রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কেনায় ভারতের ওপর বেজায় ক্ষেপেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘বন্ধু রাষ্ট্রের’ রপ্তানি পণ্যে মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন তিনি। আর এতেই মাথায় ভারতীয় রপ্তানিকারকদের। তাদের অনেকেই এখন পণ্য তৈরি তো দূরে থাক, শ্রমিকদের বেতন দেবেন কীভাবে, তা নিয়ে মহা দুশ্চিন্তায় আছেন।
ভারতের অন্যতম বৃহৎ গার্মেন্টস কোম্পানি ও রপ্তানিকারক হলো তামিলননাড়ুর তিরুপপুরে এন কৃষ্ণমূর্তির পোশাক কারখানা। কিন্তু এখন সেখানে অদ্ভুত এক নীরবতা। ভারতের অন্যতম বৃহৎ এই রপ্তানি কেন্দ্রের প্রায় ২০০টি সেলাই মেশিনের মধ্যে চলছে কেবল অল্প কয়েকটি। শ্রমিকরা যুক্তরাষ্ট্রের বড় খুচরা বিক্রেতাদের জন্য শিশুদের পোশাকের শেষ অর্ডার শেষ করছেন।
রুমের একপাশে নতুন ডিজাইনের কাপড়ের নমুনা ধুলোয় ঢেকে যাচ্ছে। এসব পণ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ৫০ শতাংশ শুল্ক বৃদ্ধির আওতায় পড়েছে, যা বুধবার (২৭ জুলাই) থেকে কার্যকর হতে চলেছে।
ভারত যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণে পণ্য রপ্তানি করে, যা মধ্যে পোশাক, চিংড়ি, রত্ন ও গয়না উল্লেখযোগ্য। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অতিরিক্ত শুল্ক ভারতীর পণ্যের ওপর কার্যত অবরোধ তৈরি করেছে।
তিরুপপুর একাই ভারতের ১৬০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানির এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে। এসব তৈরি পোশাকের মূল গ্রাহক ছিল- জারা, ওয়ালমার্ট, গ্যাপ, টার্গেটের মতো ব্র্যান্ড। কিন্তু এখন এই বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাপক শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষ্ণমূর্তি বলেন, সেপ্টেম্বরের পর হয়তো আমাদের আর কোনো কাজই থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকরা সব অর্ডার বাতিল করেছেন। শুল্ক ঘোষণার আগে তিনি কারখানা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত তা করতে হয়েছে ও ২৫০ শ্রমিককে ছাঁটাই করতে হয়েছে।
এদিকে, শুল্ক বৃদ্ধির সময়টিও ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন। কারণ বার্ষিক বিক্রির প্রায় অর্ধেকই বড়দিনের আগে হয়। ফলে অনেক কারখানা এখন টিকে থাকার আশায় স্থানীয় বাজার ও দীপাবলি মৌসুমের দিকে ঝুঁকছে।
অন্য এক অন্তর্বাস তৈরির কারখানায় দেখা গেছে, প্রায় ১০ লাখ ডলারের পণ্য মজুত পড়ে আছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য তৈরি হলেও এখন ক্রেতা নেই।
রাফট গার্মেন্টসের মালিক শিবা সুব্রামানিয়াম বলেন, আমরা আশা করছিলাম, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করবে। কিন্তু গত মাস থেকে পুরো উৎপাদন চেইন থমকে আছে। এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিকদের বেতন দেব কীভাবে?
হিসাব করে দেখা গেছে, শুল্ক হার ৫০ শতাংশ হলে আগে ১০ ডলারে বিক্রি হওয়া ভারতীয় একটি শার্টের দাম দাঁড়াবে ১৬ দশমিক ৪ ডলার। অথচ চীনা শার্টের দাম হবে ১৪ দশমিক ২ ডলার, বাংলাদেশের ১৩ দশমিক ২ ডলার আর ভিয়েতনামের হবে মাত্র ১২ ডলার। এমনকি, শুল্ক কমে ২৫ শতাংশ হলেও ভারত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকবে।
আপাতত এই প্রভাব কমাতে সরকার কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে ও অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা জোরদার করেছে। তবে অনেকের আশঙ্কা, এসব পদক্ষেপ অনেক দেরিতে নেওয়া হচ্ছে।
গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, আমরা দেখতে পাবো যে বাণিজ্যের প্রবাহ বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা চলে যাবেন মেক্সিকো, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের দিকে।
হীরার ব্যবসায় ধস
মুম্বাই থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরের এক্সপোর্ট জোনে শত শত শ্রমিক হীরা ঘষামাজা ও প্যাকেটজাত করতে ব্যস্ত। এখান থেকেই ভারতের ১০০০ কোটি ডলারের রত্ন ও গয়না রপ্তানি হয়। কিন্তু সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলারের গয়না রপ্তানি করা হবে। এই রপ্তানিতে নতুন শুল্কের প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা।
ক্রিয়েশন জুয়েলারির স্বত্বাধিকারী আদিল কোটওয়াল জানান, কয়েক মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি করা বাজার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তার হীরাখচিত গয়নার ৯০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হয়।
কোটওয়ালের ব্যবসা মাত্র ৩-৪ শতাংশ মুনাফার ওপর দাঁড়িয়ে। অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক বসলে তা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। তিনি বলেন, এই শুল্ক কে বহন করবে? যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রেতারাও সেটা পারবেন না।
তিনি হীরা সংগ্রহ করেন গুজরাটের সুরাট থেকে, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় হীরা কাটা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্র। তবে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া ও ল্যাবে উৎপন্ন হীরার কারণে শুল্ক আরোপের আগেই সেখানে সংকট তৈরি হয়েছিল। এখন শুল্ক দ্বিগুণ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন ক্রেতারা সরে যাওয়ায় প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ করা হীরক কারখানাগুলো মাসে মাত্র ১৫ দিন চালু থাকে। তাছাড়া শত শত চুক্তিভিত্তিক শ্রমিককে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
সুরাটের শহরতলির একটি কারখানার এক শ্রমিক বলেন, এখানে একসময় ভীষণ কর্মচাঞ্চল্য ছিল। তবে গত কয়েক মাসে অনেককে ছাঁটাই করা হয়েছে। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।
কারখানার মালিক শৈলেশ মাঙ্গুকিয়া জানান, একসময় তার কারখানায় ৩০০ শ্রমিক কাজ করতেন। কিন্তু এখন রয়েছেন মাত্র ৭০ জন। প্রতি মাসে আগে যেখানে ২ হাজার হীরা ঘষামাজা করা হতো, সেখানে এখন হচ্ছে মাত্র ৩০০।
অনিশ্চয়তার মুখে চিংড়ি রপ্তানির ভবিষৎ
এদিকে, ট্রাম্পের শুল্কের প্রভাব পড়েছে ভারতে চিংড়ি রপ্তানিতেও। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় চিংড়ি রপ্তানিকারক দেশ, আর তাদের প্রধান বাজারগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র। তাই শুল্ক আরোপের পরে দেশটির অনেক চিংড়ি খামারি এখন টিকে থাকার জন্য বিকল্পের দিকে ঝুঁকছেন।
অতিরিক্ত শুল্কসহ চিংড়ির মোট শুল্ক এখন ৬০ শতাংশের ওপরে। এতে খাতটি বড় ধাক্কা খেয়েছে। শুল্ক ঘোষণার পর থেকে প্রতি কেজি চিংড়ির দাম ০.৬০ থেকে ০.৭২ ডলার কমেছে। ৫০ শতাংশ নতুন শুল্ক কার্যকর হলে দাম আরও কমবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চিংড়ি রপ্তানিকারক ঠোটা জগদীশ বিবিসিকে বলেন, এই সময়টাতে আমরা মার্কিন ক্রেতাদের কাছে বড়দিন ও নববর্ষের বিক্রির প্রস্তুতির মৌসুম। আমাদের খামারিরা নতুন চাষ শুরু করেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের শুল্ক সিদ্ধান্তে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, আমরা কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারছি না।
ভীরাভাসারামের শ্রীমান্নারায়ণা হ্যাচারির এম এস ভার্মা বলেন, আগে বছরে গড়ে ১০ কোটি চিংড়ির লার্ভা উৎপাদন করতাম। এখন তা ৬ থেকে ৭ কোটিরও নিচে নেমে এসেছে।
সব মিলিয়ে এই সংকটে সরাসরি প্রায় পাঁচ লাখ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে। ভারত এমনিতেই কর্মসংস্থান সংকটে ভুগছে। তার ওপরে একসঙ্গে এত মানুষের কাজ হারানোর শঙ্কা মোটেই ভালো কিছু বয়ে আনবে না।
এদিকে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক টানাপোড়েন এখনো চলছে। বরং গত কয়েক সপ্তাহে বাণিজ্য আলোচনার পরিবেশ আরও খারাপ হয়েছে।
এই সপ্তাহে দিল্লিতে নতুন এক দফা আলোচনা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত হয়েছে। যদিও, ট্রাম্প প্রশাসনের মন পেতে নতুন লবিস্ট নিয়োগ করেছেন মোদী।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ তুলে বলেছেন, ভারত চীনের দিকে ঝুঁকছে ও রাশিয়ার জন্য মিত্রতে পরিণত হয়েছে। রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কিনে ভারত ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান রাখতে মস্কোর পক্ষে কাজ করছে।
এশিয়া গ্রুপ অ্যাডভাইজরি ফার্মের গোপাল নাড্ডুর বলেন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকারের ওপর। এর মধ্যে দেশীয় বিষয় যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে রাশিয়া ও চীন-সংক্রান্ত বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতাদের জন্য আত্মনির্ভরতা বাড়ানো, বহুমুখী চিন্তা করা ও কোনো সুযোগ হাতছাড়া না করাটাই এখন টিকে থাকার মূল মন্ত্র।
সূত্র: বিবিসি
এসএএইচ