত্বিক অলৌকিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়েছে। তার নির্মিত কাব্যভাষা দৃশ্য ও দর্শনকে, প্রেম ও ইতিহাসকে, বাস্তব ও পরাবাস্তবকে এবং শরীর ও আত্মাকে এক পরম সংলাপে যুক্ত করেছে। তার কবিতা পড়ে মনে হয়, সমকালীন বাংলা কবিতায় এখনো নতুন ভাবনা, নতুন নান্দনিক প্রতীক এবং আত্মিক দর্শনের সম্ভাবনা অম্লান ও দীপ্তিময়। মামুন রশীদের কবিতা মূলত মানুষের এই অনন্ত মহাবিশ্বে বেঁচে থাকার গভীরতম ও পবিত্রতম অভিজ্ঞতার অবিনশ্বর রূপ।
এসইউ
What's Your Reaction?
