মোহাম্মদ আশিকুর রহমানের চারটি কবিতা

খোলা দরজা আমৃত্যু বিকেলটা নামে ধীর পায়েক্লান্ত পথের কপালে হাত রেখে আমি বলি না বিদায়,হাওয়ার আঙুল ছেড়ে সন্ধ্যার কাঁধে মাথা রাখিবলি না আমি লুকিয়ে থাকা কোনো অন্ধ। চুল খুলে রাত নামলে গল্পের শেষটুকু শেষ না করেদরজা খোলা রেখেই ঘুমিয়ে পড়ি রাতের কোলে— অন্ধকারে সকাল, জ্যোৎস্নার বৃষ্টি, আল্পনা কিছুইমনে পড়ে না—মনে পড়ে না মৌসুমী ফুল-ফলেফেলে আসা দিনগুলোর ভালো-মন্দ; চোখে জল আসলে হতভম্ব হয়ে ডুবে যাইডুবে যাই জলহীন চোখে চোখ বন্ধ করে,চোখে জল নেইবলি না ভিতরে ভিতরে যে নিচ থেকে ডুবছি। আগুনে একবার পুড়লে আরও দশবার পুড়িপুড়তে পুড়তে একেবারে ছাই হয়ে যাইবাহির থেকে দেখে না কেউবলি না ভিতরে ভিতরে যে উপর থেকে পুড়ছি। বিকেলটা প্রতিদিন নামে হেলেদুলে ধীর পায়ে,ক্লান্ত পথের কপালে হাত রেখে বলি না—চামড়ার ভেতর লাল রক্তের স্তব্ধ স্রোতেআমৃত্যু—ওটাই আমি। মাটির খুব কাছে গেলে মাটির খুব কাছে গেলে প্রকৃতির পোশাকখুলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে তরুলতাভরাবিস্তীর্ণ বনভূমি—বেরিয়ে আসে সবুজ প্রেমেভরা পড়ন্ত বেলার শান্ত রূপ,প্রাচীন সৌন্দর্য। বেলি ফুলের সাদা পাঁপড়ি উড়তে দেখেজোনাকিদের খবর দিয়ে শীতের সন্ধ্যাগুলোআসে গহীন বনের মাঠে,শিশিরভেজা উদাস দ

মোহাম্মদ আশিকুর রহমানের চারটি কবিতা

খোলা দরজা আমৃত্যু

বিকেলটা নামে ধীর পায়ে
ক্লান্ত পথের কপালে হাত রেখে আমি বলি না বিদায়,
হাওয়ার আঙুল ছেড়ে সন্ধ্যার কাঁধে মাথা রাখি
বলি না আমি লুকিয়ে থাকা কোনো অন্ধ।

চুল খুলে রাত নামলে গল্পের শেষটুকু শেষ না করে
দরজা খোলা রেখেই ঘুমিয়ে পড়ি রাতের কোলে—

অন্ধকারে সকাল, জ্যোৎস্নার বৃষ্টি, আল্পনা কিছুই
মনে পড়ে না—মনে পড়ে না মৌসুমী ফুল-ফলে
ফেলে আসা দিনগুলোর ভালো-মন্দ;

চোখে জল আসলে হতভম্ব হয়ে ডুবে যাই
ডুবে যাই জলহীন চোখে চোখ বন্ধ করে,
চোখে জল নেই
বলি না ভিতরে ভিতরে যে নিচ থেকে ডুবছি।

আগুনে একবার পুড়লে আরও দশবার পুড়ি
পুড়তে পুড়তে একেবারে ছাই হয়ে যাই
বাহির থেকে দেখে না কেউ
বলি না ভিতরে ভিতরে যে উপর থেকে পুড়ছি।

বিকেলটা প্রতিদিন নামে হেলেদুলে ধীর পায়ে,
ক্লান্ত পথের কপালে হাত রেখে বলি না—
চামড়ার ভেতর লাল রক্তের স্তব্ধ স্রোতে
আমৃত্যু—ওটাই আমি।

মাটির খুব কাছে গেলে

মাটির খুব কাছে গেলে প্রকৃতির পোশাক
খুলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে তরুলতাভরা
বিস্তীর্ণ বনভূমি—বেরিয়ে আসে সবুজ প্রেমে
ভরা পড়ন্ত বেলার শান্ত রূপ,
প্রাচীন সৌন্দর্য।

বেলি ফুলের সাদা পাঁপড়ি উড়তে দেখে
জোনাকিদের খবর দিয়ে শীতের সন্ধ্যাগুলো
আসে গহীন বনের মাঠে,
শিশিরভেজা উদাস দুঃখ নিয়ে।

তখন কিছু মানুষ হুমায়ূনের হিমু হয়ে এসে
রাতভর করে চলে নক্ষত্রের পুঁথিপাঠ।
শব্দগুলো ঠোঁট থেকে করতলে পড়ে
জ্যোৎস্নার ফসিল হয়ে ভাঙে—
ভাঙতে ভাঙতে চোখে পড়ে
চোখের জল, বিনাশ
দ্রোহের অসংখ্য কারণ।

পৃথিবীর বহু দেশে বহু গাছ এক,
ছায়া এক, ফুলের ঘ্রাণ আর
ফলের স্বাদ এক
বহু নদীর উৎপত্তিও এক
ঋষিদের মতোই—
তিনবেলা উপোসের দিনে সবুজ খেয়ে
মন্ত্রপাঠ করতে করতে কিছু মানুষ
অপার হয়ে একসময় মিশে যায়
আপন ভুবনে।

শুধু মায়া দিয়ে
কতক্ষণ আটকে রাখা যায়
ঘরমুখো মানুষকে?

বনভূমিতে আত্মগোপনে থাকা
বোবা কণ্ঠের পাখিগুলো একসময়
অরণ্য-সংস্কার করে শিখে যায়
উড়ে আসা অতিথি পাখির ভাষা—
শিখে যায় অন্য মাটিতে
অন্য ভুবনে
মন খারাপের দিনে
আরেকটু ভালো থাকা।

যা কিছু হোক

চলো না জানালাটা খুলে দিই
যেতে হবে বহুদূর দক্ষিণে,
পৃথিবীর পথে মাধবীলতার কারুকাজ বসিয়ে
ছোট ছোট পায়ে নামবে সিঁড়ি;
উত্তরের হাওয়ায় জড়িয়ে ধরে রাত ঘুমালে,
হয়তো বদলে যাবে নিশাচর স্মৃতির নীরব তিথি,
স্বামীহারা ছোট বোনটাকে নিয়ে ঠিকই ফিরবো
একদিন আমাদের বাড়ি।

চলো না জানালাটা চতুর্দিকে খুলে দিই সংসারের
প্রথম সকালে—রাজনীতি, মহাজগৎ,
শিল্পকলা একাডেমিতে আমার প্রথম প্রেমের
কবিতা আবৃত্তি সব বলবো তোমায়;
শান্তির পতাকা হাতে পড়ার টেবিলে বসেই
ধরে আনবো রঙিন বৃষ্টি।

অনেক আশা—মুরালির সুরে সুরে বাজবো
আমি, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে আমাদের;
গল্পে গল্পে বইয়ের পাতায় দুজনে
উল্টাবো সারাজীবনের ভালো থাকা।
শেষের কবিতার শেষ লাইনে যা কিছু হোক,
এক ঘরে আটকে দর্পণের দিকে তাকিয়ে
আমি তোমার সঙ্গেই আছি।

মরা মনে মরা জলে

দুর্ঘটনার পর ধ্বংসস্তূপে ধ্বংস হয় প্রতিটি চুমুক,
প্রথম কান্নার দিনে পরাবাস্তব জীবন জেনে যায়
তুষের মতোই খসখসে মানুষ, পোকামাকড়—
ঝরে ঝুম ধানের বৃষ্টি—চায়ের কাপে ঘুরে ঘুরে ধোঁয়া
ওড়ে চক্রাকারে—ভেজে সময়।
সৃষ্টির সবকিছুই অলৌকিক, কোনোটা কোমল নয়।
সৃষ্টির রাতে ফাঁকা হয় শরীর, ফাঁকা হয় গোরস্থান।
সৃষ্টির রাতে চিলের পাখা খসে চলন্ত ট্রেনের বগি
উল্টায় সরিষা ক্ষেতে—হলুদ—হু হু মরু ঝড়ের
অশনিসংকেতের হুইসেল শুনতে শুনতে বিস্ফোরণ
হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বনে—বন থেকে মনে।
আদরে-দুঃখে মাথার ভিতরে যেদিন প্রাচীন পৃথিবীর
তূর্যধ্বনিতে পেঁচিয়ে যায় বুনো শালপাতা—গোধূলি,
ক্লান্ত কচ্ছপের ডর-ভয় নিয়ে মনে
হাতের তালু থেকে পা পিছলে পড়ে যাই আমি,
কেউ ধরতে আসে না নিচে।
চায়ের কাপ থেকেই প্রতি মুহূর্তে চুমুকে চুমুকে
পাল্টায় ঘটনার দৃশ্যপট।
দৃশ্যের ফোঁটাগুলো জল হয়ে ঝরে পাহাড়ে টপ টপ—
প্রবল তৃষ্ণায় পাহাড় ভেঙে পড়ে নদীতে,
‘ফিরে এসো মরা জলে’—গুনগুন বিলাপ করতে
করতে ধ্বংসের বীজ থেকে গজায় দহনের চারা গাছ।
সেই ঘটনার পর বনদস্যুরা আজও বাঘের চোখে
তাকায় নরম করে—যদি খেয়ে ফেলে।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow