মুরগির ক্লোয়াকায় টিকা প্রয়োগে দেড়গুণ বেশি অ্যান্টিবডি

বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পে গামবোরো (আইবিডি) ও রানীক্ষেত (এনডি) রোগ দীর্ঘদিন ধরে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। এসব রোগের কারণে প্রতিবছর খামারিরা উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হন। প্রচলিত টিকাদান পদ্ধতি ব্যবহৃত হলেও সেগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট অঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) এক গবেষণায় এমন একটি টিকাদান পদ্ধতির সম্ভাবনা উঠে এসেছে, যা একই সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন মিউকোসাল টিস্যু ও সিস্টেমিক সঞ্চালনে শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে সক্ষম।   শেকৃবির অ্যানাটমি, হিস্টোলজি ও ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মাসুমের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় মুরগির ক্লোয়াকা ভিত্তিক মিউকোসাল টিকাদান পদ্ধতি উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী হিলিয়নে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এই কৌশলে প্রায় ১ দশমিক ৫ গুণ বেশি অ্যান্টিবডি উৎপন্ন হয়েছে।   গবেষকদের মতে, মুরগির ক্লোয়াকা পরিপাক, মূত্র ও প্রজনন— এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার মিউকোসাল টিস্যুর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ফলে এখানে টিকা প্রয়োগ করলে শরীরের বিভিন্ন অংশে একযোগে রো

মুরগির ক্লোয়াকায় টিকা প্রয়োগে দেড়গুণ বেশি অ্যান্টিবডি

বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পে গামবোরো (আইবিডি) ও রানীক্ষেত (এনডি) রোগ দীর্ঘদিন ধরে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। এসব রোগের কারণে প্রতিবছর খামারিরা উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হন। প্রচলিত টিকাদান পদ্ধতি ব্যবহৃত হলেও সেগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট অঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) এক গবেষণায় এমন একটি টিকাদান পদ্ধতির সম্ভাবনা উঠে এসেছে, যা একই সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন মিউকোসাল টিস্যু ও সিস্টেমিক সঞ্চালনে শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে সক্ষম।  

শেকৃবির অ্যানাটমি, হিস্টোলজি ও ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মাসুমের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় মুরগির ক্লোয়াকা ভিত্তিক মিউকোসাল টিকাদান পদ্ধতি উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী হিলিয়নে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এই কৌশলে প্রায় ১ দশমিক ৫ গুণ বেশি অ্যান্টিবডি উৎপন্ন হয়েছে।  

গবেষকদের মতে, মুরগির ক্লোয়াকা পরিপাক, মূত্র ও প্রজনন— এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার মিউকোসাল টিস্যুর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ফলে এখানে টিকা প্রয়োগ করলে শরীরের বিভিন্ন অংশে একযোগে রোগ প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ থাকে।  

গবেষণায় ক্লোয়াকার ল্যামিনা প্রোপ্রিয়ায় লিম্ফ্যাটিক নোডিউল ও ডিফিউজ লিম্ফ্যাটিক টিস্যুর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এসব টিস্যুতে বি-লিম্ফোসাইট, টি-লিম্ফোসাইট, ম্যাক্রোফেজ ও মনোসাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধক কোষ রয়েছে, যা টিকার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া গড়ে তুলতে সহায়তা করে।  

২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্লোয়াকা-ভিত্তিক টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে সিস্টেমিক ও মিউকোসাল অ্যান্টিবডি উৎপাদন বাড়ানো। একই সঙ্গে আইবিডি ও এনডি রোগ প্রতিরোধে এর কার্যকারিতা যাচাই করা।  

গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মাসুম। গবেষণা দলে আরও ছিলেন রূপা আক্তার, সুব্রত বিশ্বাস, মো. জহির উদ্দিন রুবেল, সুজন কুমার সরকার, মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, হোসেন এম গোলবার, মো. ইমতিয়াজ আলম, মো. আব্দুর রকিব এবং মো. জহিরুল ইসলাম খান। গবেষণাটি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে। 

আরও পড়ুন
দূষণে বছরে পৌনে ৩ লাখ অকাল মৃত্যু, ধ্বংস হচ্ছে শিশুদের ভবিষ্যৎ 
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নামছে মোবাইল টিম, এডিসের লার্ভা পেলেই জরিমানা 

গবেষণায় ইমিউনোফ্লুরোসেন্স স্টেইনিং, ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি, ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি এবং এলাইজা পরীক্ষাসহ আধুনিক বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে ক্লোয়াকায় টিকা প্রয়োগের পর শরীরে উৎপন্ন অ্যান্টিবডির মাত্রা এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিবর্তন মূল্যায়ন করা হয়েছে।  

বর্তমানে পোলট্রি শিল্পে টিকা প্রয়োগের জন্য প্রধানত তিনটি পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। পেশীতে ইনজেকশন, স্প্রে এবং পানির সঙ্গে বা মুখে প্রয়োগ। পেশীতে ইনজেকশন মূলত সিস্টেমিক অ্যান্টিবডি তৈরি করে, স্প্রে পদ্ধতি শ্বাসতন্ত্রের মিউকোসাল প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং মুখে প্রয়োগ করা টিকা অন্ত্রের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করে।  

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, ক্লোয়াকা-ভিত্তিক পদ্ধতিতে শরীরের সিস্টেমিক ও মিউকোসাল উভয় ধরনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বারসা অব ফ্যাব্রিসিয়াসে তুলনামূলক কম ক্ষতি হওয়ায় এটিকে কম সাইটোটক্সিক বলেও উল্লেখ করেছেন গবেষকরা।  

তাদের মতে, বৃহৎ পরিসরে মুরগির টিকাদানে ক্লোয়াকাল রুট বিশেষ সুবিধাজনক হতে পারে। ভেন্ট সেক্সিংয়ের সময়ই টিকা প্রয়োগ করা সম্ভব হওয়ায় অতিরিক্ত হ্যান্ডলিংয়ের প্রয়োজন কমে যায়। এতে বাচ্চার ওপর চাপ কম পড়ে, শ্রম ব্যয় হ্রাস পায় এবং সময় সাশ্রয় হয়। পাশাপাশি প্রতিটি মুরগিকে সমানভাবে টিকা দেওয়া সম্ভব হওয়ায় টিকাদানের কার্যকারিতাও বাড়তে পারে।  

তবে প্রযুক্তিটি এখনো সব ধরনের সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে পরীক্ষা করা হয়নি। দীর্ঘমেয়াদে এর কার্যকারিতা, টিকার স্থায়িত্ব এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন গবেষকরা। খামার পর্যায়ে প্রযুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল, উপযুক্ত লজিস্টিক সুবিধা এবং কার্যকর টিকা সংরক্ষণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে বলেও তারা উল্লেখ করেছেন।  

গবেষকদের মতে, প্রযুক্তিটি দ্রুত মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে গবেষণা সহায়তা বৃদ্ধি, খামারিদের প্রশিক্ষণ, নীতিগত সহায়তা এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রকল্পটির প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মাসুম বলেন, ক্লোয়াকা-ভিত্তিক এই টিকাদান পদ্ধতি পোলট্রি শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এটি শুধু ব্রয়লার নয়, ভবিষ্যতে অন্যান্য পোলট্রি ও গৃহপালিত প্রাণীর ক্ষেত্রেও ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। 

সাইদ আহম্মদ/কেএসআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow