‘মিশরে বৈধ প্রবাসী মারা গেলে দাফন হবে বিনামূল্যে’
মিশরের রাজধানী কায়রোর পূর্বাঞ্চলীয় উবুর এলাকায় বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য নির্ধারিত কবরস্থান পরিদর্শন করেছেন মিশরে নবনিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গৌতম কুমার দে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দূতাবাসের শ্রম সচিব মো. জাকির হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি কবরস্থানটি পরিদর্শন করেন। এ সময় সেখানে সমাহিত বাংলাদেশিদের কবর জিয়ারত ও তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়। পরিদর্শনকালে কবরস্থানের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত। মাত্র ৬০ বর্গমিটার আয়তনের এই কবরস্থানে বর্তমানে আর দুই থেকে তিনটি মরদেহ দাফনের মতো জায়গা অবশিষ্ট রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে ভবিষ্যতে কবরস্থানটি সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আরও পড়ুন ইতালিতে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা, উদ্বেগে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ১৯৭৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মিশর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকেই কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে দেশটিতে বসবাস করে আসছেন হাজারো বাংলাদেশি। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে অনেক বাংলাদেশি অসুস্থতা, বার্ধক্য কিংবা দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। মিশরে মৃত্যুবরণকা
মিশরের রাজধানী কায়রোর পূর্বাঞ্চলীয় উবুর এলাকায় বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য নির্ধারিত কবরস্থান পরিদর্শন করেছেন মিশরে নবনিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গৌতম কুমার দে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দূতাবাসের শ্রম সচিব মো. জাকির হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি কবরস্থানটি পরিদর্শন করেন। এ সময় সেখানে সমাহিত বাংলাদেশিদের কবর জিয়ারত ও তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়।
পরিদর্শনকালে কবরস্থানের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত। মাত্র ৬০ বর্গমিটার আয়তনের এই কবরস্থানে বর্তমানে আর দুই থেকে তিনটি মরদেহ দাফনের মতো জায়গা অবশিষ্ট রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে ভবিষ্যতে কবরস্থানটি সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
১৯৭৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মিশর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকেই কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে দেশটিতে বসবাস করে আসছেন হাজারো বাংলাদেশি। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে অনেক বাংলাদেশি অসুস্থতা, বার্ধক্য কিংবা দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
মিশরে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশিদের স্থানীয়ভাবে দাফনের জন্য নির্দিষ্ট কবরস্থান না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে মরদেহ দাফন ও দেশে পাঠানো নিয়ে দূতাবাস ও প্রবাসী কমিউনিটিকে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এই পরিস্থিতির অবসানে ২০২২ সালে কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাংলাদেশি দানশীল ব্যক্তি কায়রোর পূর্বদিকে সরকারিভাবে নির্ধারিত উবুর এলাকায় ৬০ বর্গমিটার জায়গা কবরস্থান হিসেবে ক্রয় করে দেন।
ওই বছরের ১২ মে বরিশালের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ নামে এক মিশরপ্রবাসী বাংলাদেশি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নাসের সিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। পরে তাকে এই কবরস্থানে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে দাফন করা হয়। এরপর থেকে একে একে আরও নয়জন বাংলাদেশি প্রবাসী ও শিক্ষার্থীকে সেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
গত ৩ আগস্ট মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গৌতম কুমার দে। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনি কবরস্থানটি পরিদর্শন করেন। এ সময় কায়রো আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক প্রফেসর শাহজাহান ভূঁইয়া এবং মিশরে জাগো নিউজ প্রতিনিধি আফছার হোসাইনও উপস্থিত ছিলেন।
কবরস্থানে পৌঁছালে স্থানীয় মসজিদের ইমাম শাইখ সাঈদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে স্বাগত জানান। পরে তিনি উবুর এলাকার বিশাল ‘ডেড সিটি’ বা ‘মৃত্যুপুরী’ এবং সেখানে অবস্থিত বাংলাদেশি কবরস্থানটি ঘুরে দেখান।
কবরস্থানে প্রবেশের পর সেখানে সমাহিত বাংলাদেশিদের কবর জিয়ারত করে তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়। পরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত বিভিন্ন কবরের পরিচয় জানতে চাইলে স্থানীয় ইমাম শাইখ সাঈদ কবরগুলোতে সমাহিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন।
এ সময় তিনি জানান, ৬০ বর্গমিটার আয়তনের এই কবরস্থানে বর্তমানে আর মাত্র দুই থেকে তিনটি মরদেহ দাফনের মতো জায়গা রয়েছে। পরবর্তীতে আগের কবরগুলো পুনরায় খনন করে একই স্থানে নতুন মরদেহ দাফনের প্রয়োজন হতে পারে।
কবরস্থান সম্প্রসারণের বিষয়ে শ্রম সচিব মো. জাকির হোসেন ও অধ্যাপক শাহজাহান ভূঁইয়ার সঙ্গে আলোচনা করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত। কবরস্থানটি ক্রয় করে দেওয়া দানশীল ব্যক্তি এবং প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে আলোচনা করে এর পরিধি বাড়ানোর সম্ভাব্য উপায় খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
দূতাবাস কর্মকর্তারা এ সময় বাংলাদেশ কবরস্থানের পাশের কয়েকটি মিশরীয় মাকবারায় প্রবেশ করে প্রাচীন মিশরীয় রিতি অনুযায়ী কীভাবে দাফন করা হয় তাও দেখেন।
বিনা খরচে দাফনের সুযোগ
এই প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গৌতম কুমার দে জানান, মিশরের যে কোনো শহর বা এলাকায় কোনো বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী মৃত্যুবরণ করলে তার মরদেহ কায়রোর এই বাংলাদেশি কবরস্থানে বিনা খরচে দাফন করা যাবে।
তিনি জানান, এজন্য মৃত ব্যক্তির পাসপোর্টের কপি, ডেথ সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসে আবেদন করতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর দূতাবাসের পক্ষ থেকে কবরস্থানের তত্ত্বাবধায়ক আবু ইউসুফ আল-তালবিকে কবর খননের অনুমতি দেওয়া হবে।
তবে কবর খনন ও মরদেহ দাফনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক বা গোরখোদকের ব্যবস্থা মৃত ব্যক্তির পরিবারকেই করতে হয় বলে জানান তিনি।
কবরস্থান পরিদর্শন শেষে কায়রো আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক প্রফেসর শাহজাহান ভূঁইয়া বলেন, প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশিদের নিজ দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী দাফনের ব্যবস্থা দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।
তিনি বলেন, আগে মিশরে কোনো বাংলাদেশি প্রবাসী মৃত্যুবরণ করলে নানা জটিলতার কারণে মরদেহ দেশে পাঠাতে দীর্ঘ সময় লেগে যেত। মিশরের আইনি জটিলতার পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা এবং মরদেহ দেশে পাঠানোর জন্য অতিরিক্ত বিমান ভাড়া জোগাড় করা—সব মিলিয়ে অনেক সময় দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাসও প্রবাসীর মরদেহ হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকত।
তিনি আরও বলেন, এখন নিজস্ব একটি কবরস্থানে প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশিদের মরদেহ নিজ দেশের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন করা হচ্ছে- এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির বিষয়। কবরস্থানটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া এবং জায়গাটি ক্রয় করে দেওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দানশীল ব্যক্তির প্রতি মিশরপ্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিক ধন্যবাদ জানান প্রফেসর শাহজাহান ভূঁইয়া।
মিশরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য এই কবরস্থান শুধু একটি দাফনস্থল নয়; বরং প্রবাসজীবনের শেষ প্রান্তে নিজ দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী মর্যাদাপূর্ণ বিদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।
এমআরএম
What's Your Reaction?
