বন্ধ হয়ে গেছে অনিয়মে জর্জরিত জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ। ২১টি টেস্ট হওয়ার কথা থাকলেও হয় না একটিও। প্রতিদিন বঞ্চিত হচ্ছেন প্রায় তিনশ রোগী। বাধ্য হয়েই তাদের যেতে হচ্ছে বাইরের হাসপাতালে। বেকার সময় পার করছেন চিকিৎসক/কর্মকর্তা ও স্টাফসহ ১৪ জন। নেপথ্যে নতুন মেশিন গ্রহণ ও রি-এজেন্টের ব্যবসা।
সোমবার (২৬ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের এ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগটি ফাঁকা, দু-একজন কর্মকর্তা/স্টাফ বসে মোবাইল টিপলেও নেই কোনো সেবাগ্রহীতা। অথচ এখানে প্রতিদিন প্রায় তিনশ রোগীর চাপ থাকে।
বিষয়টি জানতে বিভাগীয় প্রধানের রুমে গেলে কার্ডিওলজির মেডিকেল অফিসার আব্দুল্লাহ আল মুয়ীদ খানের সঙ্গে দেখা হয়। অতিরিক্ত দায়িত্বে এই বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি। গত ১২ আগস্ট তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন বিভাগীয় প্রধানও দেওয়া হয়েছে। কথা প্রসঙ্গে আব্দুল্লাহ আল মুয়ীদ খান বলেন, ‘রি-এজেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ায় আপাতত টেস্ট বন্ধ। এখন আমি দায়িত্বে নেই। নতুন বিভাগীয় প্রধান আরও বিস্তারিত বলতে পারবেন।’
তবে বিভাগে নতুন বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. দিলশাদ পারভীনকে পাওয়া যায়নি। পরে ফোনে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব বুঝে পেয়েছি। বায়োকেমিস্ট্রির বিভাগীয় প্রধানের রুমেই বসি এখনো। প্যাথলজির বিভাগীয় প্রধানের রুমে এখনো বসিনি।’
রি-এজেন্টের অভাবে টেস্ট বন্ধ আছে। আশা করি, রি-এজেন্ট এলে শিগগির চালু হবে। পেছনে কী হয়েছে, এটা কর্তৃপক্ষ দেখবে। তবে এতটুকু বলতে পারি, সামনের দিনে প্যাথলজি বিভাগ শুধু হাঁটবে না, দৌড়াবে। সেভাবেই আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।- ডা. দিলশাদ পারভীন
টেস্ট কেন হচ্ছে না, জানতে চাইলে ডা. দিলশাদ পারভীন বলেন, ‘রি-এজেন্টের অভাবে টেস্ট বন্ধ। আশা করি, রি-এজেন্ট এলে শিগগির চালু হবে। পেছনে কী হয়েছে, এটা কর্তৃপক্ষ দেখবে। তবে এতটুকু বলতে পারি, সামনের দিনে প্যাথলজি বিভাগ শুধু হাঁটবে না, দৌড়াবে। সেভাবেই আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
সিবিসি টেস্ট হয় ওএমসি কোম্পানির মেশিন ডিএসএস ৫৬০-এ। ওএমসি সূত্র নিশ্চিত করেছে, তাদের রি-এজেন্ট এখনো দেশে এসে পৌঁছায়নি। বন্দরে এলেও দু-তিনদিন লাগে নিয়ে আসতে। এ সপ্তাহে দেওয়া সম্ভব নয়।
- আরও পড়ুন
- ‘এমন জ্বর জীবনেও হয়নি, নামতেই চায় না’
- নির্দলীয়, সৎ ও দক্ষ লোক পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে
- সরকারি টাকায় কেনা ওষুধে ‘বেসরকারি মোড়ক’
এ মাসের (আগস্ট) ৬ তারিখ দেওয়া এক অফিস আদেশে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ল্যাবগুলোর পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ সার্বিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে এ সংক্রান্ত গঠিত কমিটির সুপারিশক্রমে বায়োকেমিস্ট্রি, প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি এবং ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগের মধ্যে কোন বিভাগ কোন পরীক্ষা করবে তা সাময়িকভাবে বণ্টন করা হয়। এর মধ্যে প্যাথলজি বিভাগে ২১টি টেস্ট, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে ৯টি, বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে ১৮টি এবং ব্ল্যাড ট্রান্সফিউশন বিভাগে ৫টি পরীক্ষা করার কথা।
এর মধ্যে প্যাথলজি বিভাগে টেস্ট বন্ধ হতে হতে শুধু সিবিসিতে এসে ঠেকে। চলতি (আগস্ট) মাসের ১৬ তারিখ থেকে এই সিবিসি টেস্টও বন্ধ। যদিও গত মাসেই হাসপাতালটির কেনা প্রায় পাঁচ লাখ রি-এজেন্ট মেয়াদোত্তীর্ণ। এর মধ্যে লায়সি ১১ প্যাক (প্রতি প্যাকে ৫০০ মি. লিটার) মেয়াদ শেষ হয়েছে ১৪/০৭/২৫ তারিখে। ক্লিনার ১৪ প্যাক (প্রতি প্যাকে ১ লিটার) মেয়াদ শেষ ১৪/০৭/২৫ তারিখে। ডাইলুয়েন্ট ১৩ প্যাক (প্রতি প্যাকে ১০ লিটার), ২১/৯/২৫ তারিখে মেয়াদ শেষ হবে।
তদন্ত রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। আমরা আশা করছি, সেগুলোর বাস্তবায়ন হলে সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।- স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. এ এইচ এম মইনুল আহসান
হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী জাগো নিউজের কাছে স্বীকার করেন, টেস্ট বন্ধ আছে। আশপাশের হাসপাতাল দিয়ে তারা সংকট কাভার দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘হৃদরোগের বিশেষায়িত এ হাসপাতালে সিবিসি অত জরুরিও না।’
হাসপাতাল ভিন্ন সূত্র বলছে, বিভাগীয় প্রধান, দুজন ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট, তিনজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং আটজন স্টাফ কাজ করেন প্যাথলজি বিভাগে। তারা এখন প্রায় বেকার সময় কাটাচ্ছেন।
১৫ জুলাই ২০২৫ তারিখে ‘জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল/বাক্সবন্দি মেশিন এখন ‘চায়ের টেবিল’, টেস্ট করাতে হয় বাইরে’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাগো নিউজ। তখন বিষয়টি তদন্তে পরদিন (১৬ জুলাই) পাঁচ সদস্যের কমিটি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পাশাপাশি আলাদা চিঠিতে নির্দেশনা দেন- ‘তদন্ত চলাকালীন এবং তদন্ত রিপোর্ট পর্যালোচনার পূর্ব পর্যন্ত বিধিবহির্ভূত কোনো মেশিন স্থাপন না করতে অনুরোধ করা হলো। ব্যত্যয় হলে পরিচালক ও বিভাগীয় প্রধানগণ দায়ী থাকবেন।’
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাতের আঁধারে অনুমোদনহীন মেশিন গ্রহণ করে হাসপাতালটি। এ নিয়েও ‘হৃদরোগ হাসপাতালে দানের মেশিনে মধু’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাগো নিউজ। এরপরও ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও হাসপাতাল আলাদা তদন্ত করে। কিন্তু সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে সমস্যা বাড়ছেই। একটি সমস্যা ধরতে গিয়ে অন্য সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. এ এইচ এম মইনুল আহসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘তদন্ত রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। আমরা আশা করছি, সেগুলোর বাস্তবায়ন হলে সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।’
কয়েকজন চিকিৎসক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ সমস্যার নেপথ্যে দানের মেশিন গ্রহণ ও রি-এজেন্ট ব্যবসা। কারণ, এ বছরের শুরুতেই জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল তাদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রজনীগন্ধা ইন্টারন্যাশনাল থেকে স্পেনের অত্যাধুনিক হেমাটোলজি অ্যানালাইজার (৫ পার্টস), মাল্টি চ্যানেল কো-এগুলেশন অ্যানালাইজার এবং বিএ২১০ মডেলের মাইক্রোস্কোপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু বিভাগীয় প্রধান পরিবর্তন হওয়ায় এগুলো স্থাপন করতে দেননি। নতুন বিভাগীয় প্রধান ডা. আব্দুল্লাহ আল মুয়ীদ খান নিজেই অনুমতি ছাড়া আরও ছয়টি মেশিন গ্রহণ করেন।
মেশিন গ্রহণে ব্যস্ত প্রশাসন খেয়ালই করেনি তাদের রি-এজেন্টের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। মেয়াদ শেষের আরও ১৫ দিন পর্যন্ত টেস্ট করেছে। বিভাগীয় প্রধান সরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় টেস্টও।
এসইউজে/এএসএ/এমএফএ/এএসএম