মিথুন আহমেদের গল্প: ঠিকানা

মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।ছলাৎ ছলাৎ শব্দে আম গাছের ঝুলে পড়া ডাল ল্যাম্পপোস্টের সাথে বারি খাচ্ছে। আগাম বাদলের এই হিংস্রতায় গলির ল্যাম্পপোস্টটা টলমল করছে—কিন্তু পড়ছে না। একরোখা, জেদি। টিউশনি শেষে বাসায় ফেরার পথে আটকে গেলাম করিম কাকার দোকানে। দোকানে ঢুকতে ঢুকতেই দেখলাম—কাকা বাইরে মুখ করে গলা খাঁকারি দিচ্ছেন। কাউকে ডাকছেন। দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি, রাস্তার ওপাশে ভাঙা বেঞ্চিতে একজন বয়স্ক মহিলা বসে আছেন। বৃষ্টিতে ভিজছেন। নিস্তেজ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন কোথাও—যেন দেখছেন না, শুনছেন না। প্রচণ্ড বৃষ্টিও তার স্নায়ু ছুঁতে পারছে না। আমার ভেতরে কী একটা নড়ে উঠলো। মাঝে মাঝে বজ্রপাত হচ্ছে। ভয়ও লাগছে।করিম কাকাকে বললাম, ‘কাকা, ছাতা আছে?’কাকা মাথা নাড়লেন, ‘না তো বাপ।’পাশে দাঁড়ানো এক কাস্টমার চুপচাপ একটা ছাতা এগিয়ে দিলেন। ধন্যবাদ দিয়ে বৃষ্টির ভেতরে নামলাম। ‘আন্টি শুনছেন? এই যে! বৃষ্টিতে ভিজে কী অবস্থা হয়েছে আপনার দেখেছেন? তীব্র বজ্রপাত হবে মনে হচ্ছে, উঠুন...’কোনো সাড়া নেই। হাতে তৈরি একটা রোবটের মতো, প্রোগ্রাম করা নেই বলেই সাড়া দেবেন না, এ কথা যেন শরীরটা জানে। কথা না বাড়িয়ে ছাতাটা তার মাথার ওপর ধরল

মিথুন আহমেদের গল্প: ঠিকানা

মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।
ছলাৎ ছলাৎ শব্দে আম গাছের ঝুলে পড়া ডাল ল্যাম্পপোস্টের সাথে বারি খাচ্ছে। আগাম বাদলের এই হিংস্রতায় গলির ল্যাম্পপোস্টটা টলমল করছে—কিন্তু পড়ছে না। একরোখা, জেদি।

টিউশনি শেষে বাসায় ফেরার পথে আটকে গেলাম করিম কাকার দোকানে। দোকানে ঢুকতে ঢুকতেই দেখলাম—কাকা বাইরে মুখ করে গলা খাঁকারি দিচ্ছেন। কাউকে ডাকছেন। দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি, রাস্তার ওপাশে ভাঙা বেঞ্চিতে একজন বয়স্ক মহিলা বসে আছেন। বৃষ্টিতে ভিজছেন। নিস্তেজ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন কোথাও—যেন দেখছেন না, শুনছেন না। প্রচণ্ড বৃষ্টিও তার স্নায়ু ছুঁতে পারছে না। আমার ভেতরে কী একটা নড়ে উঠলো। মাঝে মাঝে বজ্রপাত হচ্ছে। ভয়ও লাগছে।
করিম কাকাকে বললাম, ‘কাকা, ছাতা আছে?’
কাকা মাথা নাড়লেন, ‘না তো বাপ।’
পাশে দাঁড়ানো এক কাস্টমার চুপচাপ একটা ছাতা এগিয়ে দিলেন। ধন্যবাদ দিয়ে বৃষ্টির ভেতরে নামলাম।

‘আন্টি শুনছেন? এই যে! বৃষ্টিতে ভিজে কী অবস্থা হয়েছে আপনার দেখেছেন? তীব্র বজ্রপাত হবে মনে হচ্ছে, উঠুন...’
কোনো সাড়া নেই। হাতে তৈরি একটা রোবটের মতো, প্রোগ্রাম করা নেই বলেই সাড়া দেবেন না, এ কথা যেন শরীরটা জানে। কথা না বাড়িয়ে ছাতাটা তার মাথার ওপর ধরলাম। নিজেও একটু ঢুকে গেলাম ছাতার নিচে। বৃষ্টির ফোঁটা পড়া বন্ধ হতেই তিনি কেমন মৃদু কাঁপতে লাগলেন। ভালো লাগল—অন্তত শারীরিক প্রতিক্রিয়ায় ফিরেছেন। খারাপ লাগল—ঠান্ডায় একেবারে জমে গেছেন।

তার কোলের ওপর দেখি, একটা পলিথিনে মোড়ানো ছোট্ট প্যাকেট। দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরা—যেন এটুকুই এখন তার পৃথিবী। তিনি পৃথিবীকে আঁকড়ে ধরে আছেন। এই পৃথিবী হাতছাড়া হলে তিনিও পৃথিবী ছাড়া হবেন।

২.
কোনোরকমে তাকে ধরে দোকানের ভেতরে নিয়ে এলাম। করিম কাকা একটা মোড়া এগিয়ে দিলেন। গরম চায়ের কাপ হাতে দিলেন। কিন্তু তিনি নিলেন না। শুধু বসলেন। চুপ করে।
করিম কাকা আমার কানের কাছে এসে আস্তে বললেন, ‘বাপ, এই মহিলা তিন ঘণ্টা ধইরা ওখানে বইসা রইছে। আমি কতবার ডাকছি। কথা কয় না। ঠিকানা জিগাইলে চুপ। নাম জিগাইলে চুপ। আমার মনে হইতেছে কোথাও থেকে আইসা এখানে বইসা পড়ছে। বাসও মিস করছে মনে হয়।’

তখনই দোকানের দরজায় একটা রিকশা এসে থামল। ভেজা লুঙ্গি, মাথায় গামছা পেঁচানো; বছর পঞ্চাশ মতো একটা লোক হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকলেন।
‘রাহেলা মামি!’ গলাটা কেঁপে উঠল লোকটার।
রাহেলা বেগম ধীরে মাথা তুললেন। এই প্রথম। চোখে কোনো চমক নেই, তবু চিনলেন মনে হয়। লোকটা এগিয়ে এসে মাটিতে প্রায় বসে পড়লেন। হাঁটু মুড়ে।
‘মামি, আপনে এইহানে? আমি কতক্ষণ ধইরা খুঁজতেছি... বাস থাইকা নামলেন কই? কইলাম না, বাস থামলে আমারে ডাকবেন?’

রাহেলা বেগম কোনো কথা বললেন না। শুধু পলিথিনের প্যাকেটটা আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরলেন। করিম কাকা আমার দিকে তাকালেন। আমি লোকটার দিকে।
‘আপনি কি ওনাকে চেনেন?’
লোকটা মাথা তুললেন। চোখ দুটো লাল।
‘চিনি না মানে? আমার মামি উনি।’

৩.
লোকটার নাম জব্বার। রাহেলা বেগমের স্বামীর দূরসম্পর্কের ভাগিনা। ঢাকায় থাকেন—গার্মেন্টসের সুপারভাইজার।
করিম কাকা আরেক কাপ চা বানালেন। বৃষ্টি একটু কমেছে। জব্বার চেয়ারে বসে হাতের আঙুলে আঙুল মেলাতে লাগলেন; কথা বলার আগে মানুষ যেভাবে নিজেকে গুছিয়ে নেয়। রাহেলা বেগমের গল্পটা বেরিয়ে এলো টুকরো টুকরো করে।

সিরাজগঞ্জের চৌহালীর কাছে একটা গ্রাম—দিথপুর।
যমুনার চরঘেঁষা তীরে। বর্ষায় ভাঙে, শীতে আবার জেগে ওঠে। এই ভাঙা-গড়ার মাটির সাথেই সেখানে মানুষের জীবন।

রাহেলা বেগমের স্বামী আলতাফ মিয়া ছিলেন মাঝারি কৃষক। দুই বিঘা জমি, একটা ঘর, একটা গরু। তাতেই সংসার চলতো। ছেলে একটা; নাম রফিক। মেয়ে একটা; নাম মুক্তা। রফিক পড়াশোনায় ভালো ছিল। দারুণ মেধাবী। গ্রামের স্কুলমাস্টার বলেছিলেন, ‘এই ছেলেরে ঢাকা পাঠান। বড় হবে।’

আলতাফ মিয়া জমি বন্ধক রেখে ছেলেকে ঢাকায় পাঠালেন। পড়াশোনায় ভালো রফিক, একটা সময় ভালো জব পেলো। শহুরে প্রেয়সীর প্রেমে মজে বিয়ে করে নিলো বাবা-মা কে না জানিয়েই। বাবাকে জানাল ফোনে, একটু দ্রুত কণ্ঠে। আলতাফ মিয়া কিছু বললেন না। শুধু বললেন, ‘ভালো থাকিস।’
ফোন রাখার পর রাহেলা বেগম দেখলেন, তার স্বামীর চোখের কোণে একটু জল। সেটাই শেষ।

এরপর একদিন। ভোরবেলা, ফজরের আজানের পর নামাজ পড়ে আলতাফ মিয়া ঘুমাতে গেলেন। বুকের মধ্যে তার কেমন যেন করছিলো। সাতটার মধ্যে ঘুম থেকে ওঠা আলতাফ মিয়া সেদিন দুপুর হয়ে গেলেও ঘুম থেকে ওঠার নামগন্ধ নেই। প্রথমে ঘুমুচ্ছে, ঘুমাক—এটা ভেবে পাত্তা না দিলেও শেষে রাহেলা বেগম স্বামীকে ডাকতে কাছে যেতেই বুঝলেন, সব শেষ। চৌহালীর যমুনার বাতাস একটা মানুষকে নিয়ে গেছে। রেখে গেছে শুধু এক টুকরো মাংস।

রফিককে ফোন করা হলো। রফিক এলো একদিন পর। জানাজায় শামিল হলো। তারপর চলে গেল, দুদিনের মাথায়। যাওয়ার আগে বলল, ‘মা, তুমি মুক্তার শ্বশুরবাড়িতে থেকো কিছুদিন।’

৪.
মুক্তার বিয়ে হয়েছিল পাশের গ্রামে—কাশেম ফকিরের ছোট ছেলে সিরাজের সাথে। বিয়েতে যৌতুক লেগেছিল—নগদ পঞ্চাশ হাজার, একটা মোটরসাইকেল। আলতাফ মিয়া দিয়েছিলেন। জমির দলিল আরও একবার গিয়েছিল মহাজনের কাছে।
মুক্তা সুখে ছিল কি না রাহেলা বেগম সেটা নিজেও জানতেন না ভালো করে। মেয়ে মুখ খুলতো না। চোখের তলায় মাঝে মাঝে কালি দেখতেন। জিজ্ঞেস করলে বলতো, ‘ঘুম কম হয়েছে, মা।’
মায়েরা এসব দেখেন। মায়েরা এসব বোঝেনও। কিন্তু সমাজের দেওয়াল এত পুরু, বোঝা আর বলা এক নয়।

আলতাফ মিয়ার মৃত্যুর পর রাহেলা বেগম মুক্তার শ্বশুরবাড়িতে গেলেন। প্রথম সপ্তাহে কেউ কিছু বলল না। দ্বিতীয় সপ্তাহে শাশুড়ি বললেন, ‘বিধবা মানুষ ঘরে থাকলে অমঙ্গল।’ তৃতীয় সপ্তাহে সিরাজ বলল, ‘আপনার ছেলে ঢাকায় আছে। তার কাছে যান।’ রাহেলা বেগম সেই রাতে মুক্তার হাত ধরে বললেন, ‘মা, তুই কি ভালো আছিস?’ মুক্তা কাঁদলো। বুকফাটা কান্না। কিন্তু একটা কথাও বলল না।

পরদিন সকালে রাহেলা বেগম উঠলেন। পলিথিনের একটা ব্যাগে কিছু কাপড়, একটা ছবি—আলতাফ মিয়ার সাথে তোলা একমাত্র ছবি। আর মুক্তার ছোটবেলার একটা চুলের বিনুনি যেটা রাহেলা বেগম বিয়ের পর থেকে নিজের কাছে যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। ব্যাগে ভরলেন। বেরিয়ে পড়লেন।

গ্রামে ফিরে গেলে কী হবে? নিজের বাড়িটা এখন নিজের নয়। আলতাফ মিয়ার মৃত্যুর এক মাসের মাথায় দেবর করিম মিয়া গ্রামের মাতব্বর মোফাজ্জল সাহেবের সাথে মিলে তার স্বামীর রেখে যাওয়া শেষ সম্বল কৌশলে কব্জা করে নিয়েছেন। রাহেলা বেগমের ঘরটাও সেই জমির ওপরে। তিনি ঘরহারা হননি এখনো। কিন্তু ঘরের মালিক এখন আর তিনি নন।

রফিককে ফোন করেছিলেন প্রতিবেশীর মোবাইল থেকে। রফিক বলেছে, ‘মা, আমি এখন কিছু করতে পারবো না। বাসায় ঝামেলা চলছে। তুমি কিছুদিন মানিয়ে নাও।’
রাহেলা বেগম ফোন রেখে দিয়েছিলেন।

মানিয়ে নেওয়া মানুষের কথা। যাদের মানানোর মতো কিছু আছে, তারা মানায়। তার তো কিছুই নেই এখন। তাই এসেছেন ঢাকায়। ছেলের কাছে যাবেন। ছেলেকে একটু দেখবেন, সরাসরি।

৫.
জব্বার চুপ করলেন। দোকানে পিনপতন নীরবতা। বৃষ্টি থেমে এসেছে। শুধু টিনের চালে টপটপ করে পড়ছে কিছু বিচ্ছিন্ন ফোঁটা।

আমি রাহেলা বেগমের দিকে তাকালাম। তিনি এতক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এখন মুখ তুললেন। আমার চোখে চোখ পড়ল। সেই দৃষ্টিতে কোনো কান্না নেই। কোনো অভিযোগ নেই। শুধু একটা অদ্ভুত শান্তি—যে শান্তি মানুষের হয়; যখন সে সব হারিয়ে ফেলে এবং হারানোর মতো আর কিছু না থাকায় ভয়টাও চলে যায়।
তিনি আস্তে বললেন, প্রথমবারের মতো—‘বাবা, রফিকের বাসাটা কোনদিকে জানো?’

গলার স্বরটা এত শান্ত, এত ক্লান্ত, যেন অনেকদিন ব্যবহার না করা একটা দরজা সামান্য ফাঁক হলো। জব্বার সামনে এগিয়ে এলেন। হাত ধরলেন তার।
‘মামি, আমি নিয়ে যাবো। আজকে রাতে আমার বাসায় থাকেন। কাল সকালে রফিকের কাছে যাবো।’

রাহেলা বেগম কোনো কথা বললেন না। শুধু পলিথিনের প্যাকেটটা একটু আলগা করলেন। ভেতর থেকে বের করলেন সেই ছবিটা—বৃষ্টিতে কিছুটা ভিজে গেছে, কিন্তু মুখটা চেনা যাচ্ছে। আলতাফ মিয়া হাসছেন। তরুণ বয়সের ছবি। রাহেলা বেগম পাশে। তিনি ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকালেন কিছুক্ষণ। তারপর বুকের কাছে চেপে ধরলেন।

৬.
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম। করিম কাকা ধীরে চুলায় জল চাপালেন। রাতের শেষ চা।
বৃষ্টি থামল। আকাশের এক কোণে মেঘ সরে গিয়ে একটু চাঁদ উঠল—পুরো নয়, অর্ধেক। যেন লুকিয়ে দেখছে। জব্বার রিকশা ডাকতে গেলেন। রাহেলা বেগম উঠে দাঁড়ালেন। পা দুটো কাঁপছে একটু। তবু দাঁড়ালেন। বাইরে পুডিং পাকানো মাটিতে বৃষ্টির পানি জমে আছে। ল্যাম্পপোস্টের আলো সেই পানিতে প্রতিফলিত হচ্ছে, কাঁপা কাঁপা।

তিনি একবার পেছনে তাকালেন। আমার দিকে। কিছু বললেন না। কিন্তু সেই তাকানোতে একটা কথা ছিল; হয়তো ধন্যবাদ, হয়তো শুধুই স্বীকৃতি—‘তুমি ছাতা ধরেছিলে, আমি টের পেয়েছি।’
রিকশা এলো। জব্বার হাত ধরে তুলে দিলেন তাঁকে। রিকশা চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
করিম কাকা পেছন থেকে ডাকলেন, ‘চা খাইবা বাপ?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ কাকা, দিন।’
কিন্তু মাথার ভেতরে তখনো ঘুরছে একটাই শব্দ—ঠিকানা।

যেই বর্ষার কাজ, শুধু ভিজিয়ে ফেরা;
সেই বর্ষা কি কখনো রোদের বন্ধু হয়?
বর্ষারা আসে, ভিজে, ভিজায় সবটা ধরা—
অন্তরীক্ষ মেঘমুক্ত হলে তারা কোথায় যায়?

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow